পার্থসারথি পাণ্ডা : 
১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ১৯০৪ অব্দি সেখানে ক্লাস হত না, স্নাতকোত্তর পড়ানোও হত না। তখন এম এ পড়ানো হত কলেজে কলেজে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু ছাত্রছাত্রীদের মাইনে, পরীক্ষার ফি নেওয়া হত আর প্রশ্নপত্র তৈরি করার কাজ হত এবং তার জন্য মাঝে মাঝে অধিবেশন বসত।
১৯০৪ এ কলকাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হয়ে এলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। বাংলার বাঘ। তিনিই এসে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পড়ানোর রীতি চালু করলেন। কলেজ থেকে এম এ ক্লাস তুলে দিলেন। অবশ্য তার জন্য তাঁকে কম বিরোধীতার সম্মুখীন হতে হয়নি, কিন্তু অসাধারণ বাগ্মী এই মানুষটির যুক্তিজালের কাছে কোন বিরোধীতাই ধোপে টিকল না। স্বয়ং ভাইসরয় তাঁকে সমর্থন করলেন। ফলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়ানোর আর কোন বাধাই রইল না। তাঁর ডাকে পড়ানোর জন্য দেশের নানান প্রান্ত, নানান কলেজ থেকে পণ্ডিতেরা ছুটে এলেন এখানে। তৈরি হল সিলেবাস। তাঁর অনুরোধে দীনেশচন্দ্র সেন লিখলেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস। বাংলা বিভাগের জন্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়ানোর নতুন এই রীতি চালু হওয়ায়, ছাত্রছাত্রীরা গেল বেশ ঘাবড়ে– পড়ানো, পরীক্ষা পদ্ধতি , প্রশ্নপত্র কেমন হবে এই সব নিয়ে। আশুতোষ ছাত্রদরদী মানুষ। অধ্যাপকদের বলে দিলেন যে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অধ্যাপকদের বিদ্যে জাহির করার জায়গা নয়, প্রশ্নপত্র যেন মাঝারি মানের ছাত্রছাত্রীদের কথা মাথায় রেখে করা হয়। আর সমস্ত প্রশ্নপত্রই আগে স্ক্রুটিনি করবেন তিনি, তারপর তা ছাপা হবে।
বছর শেষে পরীক্ষার দিন ঘনিয়ে এলো। সে-সময়ই একদিন গণিতে অসাধারণ পণ্ডিত অধ্যাপক গৌরীশঙ্কর দে মশাই অঙ্কের প্রশ্নপত্র তৈরি করে, সেখানা হাতে নিয়ে গেলেন আশুতোষের বাড়ি। আশুতোষ তখন খালি গায়ে দাওয়ায় থেবড়ে বসে আছেন। আর চাকর বনমালী তাঁকে ডলাইমলাই করে তেল মাখাচ্ছে। গৌরীবাবু সটান তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, স্যার, অঙ্ক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি, যদি একটু দেখে দেন…। আশুতোষ তাঁর হাত থেকে কাগজটা নিয়ে চোখ বুলিয়ে একটু গম্ভীর হলেন। তারপর মুখে ‘হুম’ শব্দ করে বললেন, গৌরীবাবু আপনার হাতে ঘন্টা আড়াই সময় আছে? গৌরীবাবু ব্যাপারখানা কিছু না বুঝে একটু ভ্যাবলার মতোই বললেন, আজ্ঞে তা আছে, কেন স্যার? আশুতোষ বনমালীকে আদেশ দিলেন, বুনো, গৌরীবাবুকে কাগজ আর কলম এনে দে। আদেশ পাওয়া মাত্রই বনমালী ছুটল কাগজকলম আনতে। তখন আশুতোষ গৌরীবাবুর দিকে ফিরে বললেন, আমি স্নানটা সেরে আসি বুঝলেন, আপনি ততক্ষণে যে প্রশ্নপত্রটি তৈরি করেছেন তার অঙ্কগুলো বরং কষে ফেলুন। তারপরই আশুতোষ কাঁধে গামছা ফেলে চলে গেলেন স্নানে।
এদিকে বুনো কাগজকলম নিয়ে হাজির হল গৌরীবাবুর সামনে। স্যারের আদেশ, কি আর করেন, গৌরীবাবু ঠোঁট কামড়ে মুখ কাঁচুমাচু করে বসলেন অঙ্ক কষতে।
ঝাড়া আড়াই ঘন্টা বাদে তাঁর সামনে এলেন আশুবাবু। তখন পরীক্ষা হত আড়াইঘন্টার। আশুবাবু তাঁকে বললেন, আড়াই ঘন্টা কিন্তু ওভার গৌরীবাবু। আপনার প্রশ্নপত্রের সব অঙ্ক কষে ফেলেছেন তো? গৌরীবাবু আর এক প্রস্থ মুখ কাঁচুমাচু করে বললেন, না স্যার, দু’তিনটে এখনো বাকি আছে। এবার আশুবাবু হেসে ফেললেন, তাহলেই বুঝুন, নিজের তৈরি প্রশ্নপত্র আপনার মতো পণ্ডিত মানুষের যদি আড়াই ঘন্টা পার হয়ে যায়, অল্পমেধার ছাত্রছাত্রীরা পারবে কেমন করে? যান, বাড়ি গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় তাদের কথা মাথায় রেখে নতুন করে একখানা প্রশ্নপত্র তৈরি করুন…
আসলে ছাত্রছাত্রীদের অসম্ভব ভালবাসতেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, তাদের কথা ভাবতেন, তাই তো তিনি তাদের কাছে অশেষ শ্রদ্ধা আর ভালবাসার মানুষ হয়ে উঠেছিলেন; কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন গৌরবের চূড়ায়… সেই মানুষটির আজ জন্মদিন..
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news