অমিত রায়।
দিন কয়েক আগে ‘বাংলার যুবশক্তি’ কর্মসূচি ঘোষণার সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) সাংসদ ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) বলেছেন, “এই কর্মসূচি সফল করতে গিয়ে যদি কোনও কর্মী তাঁর যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেন। তাহলে আমি আমার নিজের পদ তাঁর জন্য ছেড়ে দেবো।”

বিরোধী শিবির থেকে তাঁর এই দাবিকে কটাক্ষ করে বলা হয়েছে, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের টিকিট পেয়েছিলেন? আর কিসের ভিত্তিতেই বা তিনি তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সর্বভারতীয় ও রাজ্য সংগঠনের সভাপতি পদে রয়েছেন?” গত পৌনে ছয় বছর ধরে তিনি এই পদে বহাল রয়েছেন। তৃণমূলের অন্দরে কান পাতলেই শোনা যায়, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যতদিন চাইবেন ততদিন যুব সংগঠনের সভাপতি হয়ে থাকবেন। কেউ তাঁকে সরাতে পারবে না। কারণ, তৃণমূল (TMC) সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সাংসদ ভাইপোর হাতেই গোটা তৃণমূল নেতৃত্বের রাশ তুলে দিয়েছেন। সঙ্গে প্রশাসনিক ক্ষমতাও বহুলাংশে চলে গিয়েছে তাঁর নিয়ন্ত্রণে।”

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ভাইপোর রাজনীতিতে আগমন ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে। পরিবর্তনের ভোটে তৃণমূল নেতা-নেত্রীদের সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে দক্ষিণ কলকাতায় একটি মিছিল করে নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি শুরু করেন তিনি। তারপর ২০১১ সালের ২১ জুলাই ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের সমাবেশ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় তৃণমূল যুবা নামে একটি সংগঠনের নাম ঘোষিত হয়। ২৩ জুলাই তৃণমূল ভবনে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে তৃণমূল যুবার ‘সংবিধান’ প্রকাশ করেন তিনি। জানান, “বামেদের মতো ভেঙে দাও, গুড়িয়ে দাও নয়। তাদের রাজনীতি হবে ‘সাজিয়ে দাও, গুছিয়ে দাও’ – এর রাজনীতি। এরপর রাজ্যজুড়ে সংগঠন বৃদ্ধির লক্ষ্যে তৃণমূল যুবার সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়। সঙ্গে তৃণমূল যুবা নেতৃত্ব জানায়, সদস্য সংগ্রহ অভিযানের শেষে সদস্যদের নিয়ে একটি বিরাট কর্মসূচির আয়োজন করবেন মুখ্যমন্ত্রীর ভ্রাতুষ্পুত্র। ঘোষিত হয় ২০১২ সালে কসবার গীতাঞ্জলি স্টেডিয়ামে আয়োজিত এই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে আসবেন ভারতে কম্পিউটারের জনক স্যাম পিত্রোদা, টেনিস তারকা লিয়েন্ডার পেজ ও অভিনেতা তথা পরিচালক ফারহান আখতার। কিন্তু, পিছোতে পিছোতে একসময় পুরোপুরি বাতিল হয়ে যায় তৃণমূল যুবার এই ঘোষিত ‘হাইপ্রফাইল পলিটিক্যাল প্রোপাগান্ডা’।

২০১১-২০১৪, এই তিন বছরে মুখ থুবড়ে পড়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল যুবা। ঘটনাচক্রে, ২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে কংগ্রেসে ফিরে যান তৎকালীন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ সোমেন মিত্র। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্থির করেন ডায়মন্ডহারবার আসনে তাঁর ভাইপোকে প্রার্থী করবেন। লোকসভা নির্বাচন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হয়। ডায়মন্ড হারবারে তৃণমূল প্রত্যাশী হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ৭১ হাজার ভোটে জিতে মাত্র ২৭ বছর বয়সে সাংসদ হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মে মাসের লোকসভা ভোট পর্ব সাঙ্গ হওয়ার পর, জুন মাসে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে তৃণমূল কংগ্রেসের একটি বৃহৎ সমাবেশে যুব সংগঠনের সভাপতি বদল করেন মমতা। তমলুকের তৎকালীন তৃণমূল সাংসদ শুভেন্দু অধিকারীকে সরিয়ে যুব সংগঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয় কংগ্রেস ছেড়ে মাত্র চার মাস আগে দলে আসা বিষ্ণুপুরের তৃণমূল সাংসদ সৌমিত্র খাঁকে। কিন্তু, ওই বছরই ১৭ অক্টোবর তৃণমূল ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ফের যুব সংগঠনের সভাপতি বদল করেন তৃণমূল সুপ্রিমো। মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে সৌমিত্র খাঁকে সরিয়ে তাঁর নবনির্বাচিত সাংসদ ভাইপোকে যুব সংগঠনের সর্বভারতীয় ও রাজ্য সংগঠনের সভাপতি করেন তিনি। সঙ্গে জানিয়ে দেন, তৃণমূল যুবা বলে আর কোন সংগঠনের অস্তিত্ব থাকছে না। যুব তৃণমূলের সঙ্গে মিলে যাবে সেটি। সেই সময় থেকেই সংগঠনের সভাপতি পদে রয়েছেন অভিষেক।

তৃণমূলের অন্দরমহল সূত্রে জানা যায়, শুভেন্দুর মত দক্ষ সংগঠককে সরিয়ে জুন মাসেই অভিষেককে সভাপতি করতে চেয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু, শুভেন্দুকে সরিয়ে অভিষেককে আনার ক্ষেত্রে সমালোচনার সম্ভাবনা ছিল রাজ্য রাজনীতিতে। তাই পাঁচ মাস সৌমিত্র খাঁ-কে শিখন্ডী হিসেবে খাড়া করেছিলেন মমতা। যাতে ভাইপোর ‘রাজ্যভিষেকে’ কোনও বিতর্ক না হয়। এই ছয় বছরে দলের সব শীর্ষ নেতাকে পিছনে ফেলে, তৃণমূলের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হয়ে উঠেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিরোধী শিবির থেকে প্রায়শই অভিযোগ ওঠে, বর্তমানে রাজ্য প্রশাসনের বহু সিদ্ধান্ত হয় তাঁর নির্দেশেই। অবশ্যই তা পিসি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সচেতন প্রশ্রয়ে।
বাংলার রাজনীতিতে অভিষেকের উত্থান উল্কার গতিতে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি ও সুব্রত মুখোপাধ্যায় ছাড়া এমন গতিশীল রাজনৈতিক উত্থান বাংলা রাজনীতিতে আর কারও হয়নি। কিন্তু, তা হয়েছিল প্রিয়-সুব্রত জুটির দুর্বার ছাত্র আন্দোলনের কারণে। কিন্তু অভিষেকের ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি, ছাত্র-যুব বা অন্য কোনও গণ আন্দোলনে অংশ নিতে দেখা যায়নি তাঁকে। ২০০৬ সালে যখন ধর্মতলায় সিঙ্গুরের কৃষকদের জমি ফেরাতে অনশন করছেন মমতা, তখন অবশ্য পিসির সেবা শুশ্রুষায় কখনও সখনও দেখা যেত অভিষেককে। তবে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের টানটান আন্দোলনে তাঁর উপস্থিতি ছিল না কখনওই। কোনও গণ আন্দোলন বা কঠিন রাজনৈতিক সংগ্রাম নয় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য রাজনীতির শীর্ষ স্থানে পৌঁছে গিয়েছেন শুধুমাত্র পিসির ওপর ভর করেই। অথচ, তাঁর পিসি আজ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন নিজের নিরলস রাজনৈতিক সংগ্রামের কারণেই। তাই প্রশ্ন উঠেছে, যিনি নিজে কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও পদ পেয়েছেন, তিনি কি করে রাজনৈতিক কর্মীদের যোগ্যতা প্রমাণের কথা বলতে পারেন?
এক কর্মীর কথায়, সবার তো আর অমন পিসি থাকে না!

Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news