Breaking News
Home / TRENDING / কলকাতায় কী ফিরে আসছে ১৯৪৬-৪৭!

কলকাতায় কী ফিরে আসছে ১৯৪৬-৪৭!

জিষ্ণু বসু : 

গত ৩ অক্টোবর তারিখে কলকাতায় অল বেঙ্গল মাইনরিটি ইউথ ফেডারেশন নামে একটি সংস্থা কলকাতায় একটি বড় সমাবেশ করে। মূলতঃ রাজ্যের ইমাম ও মোয়াজ্জিমদের জমায়েত হলেও নেতৃত্বে ছিলেন কতগুলি খুব পরিচিত মুখ।এই কয়েকটি মুখ বিগত বছরগুলিতেও রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর খুব ঘনিষ্ঠ হিসেবে প্রচার মাধ্যমে এসেছে। মা-মাটি-মানুষের সংগ্রামে উঠে আসা এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতারা আজ এক নতুন দাবি নিয়ে পথে নেমেছেন।
সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় ২৮,০০০ পুজো কমিটিকে ১০,০০০ টাকা করে অনুদানের কথা ঘোষণা করেছেন। এই সংখ্যালঘু নেতাদের মতে এটা সরাসরি সংখ্যাগুরু তোষণ। এই তোষণ শুরু করার আগে সংখ্যালঘুদের পাওনাটা মেটাতে হবে। তাদের মতে, সরকার ইমামদের যে মাসে ২৫০০ টাকা করে ভাতা দেন, সেটা বৃদ্ধি করে ৫০০০ করতে হবে।এর সঙ্গে সঙ্গে আরও দু একটি দাবি সেদিন উঠে এসেছে। যার একটি হল জনসংখ্যার হিসেব মতো রাজ্যের ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে ১৬টি মুসলমানদের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। সেইসঙ্গে কলকাতা পুলিশের কমিশনার হিসেবে একজন মুসলমানকে নিয়োগ করতে হবে। বর্ধমানের খাগড়াগড়ের বিস্ফোরনের পরে বোঝা গিয়েছিল যে পশ্চিমবঙ্গে জেহাদি সন্ত্রাসের শিকড় কত গভীরে পৌঁছে গিয়েছে, কালিয়াচকে যেদিন থানা লুঠ হল কিংবা ধূলাগড়ে দাঙ্গার সামনে পুলিশ নীরব পুতুল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল, সেদিন বোঝা গিয়েছিল যে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ আর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকর্তীয় এরাজ্য ক্রমে বাংলাভাষী হিন্দুদের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পরে এরাজ্যে এত বেশী হিন্দু বিরোধী শক্তি কখনও মাথা তুলে দাঁড়ায়নি। গত ৩ অক্টোবর কলকাতা দেখিয়ে দিল যে দেশভাগের আগের অবস্থা আবার বাংলায় ফিরে এসেছে। সেই একই ভাবনা, একেবারে আক্ষরিকভাবে একই দাবি আবার উঠে আসছে।
প্রথম বিষয় হল দুর্গাপুজায় অনুদান। পশ্চিমবঙ্গে আজকের এত হিন্দু বিরোধী বাতাবরনের জন্য তথ্যাভিজ্ঞ মহল মূলতঃ রাজ্য সরকারকেই দায়ি করছে। দেগঙ্গার দাঙ্গা হয়েছিল ২০১০ সালে। তারপর থেকে ক্যানিং, নদিয়ার জুরানপুর, হাঁসখালি, ধূলাগড় সহ সর্বত্র হিন্দুদের ওপর অত্যাচারকারীদেরকেই প্রশ্রয় দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস দল। নিষিদ্ধ সিমির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদককে এই দল সাদরে রাজ্যসভায় নিয়ে গিয়েছে। এদলের মন্ত্রী নিজের নির্বাচনী এলাকাকে প্রকাশ্যে ‘মিনি পাকিস্তান’ বলে গর্ববোধ করেন। দুই দশকের বেশী সময় ধরে যিনি জামাতের নেতৃত্ব দিলেন তিনি রাজ্যের মন্ত্রী হয়ে গেলেন।২০০৭ সালে তসলিমাল নাসরিনকে তাড়ানোর জন্য যারা কলকাতায় দাঙ্গা করলেন, বাংলাদেশে কুখ্যাত রাজাকার শতশত হিন্দুর হত্যাকারী দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর সমর্থনে যারা কলকাতার ময়দান ভরিয়ে দিয়ে সভা করলেন, তারা আজ রাজ্যের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। মহরমের আগের দিন মহরমের মহড়া বের হবে এই অজুহাতে দশমীর দিন শাস্ত্রমতে যে দূর্গা বিসর্জন হওয়ার কথা, তার ওপর পরপর দুবছর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। হিন্দুরা অবাক হয়ে একের পর এক আক্রমণ দেখেছে। ভোট লোভী একটা দল কীভাবে মৌলবাদের গ্রাসে তলিয়ে যায়, তা দেখেছে। এইসব দেখে হিন্দু মনের দরজা এই দলের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সেই ক্ষতের প্রলেপ দিতেই দূর্গাপূজার এই অনুদানের কথা বলেছেন তারা।
