Breaking News
Home / TRENDING / বাংলা ছাপা পঞ্জিকার দুশো বছর

বাংলা ছাপা পঞ্জিকার দুশো বছর

পার্থসারথি পাণ্ডাঃ

বাংলা পঞ্জিকার ইতিহাসে ইংরেজি ২০১৮ সালটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ বছরই পূর্ণ হল বাংলা ছাপা পঞ্জিকার দুশো বছর।

১৭৭৮ সালে হ্যালহেডের লেখা বাংলা ব্যাকরণ ছাপা হয়েছিল হুগলির জন অ্যানড্রুজের ছাপাখানায়। বঙ্গে ছাপা এটিই প্রথম বই, যাতে ইংরেজির সঙ্গে ছাপার হরফে স্থান পেয়েছিল বাংলা ভাষা। এর একুশ বছর পর শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে প্রথম পুরোপুরি বাংলায় লেখা বই ছাপা হল। ১৮০০ সালে ছাপা বইটির নাম ‘মঙ্গলসমাচার মতীয়ের রচিত’। এরও সতের বছর পর, কলকাতা থেকে ১৮১৮ সালে প্রথম ছাপা হল, বাংলা ভাষায় পঞ্জিকা। এই পঞ্জিকার সঙ্কলক ছিলেন কলকাতার জোড়াসাঁকোর দুর্গাপ্রসাদ নামের এক ব্যক্তি। আর প্রকাশ করেছিলেন রামহরি নামের কেউ। এঁদের দুজনেরই পুরো নাম জানা যায় না।

পঞ্জিকা বই আকারে প্রকাশিত হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা আছে কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের। তাঁর আমলে নবদ্বীপ ছিল সমস্ত পণ্ডিত আর ভটাচাযকুলের আখড়া। সমস্ত বিধিবিধান সেখান থেকেই পাশ হত। সেকালে তাঁদের কাছ থেকে জেনে নিয়ে বার-তিথির বিধিনিষেধ, পর্ব-পার্বণের কর্তব্যকর্ম সমস্তই পয়সার বিনিময়ে গেরস্তের বাড়িতে বাড়িতে জানিয়ে যেতেন এক শ্রেণীর ব্রাহ্মণ। এঁদের বলা হত ‘দৈবজ্ঞ’। এঁরাই ছিলেন সেকালের চলমান পঞ্জিকা। বছরের পর বছর তাঁদের এই পেশা এভাবেই চলছিল। কিন্তু এক সময় ভেতরে ভেতরে একটা গোলযোগ শুরু হল। কারণ, অনেক ভটচায এসময় তাঁদের পোষ্য দৈবজ্ঞের কাছে নিজের নিজের মত ছড়াতে শুরু করলেন। ফলে, পঞ্জিকায় নানান বৈষম্য দেখা দিল। ব্যাপারটা কৃষ্ণচন্দ্রের চোখ এড়াল না। তিনি তখন এই বৈষম্যের নিষ্পত্তি করতে নবদ্বীপের ভটচায-পণ্ডিতদের ডেকে একসঙ্গে বসিয়ে গণনা করিয়ে সহমতের ভিত্তিতে একটি পঞ্জিকা সংকলন করালেন। সেই পঞ্জিকা সংকলন করেছিলেন পণ্ডিত রামচন্দ্র বিদ্যানিধি। সেটা তুলোট কাগজে হাতে লেখা পুঁথির যুগ। তাই, সভার লিপিকারদের দিয়ে সেই পঞ্জিকার অনেকগুলো কপি তৈরি করিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র স্থানীয় জমিদার, বড়লোক, পণ্ডিতদের মধ্যে বিতরণ করিয়েছিলেন। সেই শুরু। তারপর থেকে বছর শেষ হলেই নবদ্বীপ সংলগ্ন অঞ্চলের এক শ্রেনীর মানুষ নতুন বছরের পঞ্জিকা সংকলন করে, কপি করে, সেগুলো বিক্রি করতে শুরু করলেন। সেই পঞ্জিকার সূচনায় ঋণস্বীকার করা হত রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের, লেখা হত ‘রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অনুমত্যানুসারে’ বা ‘নবদ্বীপাধিপতির অনুমত্যানুসারে’ পঞ্জিকাটি রচিত হল। পঞ্জিকা ছাপার যুগে প্রথম দিকে অনেকদিন এই ঋণস্বীকারের প্রথা চালু ছিল।
১৮১৮ সালে পঞ্জিকা ছাপা শুরু হতে না হতেই লোকে যেন হাতে চাঁদ পেল। বারতিথিপর্বের কথা জানতে আর দৈবজ্ঞ বা ভটচাযের কাছে ছুটতে হল না। হাতের নাগালে এসে গেল বছরের হিসেব। ধীরে ধীরে এই ছাপা পঞ্জিকা মানুষের কাছে এমন প্রচার পেল যে, পঞ্জিকা প্রকাশ করে বেশ লাভ হতে লাগল। ফলে, ব্যবসার গন্ধ পেয়ে অনেকেই এগিয়ে এলেন পঞ্জিকা প্রকাশনায়। এতে একটা জিনিস ভালো হল, প্রতিযোগিতার বাজারে সবাই তাঁদের পঞ্জিকায় নতুন নতুন আকর্ষণীয় বিষয় সংযোজন করতে লাগলেন। সেই নবত্বের একটা তালিকা করা যেতে পারে, যেমন—

