পার্থসারথি পাণ্ডা
ভারতে জাঠেরাও বহিরাগত, পঞ্চনদীর দেশ পাঞ্জাবে তারা এসেছিল খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে মধ্য এশিয়া থেকে। তারা প্রথম থেকেই ছিল বীরের জাত, শকদের একটি শাখা। পাঞ্জাবে বসতি গড়ার সময় এরা ধর্মে ছিল মহাযান বৌদ্ধ, কৃষিই ছিল প্রধান জীবিকা। কিন্তু যুদ্ধবিদ্যাতেও এরা ছিল দারুণ দক্ষ। ভারতে তাদেরও অনেক আগে থেকে যে আর্যরা বসতি পেতে বসেছিল তারা এদের তাড়াবার কম চেষ্টা করেনি। কিন্তু এদের সঙ্গে বাহুবলে কিছুতেই পেরে ওঠেনি। এমনকি মামুদ, বাবর প্রভৃতি ইসলামি শাসক যতবার ভারত আক্রমণ করে ভারতে ঢোকার চেষ্টা করেছে, ততবারই এই জাঠেরা তাদের বাধা দিয়েছে। দুশো বছর ক্রমাগত যুদ্ধবিগ্রহের পর তবেই মুসলিমরা তাদের বাধা অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করতে পেরেছে। মুঘলসম্রাট বাবর তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমি যতবার ভারতবর্ষ আক্রমণ করেছি, ততবার জাঠেরা আমাকে বাধা দিয়েছে।’ তাঁরও আগে আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণের সময় সঙ্গে এসেছিলেন আরিয়ন নামের এক গ্রিক ঐতিহাসিক, তিনিও তাঁর লেখায় জাঠদের দুর্দান্ত বীর বলে উল্লেখ করেছেন।
১৪৬৮ খ্রিস্টাব্দে এইরকমই এক বীর জাতির মধ্যে নানক যখন জন্ম নিলেন, তার আনেক আগেই এদেশে ইসলামি শক্তির প্রবেশ ঘটে গেছে। ততদিনে হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ-বিভেদও খুব বড় হয়ে উঠেছে। সেইসময়ের জাঠেরা বীর হলেও সমাজে মূর্তিপূজা, ধর্মীয় কুসংস্কার ও জাতিগতবিভেদ প্রবল ভাবে ছিল। সেইসব অসঙ্গতি দূর করতে নানক একেশ্বরবাদ প্রচারের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় সংস্কারে মন দিয়েছিলেন। একতার মধ্য দিয়ে জাতির বীরসত্তা বজায় রাখতেও তিনি সচেষ্ট হয়েছিলেন। তিনি সমস্ত ধর্মের পাঠ নিয়ে, সংসারী হয়েও গৃহত্যাগ করে, সাধুর বেশে দেশে দেশে ঘুরে, পুনরায় সংসারে ফিরে জীবন সেচে একেশ্বরবাদ ও সমন্বয়ের বাণী নিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছেছিলেন। সেই মানুষ, সাধারণ চাষাভুষো মানুষ। তাদের পথ দেখাতে তাঁর জ্ঞানলব্ধ সত্য—‘ভগবান এক, মানুষ ভাই ভাই’—বাণীর প্রচার শুরু করলেন। তাঁর উপলব্ধিতে বেদ-উপনিষদের ব্রহ্মবাদ, কোরানের একেশ্ববাদ, তাই তাঁর কাছে ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়, তিনি ব্রহ্মস্বরূপ, তাঁর কোন আকার নেই। অলৌকিক ক্রিয়াকলাপে তাঁর কোন বিশ্বাস ছিল না, মানুষকে ভাঁওতা দিয়ে গুরু সাজার কোন ইচ্ছেও তাঁর ছিল না। তাই কেউ তাঁকে অলৌকিক কিছু দেখানোর কথা বললে তিনি বলতেন, ‘আমি শুধু পবিত্র ধর্মের কথাই জানি, আর কিছুই জানি না। একমাত্র ঈশ্বর সত্য, আর যা কিছু সবই ক্ষনিকের, মিথ্যা।’ এই বিশ্বাসই তাঁকে পার্থিব প্রাপ্তির ব্যাপারে নির্মোহ করে তুলেছিল। তাই সম্রাট বাবর তাঁকে একবার কিছু দান করতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, ‘যে ঈশ্বর সকলকে অন্ন জোগান, দণ্ড বা দান যাই হোক না কেন, আমি তাঁর কাছ থেকেই পেতে চাই, আর কারও কাছে না।’ এখান থেকেই পরবর্তী শিখ ধর্মগুরুরা একমাত্র ঈশ্বর ছাড়া আর কারও কাছে মাথা নত না করে শিরদাঁড়া সোজা রাখার শিক্ষা পেয়েছিলেন এবং সমস্ত শিখদের সেই শিক্ষা দিয়েছিলেন। সেই পথেই গুরু অর্জুন থেকে শুরু করে তেগ বাহাদুর পর্যন্ত শিখগুরুরা মুঘল সম্রাটদের কাছে আত্মবলিদান দিয়েছেন, কিন্তু আত্মমর্যাদা ক্ষুন্ন হতে দেননি। ধর্ম অনেক সময়ই একটি জাতিকে উন্নত করে তুলতে পারে, সেই ধর্ম যদি নানকের মতো লৌকিক গুরু পায়।
Check Also
Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক
দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …
রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর
দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …
আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর
চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news