কিন্তু বাংলার হিন্দুরা এই অনুদানের জন্য, এমন অসম্মানের ভিক্ষার জন্য লালায়িত নয়। তারা দশমীর বিসর্জন সেই দিনের দেওয়ার অধিকার চায়, জুরানপুরে মৌলবাদীদের হাতে দলিত হত্যার বিচার চায়। এই সরকার পশ্চিমবঙ্গে মানুষের একটা ছোট অংশের পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এ রাজ্যের মানুষের একটা আত্মসম্মানবোধ ছিল। একজন গ্রামের দরিদ্র মানুষও, কেউ এমনি পয়সা দিলে সাকবার প্রশ্ন করত যে তার বদলে তাকে কী করতে হবে। গরীব মানুষও মাগনা টাকা নেওয়াকে অসম্মান মনে করত। কিন্তু বিগত ৬/৭ বছরে ক্লাবে বা পাড়ায় যুবকদের মদ, মাংস বা বাইকের তেলের টাকা দেওয়ার রেওয়াজ গা সওয়া হয়ে গিয়েছে।কিছু না করেও যে টাকা পাওয়া যায়, আর সে কারনেই যে সারধা বা নারদার দুর্নীতিটা আসলে কোনও দুর্নীতিই নয়, এমন ভাবার মত লোক পাড়ার ক্লাবে বা পুজো কমিটিগুলোতে এসেছে। এই নতুন নীতিবোধের মানুষদের কাছে দূর্গাপূজা গল উদ্যাম ফুর্তির পরব। তাই নেতা মন্ত্রীদের সুবিধামতো দেবীপক্ষ শুরু হওয়ার আগেই প্রতিমার উন্মোচন করা যায়। এদের কাছে দূর্গাপূজাটা কোনও শ্রদ্ধা, ভক্তি বা ধার্মিক অনুষ্ঠান নয়, মদ মাংসের মোচ্ছব আর লোকের কাছ থেকে, ব্যবসায়ীদের থেকে টাকা লোটার ফিকির। সেই নীতিহীন ভোগের ওপর ১০ হাজার টাকার মালাই পড়লে ভালোই তো!
কিন্তু বাধ সেধেছে আদালত।জনগনের টাকা এভাবে হরির লুঠ করা যাবে না। সত্যি বলতে কি, এ রাজ্যের ন্যূনতম দায়িত্ববোধ থাকলে সরকার এমন অবিবেচক কথা ঘোষণা করতেন না। ভারতবর্ষে মধ্য প্রদেশ, ছত্তিশগড়ের মতো অনেক রাজ্যে ৭ম পে কমিশন কার্যকর হয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার টাকার অভাবের কথা বলে রাজ্য সরকারী কর্মীদের এখনও পর্যন্ত ৬ষ্ঠ পে কমিশনের ন্যায্য পাওনাটুকুও দিতে পারেনি। মাঝেরহাটের ব্রিজ ভেঙে যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল তার পেছনেও সরকারের ব্যয় সংকোচ দায়ী। মার্চ ৩১, ২০১৮ তারিখে ব্রিজ মেরামতের জন্য টেন্ডার চাওয়া হয়। দর এসেছিল ৩ কোটি ২৭ লক্ষ টাকার, সরকার ২ কোটি ৮১ লক্ষের বাজেট করেছিল। তাই কাজ বন্ধ হয়ে গেল। ঠিক হল ব্রিজটাতে কেবল নীল সাদা রং লাগিয়ে ছেড়ে দাও! রাজ্যের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শৌচাগারের এমন অবস্থা যে কোনও মা বাপ একান্ত বাধ্য না হলে সেই স্কুলে নিজের বাচ্চাকে পাঠাবেন না। কলকাতার মধ্যেই এমন অবস্থা হলে রাজ্যের গ্রামের স্কুলগুলোর কী হাল তা সহজেই অনুমেয়।তাই এ রাজ্যের হিন্দু সমাজ দায়িত্বজ্ঞানহীন, লোভী নয়। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী রাজধর্ম পালন করুন সেটাই সবাই চায়, হিন্দু ধর্মের ধর্মাচরণের জন্য সে খরচ তো বাংলার হিন্দুরা নিজেরাই চালিয়ে নিতে পারবে। তাই হাইকোর্টের রায়কে একান্ত কর্তাভজা কতিপয় লোক ছাড়া সকলেই স্বাগত জানিয়েছে, খুশী হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হল সেদিনের সভায় ইমামদের ভাতা বৃদ্ধির জন্য সরকারের ওপর চাপ দেওয়া হল কেন? সরকার কী ইমাম ভাতা দেন? দেওয়ার তো কথা নয়। কলকাতার মহামান্য আদালত তো সুষ্ঠভাবে বলেছেন যে ইমাম ভাতা বা মোয়াজ্জেন ভাতা সরকারী অর্থ মানে, সাধারন মানুষের করের অর্থে দেওয়া যাবে না। এই রহস্য জানলে সত্যিই অবাক হতে হয়। একটি সরকার রাজ্যের মানুষের সঙ্গে এই প্রতারণা করতে পারে? আদালত ইমাম ভাতা বন্ধের নির্দেশ দেয় ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। ২০১২ সালের এপ্রিল মাস থেকে মাসে ২৫০০ টাকা হিসেবে ইমাম ভাতা দেওয়া শুরু হয়েছিল প্রায় ৩০ হাজার ইমামকে। কিন্তু আদালত সাধারন