অনিকেত চট্টোপাধ্যায়
মৃণাল সেন ছিলেন একজন নাগরিক পরিচালক। কোনওরকম ভনিতা ছিল না ওঁর মধ্যে যে আমি গ্রামের গল্প বলব, রুরাল লাইফ নিয়ে ছবি করব ইত্যাদি। যেমন ছবি অন্য অনেকের ক্যামেরায় আমরা দেখেছি সেদিকে উনি হাঁটেননি। আসলে মানুষটি মনেপ্রাণে নাগরিক ছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা, কোনওদিন জোর করে অন্য কিছু করার চেষ্টা করেননি। এইসঙ্গে বলবার যে, প্রধানত উনি একজন পলিটিকাল ফিল্মমেকার ছিলেন। যখন তাঁর সময়ের অনেক চলচ্চিত্র পরিচালককে দেখি প্রতীকী ভঙ্গিতে গল্প বলতে, তখন মৃণাল সেন সরাসরি গল্পগুলো বুনলেন। এবং যা বলতে চাইছেন তা সমসাময়িক রাজনৈতিক অস্থিরতাকে ছুঁয়েই বলতে দেখি তাঁকে। যেমন, ১৯৭২-এ মুক্তি পাচ্ছে ‘কলকাতা ৭১’। সেই ছবিতে পলিটিকাল এনকাউন্টার হচ্ছে, পলিটিকাল কিলিং হচ্ছে। খেয়াল করার মতো, যে এগুলিকে উনি সরসরি নিজের ছবিতে আনতে পারছেন। এর জন্য যথেষ্ট সাহস লাগে। কারণ সেই একই সময়ে কলকাতা থেকে চলচ্চিত্রকাররা পালাচ্ছেন। কিংবা অন্যরকম ছবি করার কথা বাধ্য হয়ে ভাবছেন। যে ছবি সাধারণ সম্পর্কের কথা বলে ইত্যাদি। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে ‘কলকাতা ৭১’ করে দেখালেন মৃণাল সেন।

যদি শুরুর দিকে দেখি তাহলে ‘নীল আকাশের নীচে’, পরবর্তীকালে ‘বাইশে শ্রাবণ’ করলেন। এই সমস্ত পার করে উনি যখন ১৯৬৯-এ ‘ভুবন সোম’ করছেন, সে একেবারে চমকে দেওয়ার মতো ছবি। ‘ভুবন সোমে’র সেই অদ্ভুত দৃশ্যটি, যেখানে ভুবন সোমের ভূমিকায় উৎপল দত্ত বন্দুক হাতে পজিশন নিয়েছেন পাখি মারবেন বলে। এবং হঠাৎ করে মেয়েটি হেসে উঠছে আর পাখিগুলো উড়ছে। এই দৃশ্যটি যে কোনও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের দৃশ্যায়নের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। এরপরেই বলব ‘কোরাস’-এর কথা। এখানেও রয়েছে তাঁর জোরালো রাজনৈতিক বক্তব্য। এবং বলতেই হয় ‘খারিজ’-এর কথা। খারিজের একটি দৃশ্য সকলেরই মনে থাকবার কথা, যেখানে গ্রাম থেকে আসা বাবা ছেলেটিকে রেখে যায়। ছেলেটি মরে যায়। মরে যায় রান্নাঘরে দমবন্ধ হয়ে। এরপর ছেলেটিকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং ছেলেটি যখন শ্মশানে পুড়ছে তখন উল্টো দিকের দেওয়াল চোখে পড়ে। যেখানে লেখা—‘সত্তরের দশক মুক্তির দশক’, ‘চিনের চেয়ারম্যান, আমাদের চেয়ারম্যান’ ইত্যাদি। এবং ওই দেওয়াললিখনগুলি কাঁপছে আগুনের ভাঁপে। আসাধারণ চিত্রায়ণ! পাশাপাশি বলতেই হয় নিজের রাজনৈতিক মতপ্রকাশে তিনি কতখানি লাউড! আবার সেই তিনি-ই যখন ‘আকালের সন্ধানে’ করলেন তখন নাগরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন গ্রামকে। এর পাশে যদি ‘পথের পাঁচালী’র গ্রামচিত্রকে ফেলা যায়। সেখানে দেখব গ্রামজীবনকে গ্রাম্য দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখানো হয়েছে। কিন্তু মৃণাল সেন নিজের লিমিটেশন জানতেন, ফলে একজন শহরের মানুষ হয়েই উনি গ্রামকে চলচ্চিত্রায়িত করেছেন।
১৯৮২-র পর থেকে আরেক মৃণাল সেনকে আমরা পাই। আসলে ওঁর বাঁক বদলে বদলে যাওয়াটা প্রথম থেকেই ছিল। এক মৃণাল সেনকে আমরা দেখেছি ‘কলকাতা ৭১’, ‘পদাতিক’ হয়ে ‘কোরাস’ পর্যন্ত। আবার ১৯৭৬ থেকে ১৯৮২, মানে মিঠুনদার সঙ্গে ‘মৃগয়া’ করা পর্যন্ত আরেক মৃণাল সেনকে পাই। আবার ১৯৮৩-র পর যখন ‘খান্ডাহার’ করছেন, অন্তরিন করছেন, যখন ‘আমার ভুবন’ করছেন, তখন কিন্তু অন্য এক মৃণাল সেনকে পেলাম।

