দীপায়ন দাস :
০৯-০৪-২০২০
বছর দু’য়েক হল সাংহাইতে এসেছি। চমৎকার শহর, নিয়মানুবর্তী শৃঙ্খলাবদ্ধ। এখানে প্রাচীন আর নবীন স্থাপত্য থাকে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে।বেশ কাটছিল দিনগুলি। জার্মান সংস্থায় কাজ করি , ডিসেম্বরে ছুটি একটু বেশিই থাকে। এবার ভেবেছিলাম ডিসেম্বরের ছুটিতে কলকাতা আসব। অনেকদিন বাড়ি আসা হয় না। ডিসেম্বরের শুরুর দিক সেটা। শুনলাম উহানে কিছু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। উহান সাংহাই থেকে খুব বেশি দূর নয়। আটশো কিলোমিটার মত দূরত্ব। তখনও বুঝিনি যে কী ভয়ানক সময় আসতে চলেছে সামনে। কলকাতায় আসার কথা ছিল, স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে চলে আসি কলকাতায়। বাড়িতে থাকতে থাকতেই বুঝলাম ভয়াবহ অবস্থার দিকে এগোচ্ছে চিন। সেই সময় আমার চিনে ফিরে যাওয়ার কথা, বাড়ির কেউ রাজি নয় ওই অবস্থায় ছাড়তে। তখন চিনে ফেরা মানে আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার সামিল। কিন্তু আমার অফিসের কাজ রয়েছে। আমাকে ফিরতেই হল। সঙ্গে ফিরল মেয়েও।স্ত্রীর শরীর খারাপ বলে সঙ্গে নিয়ে আসার সাহস পেলাম না।ও আতঙ্কিত হয়ে রইল আমাদের জন্য। আমি নিজের থেকেও বেশি চিন্তিত ছিলাম মেয়েকে নিয়ে।চিনে যখন ফিরলাম তখন মৃত্যুর আতঙ্কে থমথমে শহর। চারিদিকে অজানা আশঙ্কা জমাট বেঁধে রয়েছে।
এই দেশ আগে সার্সের মত রোগ পেরিয়ে এসেছে। সে সময়ের গল্প শুনেছি এখানকার বাসিন্দাদের মুখে। এমন রোগ দেখে এসে মানুষ এখানে অনেক সচেতন। তাও এবারের পরিস্থিতি অভূতপুর্ব। একটু দূরের এক চেনা শহরে তাণ্ডব চালাচ্ছে মৃত্যু। প্রতিনিয়ত সেই খবর এসে পৌঁছচ্ছে। ভয়ে সিঁটিয়ে আছে সবাই। একটাই শুধু ভরসা নিজের দেশে কোনও কিছু ঠেকাতে কোমর বেঁধে নামে চিন। এতটুকু ঢিলে দেয় না কোনওকিছুতে। সেই সময় চিন সরকারের সামনে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল চাইনিজ নিউ ইয়ার। চিনাদের সব থেকে বড় উৎসব এটাই। এই সময়ে জমায়েত খাওয়া দাওয়া গান গল্প আড্ডায় মজে চিনারা। শহর থেকে যে যাঁর নিজের বাড়িতে ফিরে যান। সেখানে কিছুদিন কাটিয়ে ফিরে আসেন কর্মক্ষেত্রে। এই ঘরমুখী উৎসবমুখী জনতাকে ঘরবন্দী করে ফেলা সহজ ছিল না। কিন্তু এতটুকু মুঠো আলগা করল না চিন। এই অসাধ্যসাধনও করে দেখাল তারা। হুবেই ততদিনে অন্য সব জায়গার থেকে বিছিন্ন। নতুন বছরে নিজেদের ঘর থেকেও বেরলো না উহানের বাসিন্দারা। তবে তখন আর শুধু হুবেই নয়, রোগ ছড়াতে শুরু করেছে চিনের অন্যান্য জায়গাতেও। সাংহাইতেও থাবা বসিয়েছে করোনা। প্রায় ১৪০০ লোক আক্রান্ত। আমরা আতঙ্কে আছি ভবিষ্যতের কথা ভেবে। আমার ওয়ার্ক ফ্রম হোম চলছে। মেয়ে ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়ে। ওর টিচাররা সবাই দ্রুত ফিরে গিয়েছেন যে যাঁর দেশে।

ওর স্কুল তো বন্ধই। আমার বাড়ির জানলা দিয়ে নদী দেখা যায়। ঝকঝকে শহরের মধ্যে প্রাণবন্ত নদীটা বড় চুপচাপ। নিঃঝুম। শহরটার মতোই। সাংহাই তো বটেই চিনের কোথাও এই সময় খাবার সরবরাহে এতটুকু ঘাটতি হয় নি। ডির্পাটমেন্টাল স্টোরের একটা তাকও খালি হয়নি যেমন হয়েছে ইতালি, আমেরিকায়। ওষুধের জোগান নিয়েও কোনও সমস্যা হয়নি। আগেই বলেছি চিন খুব নিয়মবদ্ধ, শৃঙ্খলামাফিক ব্যবস্থা নেয়।বেজিং-এর এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাই এইসব ক্ষেত্রে বাঁচিয়ে দিয়েছে চিনকে।
দুঃসহ কিছু দিনরাতের মাস তিনেক সময় কাটানোর পর এখন আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হচ্ছে চিন। কিন্তু প্রশাসন এতটুকু শিথিল করেনি নজরদারি।এখানকার সব কয়টা অ্যাপার্টমেন্ট বাসিন্দাদের সুরক্ষিত রাখতে যথাসাধ্য চেষ্টা করছে নিজেদের উদ্যোগে। বাড়ি থেকে বেরনোর সময় মাস্ক পড়া বাধ্যতামূলক। অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকার সময় থার্মাল চেকিং সহ আরও বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। শহরের শপিং মলগুলিও এখন খুলে গিয়েছে। কিন্তু ঢোকার আগে মল কর্তৃপক্ষকে নাম আর পাসপোর্ট নম্বর দেখাতে হয়।
সরকারের দেওয়া বিশেষ অ্যাপই বলে দেয় ওই ব্যক্তি শপিং মলে ঢুকতে পারবেন কি না। অফিসে এখনও আমরা সোস্যাল ডিসট্যান্সিং মেনে চলি। চিনে এখনও কিছু কিছু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন।কিন্তু এঁরা সবই বাইরে থেকে এসেছেন বলছে প্রশাসন।সাবধানে থাকতে হবে, আরও সাবধানে থাকতে হবে চিনকে। সাবধানে থাকতে হবে আমার দেশ ভারতকেও। দ্রুত লকডাউন অত্যন্ত ভাল সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকারের। মানুষ যদি সহযোগিতা করেন এই বিপদ তাড়াতাড়ি পেরিয়ে যাওয়া যাবে।আমার মেয়ে কাল হুয়াংপু নদীর ধারে কফিশপে গিয়েছিল কফি খেতে। কিছুদিন আগেও জনশূন্য পরিত্যক্ত মনে হত এগুলিকে দেখে। এখন আবার মানুষ আসতে শুরু করছে একে একে। কতদিন পরে স্বাভাবিক পৃথিবীর মুখ দেখল আমার মেয়ে।দ্রুত পৃথিবীর অসুখ সারুক এখন শুধু এটাই চাই। তবেই আবার একসঙ্গে ভাল থাকব আমরা।
সাংহাই-এ কর্মরত ইঞ্জিনিয়র
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news