Breaking News
Home / TRENDING / ভবঘুরের পাঠক্রম, পর্ব-১

ভবঘুরের পাঠক্রম, পর্ব-১

হিন্দোল ভট্টাচার্য :

প্রশ্ন করি নিজেকে

ক্রমাগত জিজ্ঞাসা করি

প্রশ্নগুলি

মীমাংসার জন্যেই কেবল নয়

নিজেকে খণ্ড খণ্ড করে দেখি

নিজের ভিতরে নিজেকে

প্রশ্নচিহ্নের মতো দাঁড় করিয়ে রাখি

 

এভাবেই

নিজেকে জাগ্রত রাখি

( যেভাবে জাগ্রত থাকি, তিলকমাটি, দেবদাস আচার্য)

 

সমস্ত ভাষার কবিতাই কিছু জাগ্রত কবির কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকে। এই জাগ্রত কবির সংখ্যা স্বাভাবিক ভাবেই কম থাকে। কারণ জাগ্রত কবির বৈশিষ্ট্যই হল তিনি নীরব, তিনি সজাগ এবং তিনি সর্বদাই নিজের ভিতরে জগৎকে এবং জগতের ভিতরে নিজেকে প্রত্যক্ষ করেন। তিনি জানেন, মহাপ্রকৃতি তাঁর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তিনি আধার মাত্র। তিনি লেখনী মাত্র। আসল কথা বলে প্রকৃতি। কিন্তু প্রকৃতির উপযোগী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্যও দরকার কবিতার সঙ্গে তাঁর এক নিয়ত সহবাস। এই সহবাস না করলে এবং মহাপ্রকৃতির সঙ্গে নিয়ত কথোপকথন না হলে সেই কবি, কবিতার অন্তর্জগতের বোধিবিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হবেন কী করে! দেবদাস আচার্য-র সারাজীবনের কাব্যসাধনা এবং কাব্যব্যক্তিত্ব মনে হয় এই নিরভিসন্ধির মতো   আত্মানুসন্ধান ঘিরেই গড়ে উঠেছে। এই যে তিনি বললেন মীমাংসার জন্য কেবল নয়, প্রশ্নগুলি করেন তিনি নিজেকেই, নিজের ভিতরে নিজেকে খণ্ড খণ্ড করে দেখার জন্য। নিজের ভিতরে এই যে ‘নিজে’ থাকেন, ইনি কে, এর প্রশ্ন হয়ত কেউ কোনওদিন পায় না। কিন্তু প্রশ্ন করার অর্থ তো উত্তর পাওয়া নয়। বরং প্রশ্নটাই নিরন্তর করে যাওয়া। আর এই প্রশ্ন করে যাওয়াটাই একজন কবিকে নিয়ত জাগ্রত রাখে। এভাবে একজন কবি যখন জাগ্রত থাকেন, তখন তিনি স্বয়ং কবিতা হয়ে ওঠেন এ বিষয়ে সন্দেহ থাকে না। যেমন হপকিন্স পড়ার সময়ে মনে হয়, এ কবি সদাজাগ্রত, ঠিক তেমন দেবদাস আচার্য। ধ্যানের মধ্যে অনুসন্ধান যেমন এক সাধকের চিরজাগ্রত চেতনাপ্রবাহ, তেমন একজন কবির চেতনাপ্রবাহে থাকে এই নিজেকে খুঁজে বেড়ানোর আকাশ। এই আকাশ যেমন বাইরে থাকে, তেমন ভিতরেও থাকে। ভিতর ও বাইরের আকাশকে যুক্ত করে দেওয়াই একজন কবির অভিপ্রায়।

ব্যক্তিত্ব ও আত্মানুসন্ধান একজন কবির মধ্যে যত প্রখর হয়, তত তিনি কবিতার অভিপ্রায়কেই লিখতে থাকেন। কবিতার অভিপ্রায় কী? কেন প্রকৃতি নিজেকে কবিতার মধ্যে দিয়ে প্রকাশের রাস্তাটি বেছে নিল, তার সামান্য হলেও একটা আভাস পাওয়া যায় যেখানে, যেখানে প্রকৃতি, তার চেতনাপ্রবাহ নিজেকে প্রকাশিত করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দৃশ্যের মধ্য দিয়ে, খণ্ডের প্রকাশে প্রকাশিত হয় অখণ্ডের বার্তা, তা একজন কবির লেখার মূল অভিপ্রায়। কবি দেবদাস আচার্য কবিত্বের সেই ধর্মেই চিরকালীন দীক্ষিত, যা তাঁকে উৎকীর্ণ এবং উন্মুখ করে রাখে জগতের মধ্যে এই অন্তর্জগতের সত্যের কাছে।

এই কবির দার্শনিক অভিপ্রায়টিকে বোঝা যায় যখন এই বীক্ষাটিকেই তিনি প্রত্যক্ষ করেন। আমরা এই কবিতাটির দিকে তাকাতে পারিঃ-

বাতাসের মধ্যে

এক টুকরো কর্পূরের মতো আমার মন-প্রাণ

উদ্বায়ী

যা কিছু হাতে ধরি

উবে যায়

আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ

উবে যায়

কোনো কাজ পরিণতি পাওয়ার আগে

উবে যায়

আমার কাজ

শেষ হয় না

কেউ ফুঁ দেয়

উবে যায়

এভাবে আজীবন একটা ফুঁ-এর নীচে

আদি-অন্তহীন হয়ে থাকি।

(ফুঁ, তিলকমাটি, দেবদাস আচার্য)

