Breaking News
Home / TRENDING / ইতিহাস ও ঐতিহ্যে শতবর্ষের পথে বালি ব্রিজ

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে শতবর্ষের পথে বালি ব্রিজ

পার্থসারথি পাণ্ডা : 

বাংলার এক তীর্থের দুই দ্বার, বেলুড় আর দক্ষিণেশ্বরকে রেল-সড়কে জুড়ে দিয়ে যে সেতুটি ধন্য হয়েছিল, তার নাম ‘ওয়েলিংডন ব্রিজ’। দেখতে দেখতে সেও সাতাশি বছরের সফর সেরে এ-বছর অষ্টআশিতে পা দিল। ব্রিটিশ আমলে গঙ্গার ওপর গড়ে ওঠা দুই প্রাচীন সেতুর মধ্যে জুবিলি ব্রিজের থেকে এটি ছেচল্লিশ বছরের ছোট এবং হাওড়া ব্রিজের থেকে এগারো বছরের বড়। ১৯৩১ সালের ২৯ ডিসেম্বর ভারতের তখনকার ভাইসরয় ফ্রিম্যান-টমাস, ফার্স্ট মারকেজ অব উইলিংডন এই সেতুটি উদ্বোধন করেন। এদিনই সেতুর রেলপথে প্রথম হাওড়া শিয়ালদা ট্রেন চলে। সুতরাং, ২৯ ডিসেম্বরই এই সেতুর জন্মদিন। উদ্বোধক হিসেবে ভাইসরয়কে স্মরণীয় করে রাখতে তাঁর নামেই সেতুর নামকরণ করা হবে ঠিক হল। কিন্তু উপাধি মিলিয়ে নামখানা তাঁর বিঘতখানেক লম্বা, সমস্তটা মিলিয়ে নাম দিতে গেলে ব্রিজের নাম বলতেই দিন কাবার হবে। তাই উপাধির অর্ধেক নিয়ে এই সেতুর নাম দেওয়া হল, ‘ওয়েলিংডন ব্রিজ’। অবাঞ্ছিত আগাছা আর শ্যাওলার আড়ালে সাদা পাথরের অনুজ্জ্বল ফলকে সেতুনাম এখনও সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য দিচ্ছে। নামটি ছোট হল বটে, বঙ্গবাসীর রসনায় তবুও তা আটকাল, বালি অঞ্চলের ওপর দিয়ে এই ব্রিজ তৈরি হয়েছে বলে স্থাননামে এর ডাকনাম হয়ে গেল, ‘বালি ব্রিজ’। স্বাধীনতার পরে আর একবার নাম বদল হল সেতুটির। গঙ্গার এপার-ওপার রামকৃষ্ণতীর্থ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন যে মানুষটি, ঠাকুরের পরম প্রিয় শিষ্য সেই বিবেকানন্দের নামে সেতুর নাম হল, ‘বিবেকানন্দ সেতু’।

সেতুটি তৈরি হয়েছিল সম্পূর্ণ স্বদেশী ইঞ্জিনিয়ার ও মিস্ত্রি দিয়ে। যারা তৈরি করেছিলেন তাঁরা সবাই তখনকার গুর্জর (এখনকার গুজরাট) প্রদেশের লোক ছিলেন। স্থপতির নাম জাগমল রাজা চৌহান। জাগমলের জন্ম ১৮৮৭ সালে কছ অঞ্চলের নাঘর গ্রামে। তাঁর গ্রামের সবারই বেশ নামডাক ছিল রাজমিস্ত্রীর কাজে। গ্রামের দক্ষ রাজমিস্ত্রীদের নিয়ে তাঁর বাবা শুরু করেছিলেন দেশীয় রাজামহারাজাদের প্যালেস তৈরির কাজ। তখন দিকে দিকে রেলপথ তৈরি হচ্ছে, তিনি সে কাজের বরাত নিয়ে খুব সুনামের সঙ্গে কাজ করে দেশের বড় একজন ইঞ্জিনিয়ার কাম আর্কিটেক্ট কাম কন্ট্রাক্টর হয়ে উঠলেন। জাগমলের তখন বারো বছর বয়স, বাবা তাঁর কাছে তখন রোল মডেল, তাই স্কুলের প্রথাগত লেখাপড়ার মুখে ছাই দিয়ে বাবার সঙ্গে কাজে ভিড়ে গেলেন। বাবার কাছে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও হাতেকলমের শিক্ষা পেয়ে তিনি বাবার প্রকৃত উত্তরসূরি হয়ে উঠলেন। সুনাম নিয়ে সরকারি কাজের সূত্রে ইংরেজদের সঙ্গে দহরম মহরম হল। দক্ষ ও দারুণ কাজের সূত্রে সরকারের ওপর মহলের সঙ্গে বিশ্বাস ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হল। পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণের অসংখ্য রেলপথ ছাড়াও কছের দরিয়া মহল তাঁরই নির্মাণ। কলকাতায় খিদিরপুর ডকের যেটা এখনকার নেতাজি সুভাষ ইয়ার্ড, সেটাও তাঁর হাতেই তৈরি। এরপরই তিনি বালি ব্রিজ তৈরির কাজে হাত দেন। ১৯২৬ সালে কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৩১-এ। ব্রিজের গায়ে কালের ধুলো সরালেই চোখে পড়বে, স্থপতির কীর্তিপত্র–‘Erection & Construction done by Rai Bahadur Jagmal Raja, Allahbad’। তাঁকে এবং তাঁর কাজকে যে কতদূর শ্রদ্ধা করত ইংরেজ সরকার, তার পরিচয় পাওয়া যায় এই ব্রিজের ওপর দিয়ে প্রথম যে ট্রেনটি চলেছিল তা কোনও লাটবাহাদুরের নামে না-করে জাগমলের নামে–‘জাগমল রাজা হাওড়া এক্সপ্রেস’ নামকরণ করার মধ্য দিয়ে।

 

বি টি রোড ও গ্র্যান্ড ট্যাঙ্ক রোডকে মিলিয়ে দিয়ে বালি ব্রিজ এগিয়ে চলেছে শতবর্ষের পথে। তারই মধ্যে বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে বারে বারে উঠেছে প্রশাসনিক উদাসীনতার অভিযোগ। টোলঘর পরিত্যক্ত, সেখানে ভবঘুরে ও দুষ্কৃতীদের আড্ডা, এপার ওপারে আগাছার কামড়, গুটখাখোরদের রসজ্ঞাপন, বাতিহীনতা, নিরাপত্তাহীনতা এমন আরও কত অভিযোগ এখনও উঠছে। তবু, আজ জন্মদিনে এসব পেরিয়ে একটাই প্রার্থনা, বালি ব্রিজ এপার ওপারের অন্যতম সেতু হয়ে শতবর্ষ পরেও সাক্ষী দিতে থাকুক বিদেশী শাসনে স্বদেশ-সম্মানের।

 

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *