
অরুণাভ ঘোষঃ
ইসলামপুরের স্কুলটিতে যে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছে তারপর আরও বড় আন্দোলনে যাওয়া উচিত ছিল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির। প্রত্যেক দল আলাদা আলাদা ভাবে, নিজের মতো করেই আন্দোলন করতে পারত। কিন্তু আরও ব্যাপক বিরোধিতার প্রয়োজন ছিল বা আছে।
ইসলামপুরে দাড়ভিট স্কুলে দুটি ছেলে মারা গেল গুলিতে। দুজনেই ওই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র। আরেকটি ছেলে, সেও ওই স্কুলের। সে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় পড়ে আছে শিলিগুড়ির হাসপাতালে। এদের তিনজনেরই কিন্তু একই বক্তব্য, পুলিশ গুলি চালিয়েছে। কাছ থেকে গুলি করেছে। যে দুটি ছেলে মারা গেছে তার একজনের বোনও একই কথা বলেছে। স্কুলের অন্য কমবয়সী ছাত্রছাত্রীরাও এক কথা বলেছে। পুলিশ যে গুলি চালিয়েছে সে কথা বলেছে আরও একজন। যার দোকান স্কুলের উলটো দিকে তার বাড়ির লোকেরও একই মত। অথচ আমাদের মুখ্যমন্ত্রী বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণে গিয়ে সেখান থেকে পুলিশের বয়ানে কথা বললেন! বললেন, পুলিশ গুলি চালায়নি। বরং চক্রান্ত করে অন্যরা গুলি করেছে। তিনি সরাসরি বিজেপি, আরএসএসের ঘাড়ে দোষ চাপিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হল, চক্রান্ত করে যারা মেরেছে তাদের ধরা হচ্ছে না কেন? তাহলেই তো সত্যিটা সামনে আসে।
যাই হোক, আসল কথা হল দুই ছাত্রের মৃত্যুর পরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিশের সুরে সুর মেলানো বক্তব্য দুঃখজনক। কারণ এই মমতাই মরিচঝাঁপি প্রসঙ্গে উলটো কথা বলেছিলেন। তখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু। সে সময় জ্যোতি বসু মরিচঝাঁপি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে পুলিশের মুখে কথা বলেছিলেন। মমতা বলেছিলেন উলটো কথা। মনে রাখতে হবে, মানুষ কিন্তু সে সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা বিশ্বাস করেছিলেন। একই সঙ্গে মনে পড়ছে ২১ জুলাইয়ের কথাও। কতজন কংগ্রেস সমর্থক মারা গেছিলেন সেবার! আমার মনে আছে, পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাথা ফেটেছিল। যদিও সে কথা আজ আর কেউ মনে রাখে না। তো সে সময়েও জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন, দুষ্কৃতকারীরা পিছন থেকে গুলি করেছে অথবা পুলিশ বাধ্য হয়ে গুলি চালিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা। এবং সেবারও যথারীতি জ্যোতিবাবু পুলিশের বয়ান বলেছিলেন। খেয়াল করুন, আজ ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও একইরকম কথা বলছেন। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর জ্যোতি বসু এক হয়ে গেলেন!
জার্মানি থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে তা নিয়ে ছাত্রদের এত কথা থাকবে কেন। আমি বলব, থাকবেই তো। ছাত্রদেরই তো কথা থাকবে। কারণ শিক্ষক খারাপ হলে, ভুল হলে ক্ষতি তো মুখ্যমন্ত্রীর হবে না, হবে ছাত্রদের। কেউ কেউ জানতে পারেন, কিন্তু অনেকেই জানেন না যে জেএনইউ, অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত সম্ভ্রান্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের দেওয়া নম্বরের উপর নির্ভর করে শিক্ষকদের চাকরি। সেখানে ইসলামপুরে তো অদ্ভুত কাণ্ড ঘটেছে। উর্দু শিক্ষক বাংলার মিডিয়ামের ছাত্রদের পড়াতে আসছিল। এমন বিদ্ঘুটে কাণ্ড নিয়ে ছাত্ররা কথা বলবে না! নিশ্চই বলবে। হ্যাঁ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা আলাদা। তিনি উর্দু না জেনেও উর্দুতে কবিতা লেখেন। ভদ্রমহিলা সব পারেন! উনি দিনে ২৩ কিলোমিটার হাঁটেন, অর্থাৎ বছরে ৭২০০ কিলোমিটারের বেশি। মানে চাইলে কলকাতা থেকে ইংল্যান্ড হেঁটে চলে যেতে পারেন। হিসেব অন্তত তাই বলে। অতএব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিভা নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে প্রকৃত প্রসঙ্গে ফিরি।
আমার মতে, চাই সমবেত প্রতিবাদ। বিশেষত প্রত্যেক দল যখন ইসলামপুরের ঘটনার বিরোধিতা করেছে তখন সেটা করাই যায়। এসইউসি, নকশাল, কংগ্রেস, সিপিএম, সিপিআই, ফরয়ার্ড ব্লক সকলেই তো প্রতিবাদ করেছেন ইসলামপুরের নৃশংস ঘটনার। এমত পরিস্থিতিতে সকলেই নির্দিষ্ট একটা দিনে নিজের নিজের মতো করে বনধ ডাকতে পারতেন। দল নির্বিশেষে প্রতিবাদ দেখাতে পারতেন। কিন্তু দুঃখের হল পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীদের মধ্যে সেই একতা নেই। ফলে দুর্নীতি চলছে, একের পর এক অন্যায় হয়েই চলেছে। সেই অন্যায় থামাতে হলে, কমাতে হলে যৌথ আন্দোলনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি আমি। আমি চাইব আগামী দিনে এমন অন্যায় হলে, গুলি চললে, নিরীহ সাধারণ মানুষ মরলে ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলন হোক। আলাদা আলাদা ভাবেই হোক।
কিন্তু কিছু একটা করতে হবে এবার। দুটি ছেলে গুলি খেয়ে মারা গেল, একজন হাসপাতালে পড়ে আছে। তাদের পরিবারের লোকেরা বলছে পুলিশ গুলি করেছে। আর রাজনৈতিক দলগুলি কেবল বিপর্যস্ত আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে একবার দেখা করেই চলে আসবে, এটা ঠিক হচ্ছে না। আমি নিজেকেও দায়ী করছি এর জন্য।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news