দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় : 
সেদিন নন্দীগ্রামে গুলি চলেছে। নন্দীগ্রামের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিক বৈঠক ডেকেছেন। দেশের প্রায় সবকটি সংবাদমাধ্যম হাজির হয়েছে ৩০/বি হরিশ চট্টোপাধ্যায় স্ট্রীটে, মমতার বাসভবনে। শিক্ষাবিদ সুনন্দ সান্যাল ও গায়ক কবীর সুমনদের পাশে বসিয়ে মমতা টানা তিন দিনের বনধ ডাকলেন। তখন রাজ্যে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলছে। উপস্থিতি একজন সাংবাদিক তৎকালীন বিরোধী নেত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “মাননীয়া প্রধান বিরোধী নেত্রী আপনি কি মনে করেন না যে এই তিনদিনের বনধ উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জীবনেও বনধ ডেকে দিল?” কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে মমতা সেই সাংবাদিককে পাল্টা জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কোন চ্যানেল?”
এরপর বেশ কিছুকাল কেটে যাওয়ার পর পুজো পরবর্তী এক বিকেলে বণিকসভার প্রতিনিধিদের নিয়ে আয়োজিত একটি বিজয়া সম্মিলনীতে মমতা ঘোষণা করলেন তিনি বনধ চান না। তিনি বনধ বিরোধী। বামেদের ইউনিয়নের নামে দাদাগিরি ও কথায় কথায় বনধে বিরক্ত শিল্পমহলের কাছে মমতার সেদিনের সেই বার্তা ছিল অমৃতসমান। তার কিছুদিন আগেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বনধের বিরোধিতা করে দলের মধ্যেই চাপে পড়েছিলেন। সিপিএমের মতো দলে বুদ্ধবাবুর মতো কাজ করতে চাওয়া মুখ্যমন্ত্রীকে চাপে ফেলার জন্য কেরলের কারাত কেন বর্ধমানের অমল হালদারই ছিলেন যথেষ্ট। সে দিক দিয়ে দেখলে মমতা ঝাড়া হাত পা। তিনি বাহুবলী ছবির দেবগামিনী দেবী। তাঁর বচনই তৃণমূলের মাহিস্মতীতে শাসন (আইন)!
এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার বামফ্রন্ট সরকার তখন ঘরে বাইরে এতটাই জর্জরিত যে কয়েকদিন আগের টাটা বিদায় ও নন্দীগ্রামে শিল্প সম্ভাবনার দফারফা হওয়ার পরেও বণিক মহল মমতার কথাতেই ভর্সা করেছিলেন। বুদ্ধবাবুর শিল্প প্রয়াসের পরাজয়ের দায় কতটা মমতার সাফল্য আর কতটা বামফ্রন্টের ব্যর্থতা তা ভিন্ন আলোচনা। তবে এখানে এইটুকু উল্লেখ করা যায়, সেই সময় মমতার মিটিং-এ প্রথমবার এসে সৈফুদ্দিন চৌধুরী বলেছিলেন, “নন্দীগ্রামের গুলি চালনা শুধুমাত্র ১৪ জন কৃষককেই হত্যা করল না, রাজ্যের শিল্প সম্ভাবনাকেও হত্যা করল।” একই সঙ্গে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। যেদিন রতন টাটা মহাকরণে এলেন, সেদিন সকাল পর্যন্ত বামফ্রন্টের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও মন্ত্রীর মাথায় ছিল মহাকরণে টাটার সঙ্গে বৈঠকে মমতাকেও আমন্ত্রণ জানাবেন। তবে মমতার দিক থেকে প্রতিক্রিয়া কেমন হবে সেই সংশয়ে (সম্ভবত আশঙ্কাতেও!) তা আর করা হয়ে ওঠেনি।
একটি কথা মানতেই হবে এই ‘কেউ কথা রাখেনি’র যুগে বণিক মহলকে দেওয়া সেদিনের কথা আজও রক্ষা করে চলেছেন মমতা। তিনি বনধ ডাকেননি। তাই বলে বণিক মহলকে তিনি খুব খুশি করতে পেরেছেন এমনটাও বলা যায় না। বনধ নেই তো কী! সিন্ডিকেট আছে, তোলাবাজি আছে, হুমকি আছে। রাজ্যের কপালে বৃহৎ শিল্পের হাহাকার তো আছেই উল্টে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া আছে।
ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত’র কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের আশীর্বাদধন্য মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যে জোড়া ফুল ফুটিয়েছেন বটে তবে শিল্পের বসন্ত আজও অধরা।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news