পঞ্জিকায় দেব বা দেবীর ছবির একটি ব্লক ছবি ছাপার রীতি প্রথম থেকেই ছিল। কিন্তু ১২৪২ বঙ্গাব্দে গঙ্গাগোবিন্দ বিদ্যালঙ্কার সঙ্কলিত পঞ্জিকায় সেই দেবদেবীদের ছবির সংখ্যা বাড়ল। জ্যোতিষগণনা ও বার্ষিক রাশিফলের পাশাপাশি ভারতের বিভিন্নস্থানের পৌরাণিক ও ভৌগোলিক বিবরণ প্রাথম ছাপা হল এই পঞ্জিকাতেই।

১২৬১ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত একটি পঞ্জিকায় প্রথম গঙ্গার জোয়ার ভাঁটার সময়সূচী ছাপা শুরু হল।

হাওড়া স্টেশন চালু হলে পঞ্জিকায় বিভিন্ন স্টেশনের ভাড়া এবং সময়তালিকা ছাপা শুরু হল। বাংলা পঞ্জিকার প্রচার দেখে উৎসাহিত হয়ে মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা করে ‘বৃহৎ মহম্মদীয় পঞ্জিকা’ প্রকাশ করতে শুরু করেন মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ নামের এক ভদ্রলোক, ১২৯৯ বঙ্গাব্দ থেকে। এতে মুসলিম রাজাদের বিবরণ আর স্টিমারের টাইম টেবিল ছাপা হত। আবার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য ‘খ্রিস্টীয় পঞ্জিকা’র প্রকাশ শুরু হয়েছিল কলকাতা ট্যাকট সোসাইটি ও চার্চ অব ইংলন্ড-এর যৌথ প্রচেষ্টায়, ১৮৪৯ সালে। এতে থাকত বিভিন্ন মেলা, কৃষির বিবরণ আর নানান সম্প্রদায়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সরকারী ছুটির দিনের উল্লেখ।

বাংলা পঞ্জিকার ইতিহাসে ১২৭৬ বঙ্গাব্দ থেকে শুরু হল ডাইরেক্টরি পঞ্জিকার যুগ। দুর্গাচরণ গুপ্ত প্রতিষ্ঠিত গুপ্তপ্রেস প্রকাশিত ‘গুপ্তপ্রেস ডাইরেক্টরি পঞ্জিকা’। ১৯৮৮ সাল থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করল ‘পি এম বাগচীর পঞ্জিকা’। এর সঙ্গে থাকত একটি ডাইরেক্টরি। এতে থাকত জেলার বিবরণ, চাকরির খবর, কলকাতার রাস্তার সুলুকসন্ধান, সরকারি বিভিন্ন বিভাগের ঠিকানা, যোগাযোগের উপায়, স্কুল-কলেজ, চিকিৎসক ও জ্যোতিষীদের ঠিকানা।

পঞ্জিকার পাতাতেই দেড়শ বছর আগে শুরু হয়েছিল সচিত্র বিজ্ঞাপণ ছাপানোর রেওয়াজ। শুরু হয়েছিল নানান ডাক্তারী পরামর্শ দেওয়ার রীতি। এমনি করেই নানান বিষয়কে অঙ্গে ধারণ করে দুশো বছর ধরে আরও বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে বাংলা পঞ্জিকা। ভারতের প্রতিটি প্রদেশের আছে নিজস্ব পঞ্জিকা, কিন্তু বাংলা পঞ্জিকার মতো এতো বৈচিত্র্য আর কোথাও নেই। আজ ইন্টারনেটের যুগে যখন একটা ক্লিকেই অনেক কিছু হাতের মুঠোয় পাওয়া যায়, তখনও ঐ ঐতিহ্যময় বৈচিত্র্যের জন্যই এই পঞ্জিকার ওপর একটা অমোঘ টান যেন আমাদের থেকেই যায়।

তথ্য ঋণঃ চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

https://www.youtube.com/channelhindustan

https://www.facebook.com/channelhindustan

Spread the love

Check Also

রাজ্যে বিজেপির ভোট পরবর্তী হিংসার দাবির আবহেই ‘বিজেপির মারে’ মৃত্যু ত্রিপুরার তৃণমূল নেতার

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো। গত ২৮ শে আগস্ট তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে মুজিবর ইসলাম মজুমদারের …

আই লিগে বড় জট, করোনায় আক্রান্ত ৪৬ জন

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো। আপাতত আই লিগ অথৈ জলে। কারণ কলকাতায় জৈব সুরক্ষা বলয়ে ফাটল ধরেছে। …

দৈনিক ৭৫ কোটি, বড়দিন থেকে নিউ-ইয়ার, রেকর্ড মদ বিক্রি রাজ্যে

চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো। মদ বিক্রিতে নতুন রেকর্ড গড়েছে রাজ্য। সংবাদমাধ্যমে দেওয়া রাজ্য আবগারি দফতরের তথ্য …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *