পার্থসারথি পাণ্ডা
সবার কি আর ভাই থাকে, নাকি সবার বোন থাকে নিজের; যেমন আমার সেজোদাদুর ছিল না। এমনকি মাসতুতো বোন, মামাতো বোন, পিসতুতো বোন, কেউ ছিল না। এমনও কপাল মানুষের হয়! তবুও সে কপালে ফোঁটা পড়ত ফি বছর। কেমন করে? সে এক গপ্পো।
শুনেছি এক্কেবারে ছোটবেলায় পাড়ার বন্ধুদের ভাইফোঁটা নিতে দেখে সেজোদাদুর সে কী কান্না, এক্কেবারে আছাড়িপিছাড়ি কান্না, কিছুতেই আর থামানো যায় না, তারও ফোঁটা চাই এবং এক্ষুনি চাই! বোনই নেই তার আবার ফোঁটা দেবে কে? সেজোদাদুর মা কিছুতেই আর ছেলেকে বুঝিয়ে উঠতে পারেন না, বোঝাবেন কী করে, শিশুমনের না-পাওয়ার বেদনা বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কী আর ভোলানো যায়! উপায় না-দেখে সেজোদাদুর মা তখন পাড়াতুতো বোনদের কাউকে ডেকে আনতে বেরুলেন। সেই দুপ্পুর বেলা নিজের ভাইকে ফোঁটা দিয়ে তখন কেউ উপোষভঙ্গ করে ফেলেছে, কেউ কেউ হয়তো তখনও নিজের ভাইকে ফোঁটা দিয়ে উঠতে পারেনি। নিজের ভাইকে ফোঁটা না দিয়ে তারা প্রথমে আসে কেমন করে!
সেজোদাদুর ঠাকুমা নদীতে গিয়েছিলেন স্নান করতে, তিনি একাহারী মানুষ, তিনি এসে শুনলেন খোকার আবদার (সেজোদাদুকে সবাই ‘খোকা’ বলেই ডাকত, ভালো নাম ছিল ‘দীনবন্ধু’)। খোকা তখন উঠোনের ধুলোয় লুটোপুটি। ঠাকুমা এসেই কোলে তুলে নিলেন তাঁর আদরের খোকাকে। আদর করে চুমু খেয়ে বলেন, কি হয়েছে আমার ভাইটার, হ্যাঁ ? ওলে বাবালে ফোঁটা নিবি? ওমা, তার জন্য বুঝি এত কান্না? কাঁদে না, আমি দেব তোকে ফোঁটা, তুই তো আমারই ভাই। ছোট্ট ভাই আমার। ও বড় বউ, ভাইয়ের জন্য ভাত বাড়, চন্দনের পিঁড়ি পাত।
ঠাকুমা নিজের হাতে চন্দন ঘষতে বসলেন। সেজোদাদুর মা পেতলের থালায় ধান-দুব্বো-শাঁখ সাজিয়ে দিলেন, আসন পেতে রাঁধা ব্যঞ্জন সাজিয়ে ভাত বাড়লেন, আর আনলেন ঘরে তৈরি টাটকা ঘি। খুশিতে ডগমগ হয়ে তাতে ধুতি শার্ট পরে টেরি কেটে এসে বসলেন সবার আদরের খোকা। ঠাকুমা কড়ে আঙুল চন্দনে ডুবিয়ে ‘ভায়ের কপালে দিলাম ফোটা’ মন্ত্র বলতে বলতে খোকার কপালে ফোঁটা একে দিলেন তিনবার। তারপর ধান-দুব্বো দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। শাঁখ বাজাতে বাজাতে মা খোকাকে ইশারা করলেন প্রণাম করতে, খোকা ভারি চালাক, অমনি ঢিপ করে প্রণাম করলেন ঠাকুমার পায়ে। তাই দেখে ঠাকুমার সে কি আনন্দ! ও বড় বউ তোর ছেলের তো দেখছি খুব বুদ্ধি হয়েছে রে। অমনি ‘বেঁচে থাক ভাই বেঁচে থাক, তোর একশ বচ্ছর পরমায়ু হোক’ বলতে বলতে চুমু খেয়ে খুব আদর করে দিলেন। তারপর খোকাকে হাত পাততে বলে তাতে ঘি ঢাললেন, বললেন সেটুকু খেতে। এমনি করে তিন বার ঘি ঢাললেন। তারপর বললেন, এবার তুই ভাত খা ভাই , আমরা বসে বসে দেখি। ও বড় বউ, ছোট আয় এসে বোস।
প্রথম বার ফোঁটা নিয়ে তখন খোকার সে যে কী আনন্দ! ঠাকুমা সবাইকে নিয়ে যেন সেই আনন্দের ঝরণাতলায় সিক্ত হলেন, পূর্ণ হলেন।
ঠাকুমা যতদিন বেঁচে ছিলেন, প্রতিবার নিয়ম করে ঘি ঢেলেছেন, ফোঁটা দিয়েছেন ভাইফোঁটায়। ঠাকুমা মারা যাওয়ার পর বউদিদের হাতে, বিয়ের পর শ্যালিকাদের হাতেও ফোঁটা নিয়েছেন সেজদাদু। তাঁর ভেতরের সেই কবেকার ছেলেমানুষটা কখনই হারিয়ে যায়নি। তাই যখন আমার দিদির জন্ম হল, সেকালের নিয়ম অনুযায়ী মেয়ে জন্মানোর জন্য সবার চোখে যখন জল এলো, তখন একমাত্র সেজদাদুই আনন্দে নেচে উঠেছিলেন, বলেছিলেন, ওরে আমার বোন এসেছে, আমি বোন পেয়েছি, তোরা চোখে জল নিয়েই থাক, তোরা কী করে বুঝবি আমার আনন্দ! তোরা তো বুঝিসই না সংসারে মেয়ে কত বড় ধন!
দিদি একটু বড় হতেই সেজদাদু তার হাতে ফোঁটা নিতে শুরু করেছিলেন। সেই ছোট্ট থেকে সবার ‘জমের দুয়ারে’ কাটা দেওয়ার প্রার্থনা মাথায় নিয়ে বিরানব্বই বছর বেঁচেছিলেন মানুষটা। সচল হয়ে। মানুষটার মনে শেষদিন অবধি বেঁচে ছিল সেই বছর পাঁচের শিশুর হৃদয়টা, অাজীবন পিপাসা ছিল ভাইফোঁটার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভাইবোনের মধুমাখা স্নেহটুকুর আস্বাদের । চন্দন ছোঁয়া আঙুলে সেই স্নেহ-ভালবাসার স্পর্শ তাঁকে যেন দিয়ে যেত বেঁচে থাকার নিশ্বাস, তাঁর মধ্য দিয়েই যেন অামাদের কাছে পূর্ণতা নিয়ে ধরা দিত ‘ভাইফোঁটা’র মানে!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news