 

 

এই কয়েকদিন আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় একজনের কবিতার নীচে একটি মন্তব্য পড়ে ভারী অবাক হয়েছিলাম। মন্তব্যটি হল, এটি কবিতা নয়, কোটেশান। আমি মন্তব্য পড়ে হতবাক হয়েছিলাম কারণ এমন বোকার মতো ভাবনা আগে পাইনি। যেটি পেয়েছি, তা হল, এটি কবিতা না মন্ত্র? কথাটি এখানেই, যে কবিতা যখন মন্ত্রে পরিণত হয়, তখন কি তা কবিতা থাকে? আমার এখানে মনে হয়, কবিতা যখন চরম উচ্চস্তরে উপনীত হয়, তখন তার মধ্যে মন্ত্রের শক্তি এসে যায়। মন্ত্র কাকে বলে আমি জানি না। কবিতা কাকে বলে তাও জানি না। তবে মন্ত্র কেমনে কবিতা হয়, বা কবিতা কেমনে মন্ত্র, তার উদাহরণ মনে হয় উপরের কবিতাটি। সেই কবে থেকে তো আমিই বেঁচে আছি। আমিই ছিলাম যখন প্রথম জল জন্ম নিল, যখন জন্ম নিল প্রাণ। আমিই সেই উদ্ভিদ, সেই প্রাণী, সেই উভচর। আমিই বছরের পর বছর, শতাব্দী- সহস্রাব্দের পর সহস্রাব্দ ভেসে চলেছি। আমিই সেই সত্ত্বা যে আমাকে ধ্বংস করে, আবার আমিই সেই সত্ত্বা, যে আমাকেই জন্ম দেয়। আমার মা আমি স্বয়ং। আবার আমার হত্যাকারী আমিই স্বয়ং। এই যে অখণ্ড সত্ত্বা চৈতন্যের মতো প্রবহমান সত্ত্বার মতো আমাকেই প্রকাশ করে আদি-অন্তহীন, কবি সেই চিরসময়খণ্ডকে ধরলেন এই কবিতার মধ্যে।

দেবদাস আচার্য

অন্তহীন এই সত্যের মধ্যে অবগাহন করে আছেন যে কবি, তিনি জানেন, যে এই খোঁজার শেষ হবে না কখনও। এই খুঁজে যাওয়া অরূপরতন, আর খুঁজে না পাওয়ার অন্বেষণ যে আমাদের মায়াময় জীবন, তা তাঁর কবিতার মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট হয়।

 

খুঁজি, পাই না, তবু

খুঁজি

এভাবে খুঁজতে খুঁজতে চোখ বুজি

চোখ বুজতে বুজতেও খুঁজি

 

পাই না, কিন্তু ভাবি

কীই-বা পেতাম কীই-বা

পেতাম, যদি

প্রকৃতই কিছু না-কিছু পেতাম

 

ভ্রান্তিই বহন করি, এই ভাবে

প্রাণ-মন জুড়ে বাঁচি, ভ্রান্তি বিস্তার করে বাঁচি

(ইদানীং, তিলকমাটি, দেবদাস আচার্য)

 

এই ভ্রান্তিকে কি আমরা মায়া বলতে পারি দেবদাসদা? ঠিক জানি না। কিন্তু এই খুঁজে চলাটাই তো কবির প্রকৃত ধর্ম। তিনি এই ধর্মকে ধারণ করে আছেন, আর কবিতার মধ্যে দিয়ে বিস্তারিত করে দিচ্ছেন সকলের চেতনাপ্রবাহে। যেন এক ঋষিতূল্য বাউল হলেন কবি, যদি প্রশ্ন করা হয় কবি কে, এর চেয়ে বেশি বা কম কিছুই হয়ত বলা সম্ভব নয়। এই ঋষিতূল্য বাউল একাকী হেঁটে যান অনন্তকালের দিকে, যেখানে হয়ত সূর্যাস্ত অপেক্ষা করে আছে। অনন্তকালের দিকে যেমন হেঁটে যায় স্বয়ং অনন্তকাল।

আর সেই হেঁটে যাওয়াকে প্রত্যক্ষ করতে করতে এই কবিতাটিকে এগিয়ে দিতে পারি চিরকালীন পাঠকের দিকে-

 

সূর্যাস্তটাই এখন আমার পথ, আমার ভরসা।

 

দিনটা দ্রুত গড়িয়ে গেল সূর্যাস্তের পথ ধরে

নিজেকেও সূর্যাস্তের মতোই অবর্ণনীয় লাগছে,

সম্মোহিত হয়ে থেমে থেমে উপভোগ করার সময় নেই আমার,

নিজেকে ওই মোহময় পথে স্থাপন করলাম,

একটানা হাওয়া করব ওকে,

এবং করতেই থাকব

যতদূর সূর্যাস্তটা চলবে, যতদিন ধরে চলবে,

এবং চলতেই থাকবে

ততদূরই।

(যাব, পিছু পিছু যাব, তিলকমাটি, দেবদাস আচার্য)

 

( কবিতাগুলি আদম প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত দেবদাস আচার্য-র তিলকমাটি গ্রন্থ থেকে নেওয়া। গ্রন্থটির বিনিময় মূল্য-৬০টাকা)

 

 

 

 

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *