সুমন ভট্টাচার্য :
২০১৫য় যেদিন অরবিন্দ কেজরিওয়াল দিল্লিতে বিজেপিকে ৬৭-৩এ উড়িয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসেছিলেন, ঠিক সেদিন তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে আপ-এর দফতরে পৌঁছেছিলেন সেই সময় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর সম্পাদক এবং জনপ্রিয় টেলিভিশন উপস্থাপক শেখর গুপ্ত। আপ-এর দফতরে যাওয়ার এবং দিল্লি বিজয়ের দিনে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের স্বেচ্ছাসেবকদের উৎসব, উচ্ছ্বাস নিয়ে শেখর একটি অসাধারন লেখা লিখেছিলেন। যেহেতু ২০১৫-র ওই দিনটিতে আমিও দিল্লিতে ছিলাম এবং আপ-এর বিজয় উৎসব দেখার একটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমারও ছিল, তাই শেখরের লেখার প্রতিটি শব্দ এখনও আমার স্মৃতিতে আছে।
শেখর লিখেছিলেন, আপ-এর দফতরে বলিউডের যে সব হিট গান বাজিয়ে তিনি স্বেচ্ছাসেবকদের নাচতে দেখেছিলেন, তা তিনি তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের দফতরে কোনওদিন দেখেননি। এমনকি উত্তরপ্রদেশ কিংবা পাঞ্জাবেও কোনও রাজনৈতিক দলের জয়ে এইরকম উচ্ছ্বাস তাঁর চোখে পড়েনি।
শেখরের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ দিয়ে এই লেখা শুরু করার কারণ, অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং তাঁর দল, আম আদমি পার্টির রাজনৈতিক এবং শ্রেণীগত চরিত্রকে বুঝে নেওয়া। আম আদমি পার্টি আদতেই একটি দক্ষিণপন্থী দল, যোগেন্দ্র যাদবের মতো যে সব তথাকথিত তাত্ত্বিক বামপন্থীরা একেবারে প্রথমদিকে আপ-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের অরবিন্দ কেজরিওয়াল আক্ষরিক অর্থেই গলা ধাক্কা দিয়ে দল থেকে বার করে দিয়েছেন। এবারেও আপ যাঁদেরকে প্রার্থী করেছে, তাঁদের মধ্যে একটা বড় অংশ কংগ্রেস বা বিজেপি থেকে আসা নেতা। আপ-এর এবারের জয়ী বিধায়কদের মধ্যেও এঁদের সংখ্যা অন্তত ১৫।
তাই অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলা বা মন্দিরে পুজো দিতে যাওয়া নিয়ে বামপন্থীদের দূঃখ পেয়ে কোনও লাভ নেই। দিল্লিতে বিজেপি হেরেছে, এই নিয়ে বামেরা অবশ্যই খুশি হতে পারেন। কিন্তু যিনি জিতেছেন, অর্থাৎ অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তিনি কোনওমতেই বামেদের লোক নন। এইটা যত তাড়াতাড়ি সীতারাম ইয়েচুরি বা সূর্যকান্ত মিশ্ররা বুঝে যাবেন, ততই বামেদের মঙ্গল। জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে যতই বামেরা মিছিল করুক, পাশের বিধানসভা কেন্দ্রে বামেরা এক শতাংশও ভোট পায়নি। তাই অরবিন্দ কেজরিওয়ালের জয়কে ‘নিজেদের জয়’ বলে দেখানোর চেষ্টাটা ততটাই হাস্যকর, যতটা হাস্যকর মার্কিন মুলুকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিস্পর্ধী, ডেমোক্রাটদের হয়ে যিনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে চান, সেই বেনি স্যান্ডার্স রোজ রাতে প্রকাশ কারাত বা বিমান বসুর সাথে পরামর্শ করেন, এই রকম ‘গল্প’ সোশ্যাল মিডিয়ায় চালানোর চেষ্টা করা।
‘বন্যেরা বনে সুন্দর, এবং বামপন্থীরা ফেসবুকে’, এই আপ্তবাক্যটি স্মরণে রেখে যে সব বামপন্থী সোশ্যাল মিডিয়ায় বেনি স্যান্ডার্স সম্পর্কিত যেকোনও কিছুকেই ‘লাল পতাকা দিয়ে হোয়াইট হাউস ঘেরো’ টাইপের স্লোগানের সঙ্গে শেয়ার করে চলেছেন, তারা যেমন মার্কিন মুলুকের রাজনীতি বোঝেন না, তেমনই অরবিন্দ কেজরিওয়াল আসলে কোন ভাবধারার লোক, সেটা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন। একসময় গোবিন্দচার্য ঘনিষ্ঠ অনুগামী এই প্রাক্তন আইআরএস কোনওমতেই বামপন্থী নন। ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনের সময় তিনি বালাকোট বিমান হানা বা পুলওয়ামা নিয়ে মোদীকে আক্রমণ করে এই দিল্লিতেই ভোট সংখ্যার বিচারে তৃতীয়স্থানে চলে গিয়েছিলেন। এইবার প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শে তিনি আর সেই পথে হাঁটেননি, তাই দিল্লি নির্বাচনে জেতার পরেই তিনি ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলতে দ্বিধা করেননি।
সিপিএম এবং তাদের সমর্থকদের বুঝতে হবে, আজকের পৃথিবীতে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব বা ‘লংমার্চ’ এর কথা বলাটা প্রায় স্মার্টফোনের যুগে টাইপরাইটর কাঁধে করে ঘুরে বেড়ানোর মতো। মোদী হোন কিংবা কেজরিওয়াল, আদতে সবাই দক্ষিণপন্থী। এবং বুর্জোয়া রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন। তার মধ্যে শুধু কৌশল অথবা সুর চড়ানো বা নামানোর তফাৎ। বিজেপির বিরোধিতা যিনিই করবেন, তিনিই বামপন্থী হয়ে যাবেন না।
২০১৫য় তাই দিল্লি বিজয়ের পরে আপ-এর সদর দফতরে কোনও ‘গণসংগীত’ বাজছিল না, বলিউডের লারেলাপ্পা গান বাজিয়েই স্বেচ্ছাসেবকরা নাচছিল। বামপন্থীরা যদি ভেবে থাকেন, ২০২০তেও জয়ের পর অরবিন্দ কেজরিওয়াল লেনিনের মূর্তিতে ফুল দিতে যাবেন, অথবা মায়াকোভস্কির কবিতা আবৃত্তি করবেন, তাহলে ভুল করেছিলেন। তিনি ‘ভারত মাতার জয়’ই বলবেন, তিনি মন্দিরে পুজো দিতেই যাবেন।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news