নিজস্ব সংবাদদাতা:
দুর্গাপুর, ৭ নভেম্বর: চিরাচরিত প্রথা মেনে পুজো হল মানকরের বড়-মা কালীর। মঙ্গলবার কালীপুজোকে ঘিরে রাতভর দর্শনার্থীদের ঢল নেমেছিল মানকরে। আসারই কথা, কারণ ৭০০ বছরের পুরোনো এই পুজোতে মিলেমিশে আছে কত লৌকিক অলৌকিক কাহিনি। তার উপর সাধক রামানন্দ গোস্বামীর স্মৃতি বিজড়িত পীঠস্থান।
রামানন্দ গোস্বামী এই কালী পুজো শুরু করেন। তিনি ছোটবেলা থেকে কালী মায়ের একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন। কাব্যতীর্থ পাশ করার পর বেশীর ভাগ সময়ে শ্মশানে পড়ে থাকতেন। তাঁর বাবা দেবভক্ত হলেও কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষিত হওয়ার জন্য পুত্রের কালী-মা ভক্তি মোটেই পছন্দ করতেন না। কথিত আছে কঠোর সাধনা করে মায়ের দর্শন পেয়েছিলেন এই সাধক। মায়ের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন ঠাকুর রামানন্দ। তাঁর সাধনার স্থান ছিল কাশ আর বেতবনে ঘেরা শ্মশান। বর্তমানে যা মানকর ভট্টাচার্য্য পাড়া। মায়ের বর্তমান পুজারী শ্যামাপদ ভট্টাচার্য্য বলেন, “বড়-মা কালীর তিন বোন। মেজ বোন মানকর ডাঙাপাড়ায় ক্ষ্যাপা কালী, আর এক বোন পাল পাড়ায় পঞ্চানন কালী। একবার এক ঘটনা ঘটেছিল। সাধক রামানন্দ তখন শ্মশানে ধ্যানে মগ্ন। পাড়ার কেউ তাঁর বাবাকে খবর দিয়েছেন। তাঁর বাবা শ্মশানে এসে শুধু কৃষ্ণ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাননি।” ওই শ্মশানের মধ্যে পঞ্চমুণ্ডীর আসন প্রতিষ্ঠা করে মায়ের মন্দির তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীকালে মায়ের সেবার দায়িত্ব সঁপে ছিলেন ঠাকুর বাণীকণ্ঠ ভট্টাচার্য্যের হাতে। তিনি ছিলেন মানকরের তৎকালীন জমিদার সদাশিব ভট্টাচার্য্যের বংশধর। কথিত আছে সাধক রামানন্দ তপস্যার দ্বারা সাতঘড়া জল এনেছিলেন। এবং ওই জলেই বড়-মা কালির মন্দিরে জীবন্ত সমাধি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তিকালে সাধক রামানন্দের রীতি অনুযায়ী ঠাকুর বাণীকণ্ঠ পূজা আর্চনা করতেন। আট রকমের ডাল যা আটটি উনুনে সিদ্ধ হত। কুড়ি সের এক পোয়া চালের অন্ন ভোগ ইচ্ছাপুরনের জন্য। শাক থেকে শুক্তো, মায়ের নতুন পুকুরের মাছ, গোবিন্দ ভোগ চালের পায়েস, ন’শলি চালের নৈবিদ্য, পাঁচ সের করে দশ সের ওজনের দুটি কদমা। এছাড়াও পাঁঠাবলি দেওয়া হত।

শ্যামাপদবাবু জানান, “একদিন এক শাঁখারী মায়ের পুকুর পাড় দিয়ে যাচ্ছেন। এমন সময় একটি কালো রঙের বাচ্চা মেয়ে তাঁর কাছে শাঁখা পরতে চায়। শাঁখারী দু-হাতে শাঁখা পরাতেই আরও দুটি হাত বাড়িয়ে দেয় ওই মেয়েটি। শাঁখারী হতবাক হলেও আবারও দুটি শাঁখা পরিয়ে টাকা চায়। মেয়েটি তখন উত্তরে জানায়,’মন্দিরের কুলুঙ্গিতে বেলপাতা ঢাকা দু-টাকা রাখা আছে ছেলেকে দিতে বলবি।’ শাঁখারী তাঁর কথা মতো বাণীকণ্ঠ ঠাকুরের কাছে বলেন। ঠাকুর অবাক হলেও দু-টাকা সেখান থেকে দিয়ে শাঁখারীকে বলেন আমার কোন মেয়ে নেই। যে মেয়েটি তোমার শাঁখা পরেছে তাঁর কাছে নিয়ে চল। শাঁখারী বাণীকণ্ঠকে নিয়ে গেলেও মেয়েটিকে আর দেখতে পাননি। তখন ঠাকুর বুঝতে পেরে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে মাকে শাঁখা দেখানোর অনুরোধ করেন। সন্তানের অনুরোধ। মা কালী স্বয়ং পুকুরের মাঝে চার হাত তুলে শাঁখা দেখায়। সেই থেকে ওই শাঁখারীর বংশধরেরা এখনও মায়ের পুজোয় শাঁখা দিয়ে যায়। এছাড়াও রাত্রে মায়ের প্রতিমা তৈরির কাজ নিষিদ্ধ।
বর্তমানে মায়ের প্রতিমা শিল্পী অনাথ পাল জানান, “দুর্গাপুজোর পর ত্রয়োদশীর দিন মায়ের কাঠামোয় মাটি পড়বে। একবার আমাদের এক পুর্বপুরুষ রাত্রে মায়ের চক্ষুদান করছেন। ওই সময় এক অদৃশ্য হাত তার চুলের মুঠি ধরে বাইরে বের করে দিয়েছিল। পরে মন্দিরের পাশে তাল গাছে তার মুখ ঘষে ফেলে দিয়েছিল। পরের দিন সকালে স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে। অন্যদিকে, মায়ের মুর্তিতে ছিন্নভিন্ন রক্তের দাগ দেখতে পায়। তখন থেকে আজও মায়ের প্রতিমা দিনে তৈরী করা হয়।” বাণীকণ্ঠ ঠাকুরের বর্তমান বংশধর মুক্তিপদ ভট্টাচার্য্য ও সুশান্ত ভট্টাচার্য্য জানান, “অতীতের রীতি মেনে এখনও পুজো হয়। পুজোর দিন রাতভর এখনও নরনারায়ণ সেবা চলে।”
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news