মানুষের টাকা এভাবে নয়ছয় করতে দেবে না, সেটা রাজ্য সরকার ২০১৩ সালেই বুঝে যায়। তাই সেবছর ৫০০ কোটি টাকা পশ্চিমবঙ্গের ওয়াকফ বোর্ডকে দেওয়া হয়। এই ওয়াকফ বোর্ডের ওই টাকার বেশীরভাগটাই ঘুরপথেই আজও ইমাম ভাতা দেওয়া হচ্ছে। ২০১৬-১৭ সালে ওয়াকফ বোর্ডের জন্য ১৫২ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ আর্থিক বছরে ১৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। তাই রাজনৈতিক কর্মীদের মাধ্যমে প্রত্যেক ইমাম বা মোয়াজ্জেন জানেন যে আসলে তারা ভাতা পাচ্ছেন সরকার থেকে । মাঝখানে ওয়াকফ বোর্ড একটা পর্দা মাত্র। সেইজন্যই দূর্গাপূজায় টাকা দেওয়ায় তারা ক্ষেপেছেন। সত্যিই তো, ক্ষেপে যাওয়ারই কথা । পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ৭০ ভাগের বেশী হিন্দুর দেওয়া করের টাকায় ইমাম ভাতা হতে পারে, দূর্গাপূজায় দেওয়া হবে কেন? অকাট্য যুক্তি বটে!
একদম এমনই পরিস্থিতি হয়েছিল দেশভাগের আগে এই বঙ্গ প্রদেশে। পরাধীন বাংলার তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী। ১৯৩৭ সালে সোহরাওয়াদী সাহেব সরকারে প্রবেশ করেন। ১৯৪৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্পূর্ণ ক্ষমতা এল তাঁর হাতে। ১৯৪৬ সালে বাংলার ২৫০টি আসনের মধ্যে ১১৩টি পেয়েছিল মুসলীম লীগ। ফল পেতে খুব দেরি হয়নি। সে বছর ১৬ অগস্ট মনুমেন্টের তলায় সোহরাওয়াদীরা ডাক দিলেন ডাইরেক্ট অ্যাক্শনের। যা থেকে শুরু হল ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ পর্বের। ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হল নোয়াখালির ভয়াবহ দাঙ্গা। দাঙ্গা মানে একতরফা হিন্দু নিধন। সেদিন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের একান্ত প্রয়াসে বেঁচে গিয়েছিল কলকাতা আর আজকের পশ্চিমবঙ্গ। নাহলে কলকাতা আজ বাংলাদেশে থাকত। হিন্দু প্রধান জেলাগুলি নিয়েই তৈরি হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ। কেবল মুর্শিদাবাদ আর মালদা ছাড়া সবকটি জেলা ছিল হিন্দু প্রধান। আর ওপার বাংলায় খুলনা আর পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া বাকিটা ছিল মুসলমান প্রধান। ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে আদমসুমারী হল। তখনও সেখানে শতকরা ২৪ ভাগ হিন্দু ছিলেন। আজ ২০১৮ সালে পূর্ব বঙ্গ মানে আজকের বাংলাদেশে হিন্দুর সংখ্যা মেরে কেটে ৮ শতাংশ। আর ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর কলকাতায় দাবী উঠল ৪২টির মধ্যে ১৬টি আসন মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। মানে এপার বাংলাতেও ৩৮ শতাংশ মুসলমান সংরক্ষণ।
গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং যখন সংগঠিত হচ্ছে তখন সোহরাওয়াদী নিজে লালবাজারের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে বসেছিলেন। তৎকালীন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার ফ্রেডেরিক বারোজের যে রিপোর্ট গভর্নর পাঠিয়েছিলেন ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেলকে তাতে পরিস্কার যে লালবাজারকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন সোহরাওয়াদী ও তাঁর লীগের পার্ষদরা। আজকের গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষের একটি মহানগরের পুলিশ কমিশনার হিন্দু বা মুসলমান, যে কেউ হতে পারেন। তিনি তাঁর যোগ্যতায়, বিভাগীয় নিয়ম মেনেই আরক্ষণ আধিকারিক হবেন। কিন্তু মুসলমান হতে হবে এমন দাবি করা যায় নাকি? খাগড়াগড়, কালিয়াচক, জুড়ানপুর বা ধূলাগড়রের পরে এমন দাবিতে কোথায় যেন কার্য কারনের সম্পর্কের ভয় দানা বাঁধছে। আবার কী ফিরে আসছে ১৯৪৬-৪৭?

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *