সুমন ভট্টাচার্য : 
আমি রোল না দিলে, ওরা সিনেমা পাবে কোথা থেকে?’ উত্তমকুমারের এই সংলাপটুকুতে খুব ছোটবেলায় কিছু বুঝতে পারিনি। কিন্তু মনে আছে, হতবাক হয়ে যাওয়া আমার বাবা বলেছিলেন, ‘সে কি বলছেন, যারা আপনার এতো নিন্দা করেন, আপনার সমালোচনা না করে কোনও ইন্টারভিউ দেয় না, তাদের আপনি রোল পাইয়ে দিচ্ছেন?’ মনে আছে, জবাবে উত্তমকুমার সেই বিশ্ববিখ্যাত হাসিটি দিয়েছিলেন। অনেক পরে বড় হয়ে বুঝেছিলাম, আসলে বাংলা সিনেমার ম্যাটিনি আইডল কি বলতে চেয়েছিলেন। তাঁর চরম বিরোধী, নিজেকে বামপন্থী বলে প্রচার করতে ব্যস্ত থাকা নায়ক থেকে নায়ক হতে চাওয়া কতজনকে যে তিনি সিনেমায় রোল পাইয়ে দিতেন, তার ইয়ত্তা ছিল না। কারণ, তখন উত্তমকুমার মানেই বাংলার চলচ্চিত্র শিল্প, আর তিনি অভিনয় করলেই সিনেমা হিট। তাই অনেক তথাকথিত ‘বিপ্লবী’কেও উত্তমকুমারের সাহায্যে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে টিকে থাকতে হতো।
সোমবার রাঢ়বঙ্গের এক জেলা শহর থেকে কলকাতায় আসতে আসতে মনে হলো, তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কি এখন বাংলার রাজনীতির উত্তমকুমার? যাঁর অনুগ্রহে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস, সিপিএমরা আসলে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছে। না হলে সোমবারে কংগ্রেস এবং বামেদের ডাকা বনধে দেশের এই তথাকথিত প্রধান বিরোধী দলকে এতো অসহায় দেখালো কেন? আমাদের যাঁদের বামেদের ডাকা বনধের অতীত স্মৃতি মনে আছে, তাঁরা জানি ৮০ কিংবা ৯০ এর দশকে বনধের চেহারাগুলি কি রকম হতো! মনে আছে, একবার বনধের আগে ৯০এর দশকে জঙ্গি সিটু নেতারা হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন, বনধ সফল করতে তারা রাস্তায় ঝান্ডা নিয়ে থাকবেন। বনধ ব্যর্থ করতে কেউ রাস্তায় নামলে সেই ঝান্ডার তলায় থাকা ডান্ডাও যে ব্যবহৃত হবে, সেটাও সিটু নেতারা বিলক্ষণ জানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু যেমন সেই রামও নেই, আর অযোধ্যাও নেই, তেমনই মহাকরণ থেকে সিপিএমের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা থেকে লালঝান্ডা তো উধাওই, ডান্ডা হাতে সিপিএম সমর্থকদের দাপাদাপি করতেও আর দেখা যায় না!
রবিবার রাতেই রাজ্যের এক ডাকসাইটে কংগ্রেস নেতা হোয়াটসঅ্যাপে জানিয়ে দিয়েছিলেন, সোমবার কি কি দাবিতে তাঁরা বনধ ডাকছেন। পূর্ব বর্ধমান থেকে হুগলি হয়ে কলকাতা আসার সময় সেই কংগ্রেস নেতা বা তাঁর সমর্থকদের খুজছিলাম। দূর্ভাগ্যের কথা, বন্যেরা যেমন বনে সুন্দর, এবং শিশুরা মাতৃক্রোড়ে, তেমনই এই রাজ্যের কংগ্রেস নেতাদের যাবতীয় অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা টেলিভিশনের পর্দায়। তাই হুগলির কোন মোড়েই তেরঙ্গা ঝান্ডা নিয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না। এর আগে এই চ্যানেল হিন্দুস্তানেই ২০২১ এর নির্বাচনে কি ধরনের পরিস্থিতি দাড়াতে পারে, সেই নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম। তাতে ২০২১এ বিধানসভার নির্বাচনের আগে পশ্চিবঙ্গের রাজনীতিতে বাম এবং কংগ্রেসকে কতটা মমতা বন্দোপাধ্যায়ের উপর নির্ভর করতে হবে, তাই নিয়ে কিছু কাল্পনিক প্রসঙ্গের অবতারনা ছিল। পরবর্তীকালে কলকাতা দুরদর্শনের একটি অনুষ্ঠানে দেখা হওয়ায় কংগ্রেসের এক তাত্ত্বিক নেতা আমাকে সেই নিয়ে অনুযোগ করেছিলেন। কিন্তু সোমবার সকালে কংগ্রেসের তাত্ত্বিক কিংবা মাটির কাছাকাছি থাকা কোনও নেতাকেই দেখতে পেলাম না বনধ সফল করতে রাস্তায় নামতে।
তাহলে? অত:কিম? সোমবার অন্তত মমতা বন্দোপাধ্যায় দেখিয়ে দিলেন কেন বাংলার রাজনীতিতে যাবতীয় আলোচনা শুধুমাত্র তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। এখানে বলে রাখা ভালো, আমি ব্যক্তিগতভাবে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের প্রশাসন চালানোর ধরণ, তাঁর সংখ্যালঘু তোষণের নীতি কিংবা তাঁর শিক্ষানীতির বিরোধী। এমনটা নয় যে আমার বিরোধিতায় মমতা বন্দোপাধ্যায়ের কিছু এসে যায়! কিন্তু যদি রাজনীতিক হিসাবে তাঁকে নম্বর দিতে হয়, তাহলে তাঁকে বোধহয় একশোতে দেড়শো দিতে হবে। যে নিপুণ দক্ষতায় তিনি সোমবার কংগ্রেস এবং বামেদের ডাকা ভারত বনধকে পশ্চিমবঙ্গে ব্যর্থ করে দিলেন, তাতে অন্তত সূর্যকান্ত মিশ্র, মহম্মদ সেলিমদের সর্বভারতীয় রাজনীতির চিত্রনাট্যে সাইডরোল পাওয়াও মুসকিল, নেহাতই জনি লিভারের মতো কমিক রিলিফের জন্য তাদের কথা ভাবা যেতে পারে। আর পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসিদের কথা না হয় বাদই দিলাম।
কেন রাজনীতিক হিসাবে মমতা বন্দোপাধ্যা্য়কে এতো নম্বর দিচ্ছি? মনে রাখবেন গত সপ্তাহেই মাঝেরহাটে ব্রিজ ভেঙে পড়েছে, তাঁর সরকারে পূর্তমন্ত্রী কি দায়িত্ব পালন করেছিলেন, সেই নিয়ে গোটা রাজ্য জুড়ে চর্চা চলছে। বেহালা সহ দক্ষিণ ২৪ পরগণার একটা বিস্তৃত অংশের মানুষজনকে কলকাতায় আসতে নাজেহাল হতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিজেপি বিরোধী ‘মহাগঠবন্ধন’ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কংগ্রেস এবং বামেরা ভারত বনধ ডেকেছিল। সেই বিজেপির বিরুদ্ধে ভারত বনধ, যে বিজেপি এই মুহূর্তে রাজ্যে প্রধান বিরোধী শক্তি এবং যে বিজেপির প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মমতা বন্দোপাধ্যায় নিত্যদিন কামান দাগেন। তাহলে তো সোমবারের ভারতবনধ এই রাজ্যেও সফল হওয়ার কথা! কিন্তু এখানেই তো মমতা বন্দোপাধ্যায়ের রাজনীতির কৌশল, বাম এবং কংগ্রেসের ডাকা বনধের বিরোধিতা করে তিনি যে শুধু তাদের রাজ্যরাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিকই করে দিলেন তাই নয়, আর একবার রাজ্যবাসীকে বোঝালেন রাজনীতির ব্যটনটা কার হাতে রয়েছে।
গত এক সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যেরকম ঘূর্ণি পিচ তৈরি হয়েছিল, তাতে সোমবারে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ইনিংস ব্যাঙ্গালোরের ঘূর্ণি পিচে গাভাস্কারের করা ৯৭ রানকে মনে করাবে। সতর্ক, কিন্তু একাগ্রতায় প্রতিটি বল দেখে খেলায় অনবদ্য।
৯০ এর দশকে এইরকম কোনও প্রতিবেদন লিখতে গেলে আমাদের আর এক সিনিয়র সাংবাদিক, পরবর্তীকালে সাংসদ হয়ে যাওয়া কুনাল ঘোষ একটা স্টাইল অনুসরণ করতেন। লেখার শেষে কিছু টিপ্স থাকতো রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য। এই লেখার শেষে সেই রকম কিছু টিপ্স দেওয়ার লোভ সংবরণ করতে পারছি না।
১. মমতা বন্দোপাধ্যায় ‘গ্রাভিটি’ নিয়ে কি বলেছেন, অথবা কতটা ভুল ইংরাজি বলেন, তাই নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় রসিকতা করে কোনও লাভ নেই। তৃণমূল সুপ্রিমো যাঁদের সঙ্গে কমিউনিকেট করতে চান, তারা ওই ভাষাটাই বোঝেন। তৃণমূল নেত্রীর ভাষা নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপের পরিবর্তে রাজনীতিতে মন দিলে হয়তো বামেরা নিজেদের কোথাও দেথতে পাবেন।
২. মমতা বন্দোপাধ্যায়কে ‘মমতাজ বেগম’ বলে আসলে হিন্দুত্ববাদীরা নিজেদেরই ক্ষতি করছেন, আরও বেশি করে তৃণমূল নেত্রীর দিকে সংখ্যালঘুরা ঢলে পড়ছেন। নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া সেলকে যে পরামর্শটি দিয়েছেন, সেটি বরং মাথায় রাখলে ভালো। সোশ্যাল মিডিয়াকে সেক্ষেত্রে ‘নোংরা’ করা বা তিক্ততা তৈরি করা এড়ানো যাবে।
৩. কেন মমতা বন্দোপাধ্যায় বাংলার রাজনীতিতে এতো অবিসংবাদী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন, সেটা আইডেন্টিফাই করা জরুরি। কেন আমজনতা তাঁর সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পারে, সেটা বুঝতে না পারলে মমতা বন্দোপাধ্যায়কে চ্যালেঞ্জ জানানো যাবে না। কেন মমতা বন্দোপাধ্যায় ক্রমশ বাঙালি ‘অস্মিতা’র প্রতীক হয়ে উঠছেন, সেটা বুঝতে না পারলে তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে টক্কর দেওয়া যাবে না।
যে মমতা বন্দোপাধ্যায়কে আমি চিনতাম, তিনি এরকম খুশির দিন হলে গুনগুন করে গান গাইতেন। সেই গান অবশ্যই রবীন্দ্রসংগীত হতো। অনুমান করার চেষ্টা করছি, সোমবার নবান্নে ঢুকতে ঢুকতে মমতা বন্দোপাধ্যায় কোন রবীন্দ্রসংগীতটা গুনগুন করে গাইবেন? ‘সুখহীন নিশিদিন’? ধুর, ওটা তো এখন আলিমুদ্দিনের নেতাদের মোবাইলের রিংটোন হওয়া উচিত।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news