সুমন ভট্টাচার্য
মেরে পাস অভিজিৎ হ্যায়!
অমিতাভ বচ্চনের ‘জঞ্জির’ সিনেমার সেই আইকনিক সংলাপের অনুকরণে রাজনৈতিক নাটক বা কুনাট্য দেখলাম আমরা গত এক সপ্তাহ ধরে। ‘জঞ্জির’-এ অমিতাভ বচ্চনের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর পুলিশ অফিসার ভাই, শশী কাপুর বলেছিলেন, ‘মেরে পাস মা হ্যায়’। আর অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়ার পর থেকে তিনি কাদের সঙ্গে রয়েছেন, সেই নিয়ে বিবৃতি, হোর্ডিং এবং দখল নেওয়ার লড়াই দেখলাম আমরা।
কিন্তু দেশে ফিরে এটা কী করলেন অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়? শুধু যে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দেখা করলেন তাই নয়, বহুল প্রচারিত বাংলা সংবাদপত্রের মালিক-সম্পাদককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সোজাসুজি জানিয়ে দিলেন, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য এবং নামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেগুলিকে একসময় ‘সেন্টার ফর এক্সিলেন্স’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো, সেগুলিকে নষ্ট করার জন্য বাম শাসনই দায়ী। বহুল প্রচারিত ওই সংবাদপত্রে দেওয়া দীর্ঘ এবং অকপট সাক্ষাৎকারে সদ্য নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ পরিষ্কার করে দিয়েছেন, এটা তাঁর শুধু ব্যক্তিগত উপলব্ধি নয়, তাঁর বাবা, দীপক বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তণ প্রধান ছিলেন, তাঁরও দীর্ঘ অধ্যাপনা জীবনের বিশ্বাস ছিল।
বুধবার প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারের পরে বামেরা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এবং কোন যুক্তিতে আর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদকে ‘নিজেদের লোক’ বলে দাবি করে, সেটাই দেখার। কলকাতায় ফেরার পর অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় যা যা বলেছেন, তা বামদের তো বটেই, সিপিএমের তাত্ত্বিক নেতা এবং প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্তকে অস্বস্তিতে ফেলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ঠ। স্বভাবতই নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদকে নিয়ে প্রথম দিকে বামেরা যে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছিল, বুধবার থেকে তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এমনকি সিপিএমের মুখপাত্র গণশক্তিতেও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের কলকাতায় ফেরার সংবাদ চলে গিয়েছে এক্কেবারে পিছনে।
বামেরা মনে হয় জানতেন না যে অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনৈতিকভাবে বা গবেষণার দিক থেকে ঠিক কোথায় অবস্থান করেন। জানলে তাঁরা অনুমান করতে পারতেন যে যেদিন বামপন্থীরা গোটা দেশে ব্যাঙ্ক ধর্মঘট পালন করছেন, সেদিনই নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ দিল্লিতে নেমে ভারতীয় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় আরও সংস্কার এবং সরকারকে আরও সাহসী হতে বলবেন। তাত্ত্বিক দিক থেকে অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে এইরকম ‘সপাটে থাপ্পড়’ হয়তো সীতারাম ইয়েচুরি বা সুজন চক্রবর্তীরা প্রত্যাশা করেননি। ফলে তাঁদের ‘মেরে পাস অভিজিৎ হ্যায়’ স্লোগান একেবারেই মাঠে মারা গিয়েছে।
একই অবস্থা পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলেরও। মঙ্গলবার থেকেই গোটা কলকাতা শহর ছেয়ে গিয়েছিল অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ছবি দেওয়া হোর্ডিংয়ে। তাঁবেদার সংবাদপত্রগুলিও ঢক্কানিনাদ করতে শুরু করে দিয়েছিল অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শাসকদলের সম্পর্ক নিয়ে। সমস্যা হচ্ছে, রাজ্যের শাসক দলের অমিত মিত্র, ব্রাত্য বসু বা নির্বেদ রায়ের মতো হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া হয়তো কেউই জানেন না নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ঠিক কী নিয়ে কাজ করেন এবং কোন ধরনের অর্থনীতির জন্য সওয়াল করেন। তাই শাসক দলের যে সব নেতারা হয়তো নেত্রীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদকেও মঞ্চে তুলে ‘নিজেদের লোক’ বলে প্রচার করা যাবে বা বিজেপি দামোদর বিনায়ক সাভারকরকে যখন ‘আইকন’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, তখন তার পাল্টা হিসেবে রাজ্য সরকারও ‘বিনায়কশ্রী’ চালু করে নিজেদের দিকে হাওয়া ঘুরিয়ে দিতে পারবে, তখন আসলে বাস্তবের কিছুই জানতেন না তাঁরা।
ঠিক যেমন রাজ্য বিজেপির যে সব নেতা টেলিভিশনের সামনে অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করে নিজেদের নম্বর বাড়াবেন বলে ভাবছিলেন, তাঁরাও অনুমান করতে পারেননি স্বয়ং নরেন্দ্র মোদী নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের সঙ্গে চা খাবেন এবং সেই সাক্ষাৎকার নিয়ে ট্যুইটও করবেন। ‘অ্যান্টি ক্লাইম্যাক্স’-এর এই রকম ঘনঘটা বোধহয় বলিউডের গত বছরের হিট ছবি ‘অন্ধাধুন’-এও ছিল না।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news