কিশোর ঘোষ:
বাংলাদেশে এখন যাদের সরকার, সেই আওয়ামি লিগের এক নির্বাচিত সাংসদ স্নাতক পরীক্ষায় টুকে পাশ করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। স্বভাবতই গতকাল থেকে সেদেশে এখবরই বিগ ব্রেকিং। এসব খবর চাপা থাকে না, বরং আগুনের মতো ছড়ায়। ফলে এতক্ষণে পশ্চিমবঙ্গবাসীও জেনে গিয়েছে তামান্ন নুসরত বাবলি’র দুর্দান্ত কাজ। আসলে শেখ হাসিনার দলের ‘মাননীয়’ সাংসদ বাবলি যেভাবেই হোক নিজের গা থেকে ‘উচ্চ মাধ্যমিক’ পাশ তকমাটা ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। তার জন্য ‘উচ্চ’ পর্যায়ের পরিকল্পনাও নিয়েছিলেন। মনে রাখবেন, বাবলি কিন্তু টুকলি করতে গিয়ে নিজে ধরা পড়েননি। বরং বাবলির ‘ডামি’কে পাকড়েছে উপস্থিত পরীক্ষক। বিষয়টা বুঝিয়ে বলা দরকার। এভাবে বলা যায় যে, যেহেতু তামান্না নুসরত বাবলি সমাজের একজন ‘মান্য’ ব্যক্তি, অতএব তিনি দুর্নীতির সাহায্য নিলেও যতোটা সম্ভব সেফ খেলতে চেয়েছিলেন। তাই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের স্নাতক হওয়ার ১৩টি পরীক্ষায় আলাদা আলাদা ৮ জন ‘ডামি’ পরীক্ষার্থীকে কাজে লাগিয়েছিলেন। অর্থাৎ কিনা কোনো পরীক্ষাই তিনি নিজে দেননি। তাঁর হয়ে ভাড়া খেটেছে নকল ছাত্রীরা। বলতেই হবে, ঘটনা যতোই জালিয়াতির হোক, এই জালিয়াতের সৃজনগুণ চোখে পড়ার মতো। কারণ, যতরকম টোকাটুকির কথা আমরা এযাবৎকাল অবধি জেনে এসেছি তার তুলনায় এই ঘটনা অনেক বেশি অভিনব। হ্যাঁ, ডামির এমন খেল অন্যক্ষেত্রে শোনা যায় বটে। যেমন ধরুন, কেউকেটা একজন সামাজিক অপরাধ করল, হয়তো খুনই করে বসল, আর তার হয়ে শাস্তি ভোগ করল আরেকজন। মানে ভাড়া করা অপরাধী পিঠ পেতে কবুল করল অপরাধ। এমন কথা আমরা জানি। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থানের গাঁ-গঞ্জে এমন কাণ্ড নাকি আকছাড় ঘটে। ওই যেখানে খাপ পঞ্চায়েত খুব সক্রিয়। এরাজ্যেও কি হয় না? নিশ্চয়ই হয়। হতে পারে কম-বেশি। তবে আসল অপরাধী ভাড়ার অপরাধীর প্রাপ্য মিটিয়ে দেন কড়ায়গণ্ডায়। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের সাংসদও নিশ্চয়ই ধারবাকিতে কাজ করেননি। ধারে দুর্নীতি হয় না, ভালো কাজ হতে পারে হয়তো।
ভালো কথা, বাংলাদেশে এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে সেখানকার সাধারণ জনমানসে। সমালোচনার ঝড় বইছে। ছিঃছিক্কার পড়ে গেছে। সকলেরই বক্তব্য, একজন সাংসদ হয়ে কী করে পারলেন! আশ্চর্য তো? সাংসদ হয়েছেন বলেই তো বড় ঝক্কি নেওয়ার সাহস দেখিয়েছেন। আরেকটু হলে মিশন সাকসেসফুলই তো হয়ে যাচ্ছিল। মাঝখানে থেকে ওই ব্যাটা পরীক্ষক! ওটা কে? খবর নিতে হবে! হয়তো ঘরে বসে এসবই ভাবছেন উচ্চ মাধ্যমিক-সাংসদ। এখানেই একটা বড়সড় সত্যি সামনে এসে পড়ে, কথা হল যারা আজ ন্যায়-বোধ-জ্ঞান-বিবেকের শিক্ষক হয় তামান্না নুসরত বাবলির অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন, তারাই হয়তো কদিন আগে সোজা পথে যা হয় না তেমন সুবিধা পেতে টুকলি-সাংসদের পায়েই তেল ঘষছিলেন।
আমাদের দেশে, রাজ্যেও যেমন চোর প্রজাতিকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম দলের এরা নিরিহ চোর, মানে শুধুই চোর। বেচারারা পাবলিকের ক্যালানি খায়, গণপিটুনিতেও অহরহ স্বর্গপ্রাপ্তী হয় এদের। দয়া করে পুলিশ বাঁচালে লকাপে তুলে রাখা আরেক ধাপ ক্যালানি। তারপর কোর্ট, এবং শাস্তি। আর ক্ষমতাবান চোর? যদি তিনি রাজনৈতিক নেতা হন?
তবে তাঁকে পুলিশ খুঁজে পায় না। কিছুতেই খুঁজে পায় না! পেলেও উঁচু দামে দেশের সেরা উকিলকে আইনের মারপ্যাচ খেলতে লাগিয়ে দেন এরা। সেই উকিল আইনকে লিওনেল মেসির মতো ড্রিবল করতে করতে এমন ব্যস্ত করে তোলেন যে জামিনে জামিনে আস্ত জীবন কেটে যায় ক্ষমতাবান চোর বাবাজির। আমরা তো ছোট চোর, অতএব ঢোক গিলে বড় চোরের দরবারে দাঁড়িয়ে বলি, একটু ম্যানেজ দিয়ে দিন স্যার। তিনি ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ’। মুচকি হাসেন। বিশ্বরূপদর্শন করান আমাদের। ম্যানেজ হয়ে যায় অন্যায়!
সেই নিরিখে আওয়ামি লিগের তরুণী সাংসদ তামান্না নুসরত বাবলি বড় অন্যায় করেননি। বরং একটি চলতি অন্যায়কে মান্যতা দিয়েছেন কেবল। আমার বিশ্বাস, যেহেতু তাঁর ডামি-টুকলি অভিনব তাই এত কথা বলছে লোকে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news