কিশোর ঘোষ:
নদীর পাড়ে কাশ আর উঠোন ভর্তি শিউলি নিয়ে দুর্গাপুজো আসছে আসছে-তে যত আনন্দ তার চেয়েও বেশি দুঃখ তার ফস করে ফুরিয়ে যাওয়ায়। চারদিন না চার মিনিট ঈশ্বর জানেন! যেন সলিড মশকরা। যাবতীয় আনন্দের দিনগুলো বামন টাইপ আর রাজ্যের দুঃখ-দুর্গত কালসিটে মার্কা দিনেরাই আপনার একেবারে তেপান্তরের মাঠ টাইপ রাক্ষুসে! অথচ দুই-ই নাকি চব্বিশ ঘন্টা! তা ঢাকের বাদ্যি, নতুন জামা, লাইটিং, প্যান্ডেল, মাইক বাজিয়ে গান, অঞ্জলি। এবং অঞ্জলি নামের সুন্দরীদের দিয়ে দারুণ সেজে ওঠা অষ্টমী, নবমী পেরিয়ে যে ঘোর কালো উৎসব-প্রয়াত শূন্য সময়, সেই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট শোক কীভাবে ভুলি আমরা!
ভুলি সামনেই কালীপুজো আছে, বুকে এই বল পেয়ে। যদিও দুর্গাপুজো আর কালীপুজোর মধ্যে রয়েছে গভীর ফারাক। সহজ বাংলায়—দুর্গাপুজো যদি হয় ঘোর বর্তমানের আরাধনা, কালীপুজো তবে নিখাদ ভূতের ব্যাপার। এমনকী ভূতের ভবিষ্যতের কাণ্ড বললেও ভূল বলা হয় না।
কোজাগরীর পর অমাবস্যা পুজো
টোটাল উলোট পুরান। দুর্গাপুজো পেরিয়ে পড়ি লক্ষ্মীপুজোতে। লক্ষ্মীপুজো না বলে বছরের সেরা পূর্ণিমা পুজোও বলা যায়। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর ওই রাতের মতো চাঁদ ও চাঁদের আলো আর কবে ওঠে? সম্ভবত কোনোদিনই না। সে এমন আলো যে রাতের বেলা পর্যন্ত ভূতবাবাজির বেরোবের জো নেই। মোদ্দা কথা, ‘আলো আমার আলো’ জাতীয় দিনের পুরো নব্বই ডিগ্রি বিপরীত তিথিতে অপেক্ষা করে কালীপুজো। কা-লী-পু-জো! তার মানে চারপাশে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটারদের ঘুমন্ত মুখের মতো অন্ধকার। একে বলে কার্তিকের অমানিশা। জঙ্গলে জোনাকিরা কৃপা না করলে বাঘ-ভাল্লুকদের পর্যন্ত হাতে তিন ব্যাটারির টর্চ নিয়ে বেরুতে হত। অর্থাৎ, ঠিক যে কারণে কোজাগরী পূর্ণিমাই ইহজগতের শ্রেষ্ঠতম জ্যোৎস্নারাত, ওই একই মাপকাঠিতে কালীপুজোর দিন হল গিয়ে গ্র্যান্ড ডার্ক নাইট অফ ইস্ট।
ফ্রম চোদ্দো শাক টু চোদ্দ প্রদীপ
কোজাগরী পূর্ণিমার চোদ্দ দিন পর। সক্কালবেলা প্যাকেটোস্থ চোদ্দ শাক বিক্রি হচ্ছে। ওর মধ্যে কিছু অখাদ্য-কুখাদ্য ঘাসপাতা গুঁজে দিল না তো? স্থানীয় বাজারে গিয়ে এমন প্রশ্ন তুললে পাবেন বিক্রেতার মুখ ঝামটা। দেরি করে গেলে ওই ‘ঘাসপাতা’ও জুটবে না। বাড়িতে খালি হাতে ফিরলে হাতা-খুন্তি-অস্ত্র সজ্জিত গৃহিনীই হয়তো আপনার বুকের উপর মা কালী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল! অতএব, হাতের সামনে পলিথিনে পোরা বিচুটি পাতা পেলেও কিনে নিন। মায়া করবেন না, দোকানির উপর ভরসা না থাকলেও প্যাকেট-দেবতার ওপর নিশ্চয়ই আছে। তাছাড়া সময় বড্ড কম। আগের মতো বাড়িতে বাড়িতে ছোটতে বড়তে মিলে যে মাটির প্রদীপ গড়বে, তা-তো নয়। কিন্তু ভূত তাড়ানোর বন্দোবস্ত তো একটা লাগবে। সন্ধে হলেই যে হইহই করে নেমে আসবেন তেনারা!
শুধু ভূত তাড়ানোও নয়, ভূত সম্ভাষণের বিষয়ও রয়েছে। আছে পূর্বাত্মাদের প্রদীপ জ্বেলে পথ দেখানোর রীতি। যদিও সে সব ভুলতে গুলিয়ে গোবর হয়ে গেছে। কালীপুজোর সঙ্গে ভূতপ্রেতের একটা সংযোগ যে আছে, সে এখনও জানি অনেকেই। কিন্তু ডে-নাইট সভ্যতার ইঁদুরদৌড়ে নিময়-নিষ্ঠা, আচার-আয়োজন সব গত হয়েছে। তারাও যেন প্রয়াত পূর্বপুরুষ! আর চোদ্দ শাক সবাই খায়, তাই আমিও খাই। তাছাড়া ঠিকঠাক রাঁধলে খেতেও মন্দ না। যাকে বলে ফিউশন টেস্ট। কিন্তু চোদ্দশাক, চোদ্দপুরুষ নিয়ে কী একটা গল্প আছে না!

ভূত ও তার বহুমাত্রা
গল্প বহুমাত্রিক। মূল গল্প যদি হয় সহজ আবেগ তথা গভীর বিশ্বাসের, তবে তার যুক্তিযুক্ত প্রয়োজনও ছিল। আমাদের সমস্ত আচারেই বিশ্বাস আর যুক্তির যে মেলবন্ধন বিদ্যমান তা এখানেও রয়েছে। গৃহস্থ হিন্দু বাড়ির উঠোনে কম্পালসারি তুলসী মন্দির যেমন। তুলসী গাছে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ থাকেন, অথবা তুলসীর বিপুল ঔষধিগুণ। কোন পথে গ্রহণ করবেন তা আপনার মর্জি। ঠাকুর রামকৃষ্ণের ভাষায় ‘যত মত তত পথ’। কার্তিক মাসের অমাবস্যার চোদ্দ নং রাত্রের ব্যাপারটাও ওইরকম। বাস্তবিক সে মাহেন্দ্র সূর্যাস্ত। শ্রীশ্রী শ্যামা মায়ের মহাপুজোর আগের অন্ধকার!
কাল শব্দের শ্রীলিঙ্গ হল ‘কালী’। যা স্বয়ং সময়। এই সময় বিশ-পঞ্চাশ বছরের না নিশ্চয়ই। এ হল অনন্ত, অখণ্ড সময়। সেই মহাসৃষ্টি মুহূর্ত (বিগ ব্যাং) থেকে ওই দূর আগামী ‘অলৌকিক’-ধ্বংস অবধি বিস্তৃত। দীর্ঘ, কল্পনাতীত দীর্ঘকাল। মানুষের ধরাছোঁয়ার বিপুল বাইরের গণনা। আমাদের ষাট-সত্তর-আশি বছরের সুখ-দুঃখে ভরা জীবন যার সামনে ধূলিকণাও না। সেই প্রথম থেকে এই এবারের কালীপুজোর দিন অবধি কত মানুষ এ পৃথিবীতে এসে চলেছে ভাবুন। শুধু আসেনি, এসে হেসে-খেলে, ধুলো উড়িয়ে, অ্যাডাল্ট ছবি দেখে, চপ-সিঙাড়া খেয়ে, প্রেমে-বিরহে গান বেঁধে গান গেয়ে, গালাগালি গলাগলি করে, কেঁদেকেটে, ঠকে ঠকিয়ে, জবাব চাই জবাব দাও করে, ছবি এঁকে কবিতা লিখে, শান্তিনিকেতন গড়ে ও তার অপূর্ব ঐতিহ্যকে নির্লজ্জের মতো গুড়িয়ে দিয়ে… তারপর হয়তো একদিন সন্ধেবেলা ফটাস ফটাস মশা মেরে নিজেই মসকুইটোসম জাস্ট ভ্যানিস হয়ে গেছে! কেবলই মানুষ কেন, কোটি কোটি বছর ধরে কোটি কোটি ছাঁচের সুন্দর উদ্ভট বিটকে ভয়ানক প্রাণী এসেছে আর গতও হয়েছে। অর্থাৎ ভূত হয়েছে। সেই হিসেবে এই পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক কারা?
