দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় : 
কবি বিনয় মজুমদার বলতেন, যে সকল কবিতার পংক্তি সহজে স্মরণে থাকে তাই নাকি সার্থক কবিতা। কবিতা নিয়ে নানা মুনির নানা মত থাকলেও এই গণিতবিদ কবির অনুধাবনটি বড় চমকপ্রদ। সত্যিই সার্থক কবিতায় এমন এমন পংক্তি উৎসারিত হয় যা প্রবাদে পরিণত হয়। রবীন্দ্রকাব্যের অসংখ্য উদাহরণ এক পাশে রেখে গত শতকের কবিদের এমন বহু উদাহরণ আছে যাঁদের কলম নিঃসৃত পংক্তি এখন প্রবাদ। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত’ কিংবা সুনীলের ‘তেত্রিশ বছর কাটল কেউ কথা রাখেনি’ অথবা শক্তির ‘ধর্মে আছি জিরাফেও আছি’। এমন উদাহরণ আরও আছে। তবে আপনাদের আশ্বস্থ করার জন্যে বলি, এমন হৈমন্তিক আবহাওয়ায় এই অধম রাজনৈতিক কলমচির কবিতা নিয়ে আলোচনার কোনও সাধ নেই, সাধ্যও নেই।
তবে কেন কবিতা? সে কথায় আসছি। আমাদের এই রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মাটি স্বাধীনতার পর থেকে কখনও সবুজ আবার কখনও লাল রঙেই রঞ্জিত হয়েছে। তৃতীয় কোনও রঙের অস্তিত্ব এ ভূমে প্রকট হয়নি। যদিও এই সেই মাটি যেখানে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় জন্মেছেন। যাঁর জনসঙ্ঘ পরবর্তীতে জন্ম দিয়েছে বিজেপির। হিন্দু মহাসভা এই মাটি থেকেই দিল্লির সংসদে মানুষের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। বিবেকান্দ, শ্রীঅরবিন্দের মত বঙ্গ সন্তানরা হিন্দু মহাসভা, জনসঙ্ঘ, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের আদর্শ হলেও বাংলার বাবু শ্রেনীর উঁচু নাকের তলায় এইসব সংগঠন তিষ্ঠতে পারেনি।
অনেককাল পরে এই রাজ্যে আবার মাথা তুলছে বিজেপি। ৩৪ বছরের সিপিএম আর ৮ বছর ধরে সিপিএমের ঘাড়ে ইয়ে করা তৃণমূলের স্বাদ এই মাটি ভাল ভাবে পরখ করেছে। বিরক্ত বীতশ্রদ্ধ মানুষ যে মন তৈরি করে ফেলছেন তা ঠাহর করতে পারছেন রাজনীতিতে অভিজ্ঞ নেতানেত্রীরা। মানুষের মন বদল আঁচ করতে পারলে কী হবে এখনও নিজের মন কোন তারে বাঁধবেন তা ঠিক করতে পারছেন না কেউ কেউ। সময়ের অপেক্ষা করছেন। কেউ আবার পুরনো গীটার কাঁধে নিয়ে নিত্য হেরে যাওয়ার গানকেই নিজের ভবিতব্য করে নিতে চাইছেন। যেমন অরুণাভ ঘোষ। লেখার শুরুতেই কিঞ্চিত কাব্যালোচনার অবতারণা এই ঘোষবাবুর জন্যই। তবে সুনীল-শক্তি নয় এই ঠোঁটকাটা ঘোষ যে প্রবাদে পরিণত কবিতার পংক্তিটিতে মজে আছেন সেটি কামিনী রায়ের কলম থেকে বেরনো পংক্তি, ‘পাছে লোকে কিছু বলে’। অরুণাভর মত ‘সাচ্চা তৃণমূল বিরোধীকে’ চাইছে বিজেপি। কোনও লুকোছাপা না করেই চাইছে। কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে যাওয়া তাঁর বন্ধু তাঁকে বুঝিয়েছেন। বলেছেন, ‘তোমার বলিষ্ঠ বক্তব্য এখানে না বলে সংসদে বলতে পারলে ভাল হত না? ‘ অরুণাভ হেসে উড়িয়েছেন।’ ইমেজ-প্রিয় অরুণাভ। নিজের ভাবমূর্তি সম্পর্কে সদা সচেতন অরুণাভ। ঘনিষ্ঠ মহলে বলেছেন, “আমি বিজেপিতে গেলে আমার কথা আর লোকে শুনবে না। তারা আমায় ধান্দাবাজ ভাববে।” বাগ্মী, যুক্তিনিষ্ঠ, সরস ও সাহসী অরুণাভ সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ আছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আবার তাঁর কথায় তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে তাঁর বাপান্ত করার লোকেরও অভাব নেই। কোনও কোনও সংশয়বাদী (!) আবার তাঁর সাহসকেও ছোট করে দেখেন। বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ওঁর নিশ্চয়ই গোপন বোঝাপড়া আছে। নইলে কী আর এমন খোলাখুলি বলতে পারে! মমতার টিকিটেই যে অরুণাভ একবার মাত্র বিধানসভায় গিয়ে ছিলেন, একথা শত মুখে বলার সহস্র লোক আছে কিন্তু তিনি যে তৃণমূল ছাড়ার সময় নৈতিকভাবে বিধায়ক পদ থেকে পদত্যাগ করে ছিলেন, সে কথা বলার কেউ নেই। এই কথাটি অরুণাভকেই মনে করিয়ে দিতে হয়। সাধারণের কাছে তাঁর বাগ্মীতা যতটা না তাঁর দল কংগ্রেসের সৌজন্যে তার চেয়ে ঢের বেশি বাংলা বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের দৌলতে। সেই সংবাদমাধ্যমগুলিও এখন শাসকের (পড়ুন শাসিকার) রাঙা চোখের ভয়ে অরুণাভকে এড়িয়ে চলে। তারা জানে অরুনাভর কথার শ্রোতা ও দর্শক আছে প্রচুর, তবু টিআরপির চেয়ে স্বস্তি (পড়ুন বিজ্ঞাপন) ভাল, এই ভেবে তারা অরুণাভর মায়া ত্যাগ করে বসে আছে। নির্বেদ-অরুণাভ জুটি টিভির সান্ধ্য বিতর্কে না থাকায় আলোচনার মান কমেছে কি না সেটা অন্য প্রসঙ্গ তবে যে ইমেজকে অরুণাভ এত ভালবাসেন সেই ইমেজ বিল্ডিংয়ের প্ল্যাটফর্ম যে আপাতত অরুণাভর সঙ্গে নেই তা স্পষ্ট।
অরুণাভর স্পষ্টবাদিতা কখনও কখনও মাত্রাতিরিক্ত বলেও মনে হতে পারে। কংগ্রেসে থাকলেও তিনি যে সর্বদা কথায় ও কাজে কংগ্রেসের লাইনে থাকেন এমনটা নয়। কিছুদিন আগে, বিজেপির ডাকা বনধের দিন কোর্টে না গিয়ে তিনি বনধ পালন করেছেন। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদ করেছেন তিনি। প্রশ্ন তুলেছেন, কংগ্রেস বিজেপির ডাকা বনধ সমর্থন করতে না পারলেও একই দিনে আলাদা করে বনধ ডাকতে পারবে না কেন?
প্রশ্ন উঠছে, তৃণমূল বিরোধী অরুণাভ বিজেপির ডাকে সাড়া না দিয়ে তৃণমূলেরই সুবিধা করে দিচ্ছেন না তো! এই রাজ্যের ভালোমন্দ যদি তাঁর মাথাব্যথা হয় এবং তিনি যদি মনে করেন তৃণমূলের বিদায় হওয়াই মঙ্গল তাহলে তাঁর এই আত্মপ্রেম, ইমেজমগ্নতা কতটা সমর্থনযোগ্য! শুধু ভাষ্যেই কী আটকে থাকবে অরুণাভর রাজনৈতিক পরিচয়?
অরুণাভ এসব বোঝেন না তা নয়। কিন্তু ওঁর মাথায় পাক খাচ্ছে ‘পাছে লোকে কিছু বলে!’ মরিচঝাঁপি, আনন্দমার্গী হত্যা, সাঁই বাড়ি হত্যা, হাত কেটে নেওয়ার উত্তরাধিকারীরা কী বলে! দলের রাজ্য ইউনিটকে একবার সিপিএমের কাছে আর একবার তৃণমূলের কাছে বিকিয়ে দেওয়া কংগ্রেস যদি কিছু বলে!
কথা অনেক হল। এবার কী কাজের সময় হল? কিছু করে দেখানোর সময় এল তাঁর!
অরুণাভই জানেন।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news