রণবীর ভট্টাচার্য
বাঙালির কাছে তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (Hemanta Mukherjee) আর হিন্দি সিনেমার দুনিয়ায় তিনি হেমন্ত কুমার – যেই নামেই তাঁকে ভর্তি মানুষ চিনে থাকুন না কেন, মৃত্যুর একুশ বছর পরেও তিনি অমলিন। রেডিও, টিভি পেরিয়ে ইন্টারনেটের জমানায় এসেও তিনি আজ সমান জনপ্রিয়। গায়ক, সুরকার, প্রযোজক, পরিচালক – পুরোদস্তুর অলরাউন্ডার ছিলেন তিনি। আজ সেই কিংবদন্তি মানুষটি একশো-তে পা দিলেন। তিনি সশরীরে আমাদের মধ্যে নেই ঠিকই, আবার আছেনও। এই করোনা পর্বের ঘরবন্দি অসহায়তার মধ্যেও মানুষ জীবনে প্রাণ খুঁজছেন ওনার গানের মধ্যে, সুরের জাদুতে। তাই আজও রফি, মান্না, কিশোর, লতার সাথে একাসনে ভারতের সোনালী অতীতে চিরকালের জন্যে স্থান করে নিয়েছেন সদা মিতভাষী এই ধুতি, শার্ট পরিহিত মানুষটি।
ইঞ্জিনিয়ার কিংবা সাহিত্যিক, খুব সাবলীল ভাবেই নিজের জীবন ধারণ বেছে নিতে পারতেন এই দুটির মধ্যে যে কোন একটি। কিন্তু যেই মানুষটি বিশ্বাস করতেন ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়’, তার পক্ষে অন্য কিছু হওয়ার কথাও ছিল না। অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে যাত্রা শুরু আর তারপর কখনো পিছনে ফিরতে হয়নি তাকে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে মহিরুহরা ছিলেন তার আশপাশে। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, রবিন মজুমদার, তালাত মামুদ, সুধীরলাল চক্রবর্তী – নাম যেন শেষ হবার নয়। আইপিটিএ সামগ্রিক ভাবে ভারতীয় বিনোদন জগতে পরিবর্তন এনেছিল আর তার ফলশ্রুতি ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর সলিল চৌধুরীর জুটি। ‘কোন এক গাঁয়ের বধূ’ তৈরি করেছিল নতুন এক ইতিহাস। এরপর মুম্বইয়ে যাওয়া নতুন এক অধ্যায় নিয়ে আসে ওনার জীবনে। তখনও বোম্বাই মুম্বই হয়নি। পঞ্চাশের দশকে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন শুধুমাত্র জনপ্রিয় গায়ক হিসেবে নয়, সুরকার হিসেবেও। হিন্দির মত নতুন একটি ভাষাতে তার সুরের জাদু অবাক করেছিল সকলকে। পরে প্রযোজক হিসেবে পুরষ্কার পান, মৃণাল সেনের মতো পরিচালক তার ব্যানারে বানিয়েছিলেন ‘নীল আকাশের নীচে’ এর মত সিনেমা।
বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথ একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। রবীন্দ্রসঙ্গীতের জনপ্রিয়তার কথা যদি বলতে হয়, তাহলে কিন্তু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নাম উপরের দিকেই থাকবে। অনেকেই হয়তো অনেক প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞের কথা বলবেন, কিন্তু প্লে ব্যাক বা জলসা, রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বাণিজ্যিক দিক থেকে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গুরুত্ব কিন্তু অপরিসীম। অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন মান্না দে-র থেকে কি হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কি পিছিয়ে ছিলেন কিনা। দুজনে দুই ধারার বাহক এবং দুজনেই ছিলেন কিংবদন্তি। তবে নায়ক উত্তম কুমারের সাফল্যের পিছনে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় অবশ্যই ছিলেন। সপ্তপদী হোক কিংবা হারানো সুর, দর্শক মনে মিলে মিশে গেছেন উত্তম কুমার ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আবার এই হেমন্ত বাবু অধুনা প্রয়াত তাপস পালের ‘দাদার কীর্তি’-তে উপহার দিয়েছিলেন কালজয়ী গান। তবে আরেকটি দিকের কথা না বললেই নয়, তা হল ডুয়েট গাওয়ার ক্ষেত্রে অপরিসীম দক্ষতা। আজকের স্টুডিওতে ডুয়েট গাওয়া অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে কিন্তু সেই সাদা কালো জমানায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় অন্য ধারায় নিয়ে গিয়েছিলেন গান গাওয়া। তাই আলাদা করে হেমন্ত-লতার ডুয়েট নিয়ে বাঙালির ভালোবাসা আজও অটুট।
স্বয়ং হেমন্ত বাবু বেঁচে থাকতেই অনেকে হেমন্তকন্ঠী হয়ে এগোতে চেয়েছেন। পরবর্তীকালে পয়লা বৈশাখ হোক, কিংবা রবীন্দ্রজয়ন্তী কিংবা বিজয়া সম্মিলনী, সর্বত্র ডাক পড়েছে হেমন্তকন্ঠীদের। এমনকি রিয়ালিটি শো-তেও সেই এপিসোডগুলোর দিকে মানুষ তাকিয়ে থাকেন যেখানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান গাওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু কেন বাঙালি আরো একজন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় পেল না উনি চলে যাওয়ার দুই দশক পরেও? আজও কেন ক্যাসেট থেকে সিডির জমানায় এসে নতুন কোন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের খোঁজ পাওয়া যায় না?
এই উত্তর এখনো সবাই খুঁজে চলেছে কিন্তু অটো টিউনের জমানায় এর সহজ উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। তবে যতদিন বাঙালি থাকবে, যতদিন রবীন্দ্রসঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক চর্চা থাকবে, ততদিন বাঙালির হৃদয় জুড়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থাকবেন।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news