ভূত ছাড়া আবার কারা। জ্যান্ত মানুষের সংখ্যা সেখানে একটা ডাহুস রুলটানা খাতার খুব জোর এক লাইন মতো। তা সেই কোটি কোটি কোটি কোটি কোটি, অনন্ত কোটি ভূতেদের জন্য ভূত চতুর্দশী হল ওয়ান অ্যান্ড অনলি ‘ঘোস্ট ডে’। যেহেতু মনে করা হয় যে, কালীপুজোর ঠিক আগের দিন ‘ওরা’ আবার আসে! শুধু আসে না, প্রত্যেক পরিবারের বিগত-পুরুষরা নিজেদের ভিটেমাটির উপরে উড়তে থাকে। রানওয়ে খোঁজে। আর আমরা শ্রদ্ধাশীলতার প্রতিক স্বরূপ প্রদীপ জ্বেলে আপ্যায়ন করি আমাদের বাপ-চোদ্দ-পুরুষকে। অনেকটা এয়ারপোর্টের লাইট সিগন্যালিং-এর কায়দায় সাহায্য করি, যাতে তাঁরা নিজেদের শরীর-জন্মের ফেলে আসা মর্ত্যভূমির ঘর-উঠোনটা চিনে নিতে পেরে খানিক শান্তি পায়। আর কিছু না হোক, জেট গতিতে ঠাকুর্দার বাবার নাম ভুলে যাওয়া আজকের মানুষকে একদিনের জন্য হলেও অতীত সচেতন করে এই আচার। কিছুটা হলেও কি ভাবায় না নিজের পরিচয়, শিকড় সম্পর্কে! কিন্তু ওই যে বলছিলাম বহুমাত্রা… তাও আছে, সত্যিই আছে। ভূত চতুর্দশীতে প্রয়োজন ছিল প্রদীপ জ্বালার। ভীষণ প্রয়োজন। সলিড কারণ ছিল এ-কাজ করার।
আসলে এই নিয়ম নিষ্ঠার কারিগর প্রাক লোডশেডিং আমল। বুঝতেই পারছেন, যে প্রাক লোডশেডিং আমল মানে প্রাক ইলেকট্রিসিটির দিন। সে কেরোসিনের যুগও না। হয়তো টিমটিমে রেড়ির তেলের যুগ। যে কালে সন্ধে হলেই মানুষ ‘অন্ধ’ হয়ে যেত। সেই আলোর ছিদ্রকণাহীন অন্ধকার বাঁশবনে ভূত না থাকাটাই ছিল আশ্চর্যের। শাড়ির আঁচলের মতো নুয়ে পড়া কলাপাতা, এক ধরনের পাখি যাদের ইউরিনে ফসফরাস জাতীয় দুষ্টুমি থাকে, তারপর আলেয়ার আলোদৌড়… ঘরের বাইরে বেরোলেই এমন হাজারও অশৈলি গা ছমছমে কাণ্ড ছিল। ধরুন, ‘আর্জেন্ট কাজে’ আগে-পরে বাপ ও ছেলে ঝিঁঝিঁর ডাক আর জোনাকির মিউট উড়ানে গম্ভীর হয়ে থাকা উঠোনে নেমেছে। এবং ‘কাজ’ সেরে ফেরার পথে একে অপরকে দেখে ‘ভূত ভূত ভূত’ বলে দাঁতকপাটি লেগে যাচ্ছেতাই কাণ্ড। হুলুস্থুলু বাড়ি। একসঙ্গে একজোড়া অজ্ঞান। এবং নাটকীয় দৃশ্যে অতিনাটকীয় ওঝার প্রবেশ। শেষে শুকনোলঙ্কা পোড়া আর ঝ্যাঁঠার সলিড বাড়িতে জ্ঞান ফেরে। এরকম এক কালে প্রদীপ না জ্বেলে আপনি যাবেন কোথায়! তার উপর কার্তিক মাসের চাম্পিয়ান অমাবস্যা। যেদিন পৃথিবীর আমাদের দিককার গোলার্ধে সর্বাধিক কালো। স্বাভাবিক নিয়মে সেদিন প্রদীপের সংখ্যা তো বাড়বেই। তো সে আমলের অভিভাবকেরা ভেবেচিন্তেই ঠিক করেছিল— বছরভর সন্ধে হলেই তুলসীমঞ্চে জ্বালা থাকবে একটি প্রদীপ, আর ভূত চতুর্দশীর দিন কম সে কম চোদ্দটা। যাতে করে বিকট অন্ধকারকে কিছুটা হলেও সামাল দেওয়া যায়।

লোডশেডিং মানে অন্ধকার
অনেকেই হয়তো বলবেন, আজকের দিনে এসব জানতে বয়ে গেছে মশাই! তা ঠিক। সত্যি বলতে একটা ইনভার্টার কিনে ফেললে লোডশেডিং নিয়ে ঝামেলা ঘুঁচে যায়। আর লোডশেডিং (যা আজ অন্ধকারের সমার্থক শব্দ) না থাকলে ভূত নিয়েই বা কে ভাবতে যায়। অতএব, এ সব গালগল্পের ঝামেলায় ঢুকব, না ইনকাম বাড়ানোর আরও একটা ফিকির খুঁজব?
অবশ্যই দ্বিতীয়টা। তাছাড়া কালীপুজোও যখন থিমপুজো, তখন ভূতেরা বাস্তবিক ইয়ার্কি-ঠাট্টার পাত্তর। রাস্তা ভর্তি লাইটিং, দর্শনার্থীদের ভিড়, পুলিশ, ব্যারিকেড, একরোল-মোগলাই-বিরিয়ানি-আইসক্রিম-কোল্ডড্রিংক্স। তারপর পাইকারি ফুর্তিতে এমন মাইক বাজানো, এমন বাজি ফাটানো, তারসঙ্গে মাননসই নেত্যকালী নৃত্য—এতসবে অ্যাডজাস্ট করতে না পেরে ভূত বাবাজিরা এলাকা ছাড়া হতে বাধ্য। এইসঙ্গে দু’চারটে অসুস্থ মানুষ, যাদের আর বাঁচার প্রয়োজন দেখছি না, তাদের ভূতে পরিণত করার স্বর্গীয় ব্যবস্থা করার দায়িত্ব, কর্তব্যও আমাদের। অন্যদিকে অবস্থা এইরকম যে, ভূতে ভয় পাওয়ার ‘আনন্দ’ নিতে সিনেমা বানাতে বাধ্য হচ্ছে মানুষ। বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি। ইদানিঙকালে ভূতের সিনেমার ছড়াছড়ি কি এমনি এমনি!
শেষ কথা
তবে চমকদার টুনি কিনতে হবে গোটা কতক। গতবার কী একটা চাইনিজ মাল বেরিয়েছিল, গোল গোল, ঘোরে, দশরকম কালার। হেব্বি ছিল। এবারও নিশ্চয়ই নতুন কিছু বেরোবে। সেটাই কিনব। ফাটিয়ে লাইটিং করে পাশের বাড়ির হিংসে বাড়িয়ে দেব শাল-লা। ওইসব পূর্বপুরুষ, চোদ্দ-পুরুষ-ঠুরুসের নিকুচি করেছে।
…………………………………………………………………………….
কিশোর ঘোষ পেশায় সাংবাদিক। শূন্য দশকের অন্যতম কবি। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ তিনটি। ‘উট-পালকের ডায়েরি’ (২০০৯), ‘সাবমেরিন’ (২০১৫), ‘সফট পোর্ট্রেট’ (২০১৯)। গদ্যগ্রন্থ— ‘স্বপ্নাদেশ থেকে স্বপ্নদোষ অবধি’ (২০১৮)। ‘উট-পালকের ডায়েরি’র জন্য পেয়েছেন ‘দৌড় সম্মান’। তাঁর একাধিক কবিতা ভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। কবিতা ছাড়াও গল্প ও গদ্য লিখিয়ে হিসেবেও সুপরিচিত। থিয়েটার ও সিনেমার জন্য গান লিখেছেন।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news