পার্থসারথি পাণ্ডা
ঋত্বিক ঘটক নতুন ছবি বানাবেন। নাম, ‘কোমল গান্ধার’। সেটা ১৯৬০ সাল। এর আগে ‘ মেঘে ঢাকা তারা’ করে বেশ দু’পয়সা হয়েছে, কারণ, হলগুলোতে বেশ হই হই করে চলেছে ছবিটা। দীর্ঘ অসফলতার শেষে এই ব্যাপক সাফল্য ঋত্বিককে নতুন ছবি তৈরির ব্যপারে প্রচন্ডরকম উৎসাহিত করেছিল। যাইহোক, সেই উৎসাহে ফুটতে ফুটতে তিনি গেলেন সলিল চৌধুরীর কাছে। বম্বের ব্যস্ততার ফাঁকে সলিল অনেকদিন পরে কদিন হল কলকাতায় ফিরেছেন। বেপরোয়া ঋত্বিক তাঁর বাড়িতে গিয়েই ভালোমন্দ চুলোয় তুলে তুড়ি বাজিয়ে বললেন, এক্ষুনি একটা রোমান্টিক গান লিখে দে তো, কুইক…নেক্সট ছবির জন্য। সলিল হাসলেন, এক্ষুনি বললেই কি আর এক্ষুনি হয়, এই তো এলি, এতদিন পর দেখা, বস, চা খা, তারপর না হয় লেখা নিয়ে বসছি…। কিন্তু ঋত্বিকের তাতে তর সয় না। সবসময় একটা ছটফটানি তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় যেন তাঁকে। সলিল সেটা হাড়ে হাড়ে জানেন। তাই ‘এক্ষুনি’টাকে ম্যানেজ করে জমিয়ে আড্ডা শুরু করে দিলেন। তখন ঋত্বিক একেবারে অন্য মানুষ। বেমালুম ভুলে গেলেন গানের কথা। তখনকার মতো ‘এক্ষুনি’টা পার করে পরে অবশ্য ঋত্বিককে একখানা রোমান্টিক গান লিখে দিয়েছিলেন সলিল, সেইসঙ্গে তৈরি করেছিলেন সুরও। কিন্তু গানটি তৈরি হলেও ছবিতে আর ব্যবহার করা হয়নি। পরবর্তীকালে ননফিল্মি রেকর্ডগীতি হিসেবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গানটি খুব জনপ্রিয় হয়। এই গানটি হল– ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’। বাংলা ভাষায় সেরা দশটি প্রেমের গানের মধ্যে এই গান একটি। কারণ, এ গান একইসঙ্গে প্রেমিক-প্রেমিকার হৃদয় ছুঁয়ে সমাজজীবনের হৃদয়ে পৌঁছে দেয় নতুন দিনের আহ্বান।
সলিলের সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রথম রেকর্ড ‘কোন এক গাঁয়ের বধু’। এর আগে সলিল গণনাট্যের নাটকে গানের সুর দিচ্ছেন, কিন্তু আলোড়ন পড়ার মতো তেমন কিছু হচ্ছে না। তাই নিজের পথ তৈরি করতে সেই সময়ের রেডিও ও সিনেমার বিখ্যাত গায়ক হেমন্তকে দিয়ে নিজের কথা ও সুরে একটা রেকর্ড করতে চাইলেন। গণনাট্যের সাথে হেমন্তও যুক্ত। ফলে, আলাপ আছে। সেই ভরসায় একদিন হেমন্তকে বেশকিছু গান শোনালেন সলিল, কিন্তু হেমন্তর কেমন যেন পছন্দ হল না সেসব গান । তিনি গতের বাইরে অন্য ধরণের গান চান, যা এই সময়ের হয়েও সবকালের সাধারণের কথা বলবে। সলিল একরকম হতাশ হয়েই চলে আসছিলেন, কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হঠাৎ কিছু একটা ভেবে তিনি থেমে গেলেন। থমকে ফিরলেন হেমন্তর দিকে। তিনি সলিলকে এগিয়ে দিতে এসে তখন সিঁড়ির মাথায়। বললেন, একটা গান লিখছি, এখনো শেষ হয়নি, তবে আপনি যা চাইছেন আমি বুঝতে পেরেছি, ও গান তেমনই। হেমন্ত বললেন, তাহলে শোনাও সে গান। সলিল শোনালেন। সে গান শুনে হেমন্তের মনে হল, এই গান গাওয়ার জন্যই যেন তিনি এতদিন অপেক্ষা করে ছিলেন। এই গানই সেই বিখ্যাত গান — ‘কোন এক গাঁয়ের বধু’। এই গান এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে, শুধু বাংলা নয়, হিন্দিতেও রেকর্ড হয়েছিল। আসলে সেই সময় কলকাতাসহ সারা বঙ্গদেশে দুর্ভিক্ষ ও দাঙ্গায় কৃষিজীবী মানুষের সর্বহারা হয়ে যাওয়ার যে ছবি এই গানে তুলে ধরা হয়েছে, তা যেন সবসময়ই সমসময়কে ছুঁয়ে যায় এক চিরন্তন মানবিক স্পর্শের মধ্য দিয়ে। তাই এই গান হয়ে উঠেছে চিরদিনের গান…
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news