আমার ব্যক্তিগত মতামত, এই বদলটা সত্যজিৎ রায়ের ছিল না। আমরা যদি সত্যজিতের ফিল্মোগ্রাফি দেখি, তাহলে দেখব যে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, ছবির আঙ্গিকে তেমন বদল হয়নি কখনও। ঋত্বিক ঘটক তো দেশ বিভাজনকে মাথায় রেখেই ছবি করেছেন আজীবন। মৃণাল সেন হয়তো এখানেই আলাদা।
মোটামুটি তিনটে ভাগে ভাগ করতে পারি মৃণাল সেনের ছবিকে। ‘নীল আকাশের নীচ’ থেকে ১৯৭২-এর ‘কোরাস’ পর্যন্ত একটা পর্যায়। যে সময়টায় উনি ভীষণরকম লাউড। রাজনৈতিক মতামত প্রকাশে মৃণাল সেন যখন খুব সরাসরি ক্যামেরা ব্যবহার করছেন। শুধু দৃশ্য নয়, দৃশ্যকল্প তৈরি করতে আরও কিছুর আশ্রয় নিচ্ছেন। যদিও ততদিনে গোদার দেখে ফেলেছি আমরা। ফলে আসুবিধা হচ্ছে না। যখন দেখছি দৃশ্য তৈরি করতে করতে শব্দ, কখনও অক্ষরকেও ব্যবহার করছেন ফ্রেমে। কিন্তু ‘মৃগয়া’ থেকে ‘খারিজ’ পর্যন্ত আরেক মৃণাল সেনকে পেয়েছি। সেই মৃণাল সেন যেন আরও খুঁজছেন নিজেকে নিজের ভেতরে, মধ্যবিত্ত জীবনের আরও গভীরে যেতে চাইছেন তিনি। এরপর ১৯৮৪ থেকে ‘আমার ভুবন’ পর্যন্ত আরেকটা পর্যায়। যে সময়ে এসে মৃণাল সেন স্থিতধী। আগের থেকে অনেক বেশি গুছিয়ে কাজে হাত দিচ্ছেন। ছবি তৈরি করার আগেই যেন সবটা ওঁর মাথায় রয়েছে। কোথাও কোনও তাড়া নেই। জীবনের শেষপর্বে এসে এমনকী অনেকটাই অন্তর্মুখি মৃণাল সেনকে আবষ্কার করি আমরা।

সব মিলিয়ে বাংলা ছবি বলতেই যাঁদের কথা বলি, মূলত সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক আর মৃণাল সেনের কথাই তো বলি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। (এরকমটা ভাবতেই অভ্যস্থ আমরা। কিন্তু এর বাইরেও অনেকে ছিলেন। অসাধারণ কাজ করে গেছেন। তপন সিংহের কথা, রাজেন তরফদারের মতো অনেকের কথাই বলা যায়)। মৃণাল সেন এদের মধ্যে বিশেষ ভাবে আলদা এই কারণেই যে তিনি ছিলেন নাগরিক। দ্বিতীয়ত, বামপন্থা ওঁর জীবনে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একটি বড় বিষয়। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গ নিজের মতো করে গড়েপিটে নিয়েছিলেন বিশ্বাসটাকে। ‘কলকাতা ৭১’-এর বামপন্থা আর তাঁর শেষ দিকের ছবির বাম ভাবনা যেন বা আলাদা কতকটা। যদিও এর মধ্যে চারপাশটাও বদলেছে। একটা সময়ের পর বামপন্থার ক্ষয় হচ্ছে…।
মোদ্দা কথা মৃণাল সেন বামপন্থী ছিলেন কিন্তু নিজের মতো করে বামপন্থাকে দেখেছিলেন, দেখিয়েছিলেন আমাদের।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news