গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়
কানা বেগুনের সঙ্গে কানা অতুল্য নাম জুড়ে একসময় শ্লোগান দিত মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট পার্টি। আর দলীয় প্রচারের জোরে প্রাক্তন কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনকে স্টিফেন হাউসের মালিক বানিয়ে দিয়েছিল। অতুল্য ঘোষ রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে বিধান শিশু উদ্যানে একটি কামরায় থাকতেন, অসংখ্য বই পড়তেন। আর প্রফুল্ল চন্দ্র সেন রাজনীতি উত্তর জীবনে একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে কালাতিপাত করেছেন। তবে ততদিনে সিপিএম গদিয়ান হয়েছে এবং নিজেদের বিজ্ঞানমনস্ক, প্রগতিশীল আর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বলে বাজারে ফিরি করেছে।
ফের যবে থেকে রাজ্যপাট রসাতলে গেল তবে থেকে ফেরার রাস্তা পাচ্ছে না সিপিএম। এতদিনে কৃষকসভার মিছিলে এক কিশোরীর শ্লোগান ধ্বনিতে বোঝা গেল সিপিএম প্রাক সত্তরে ফিরতে চাইছে তবে একটু নতুন অবতারে। সিপিএম জানে, যতদিন মমতা আছেন ততদিন রাস্তায় নেমে আন্দোলনে যাওয়া মুশকিল, কারণ তৃণমূল নেত্রী নিরজে সিপিএম-এর চেয়েও বেশি সিপিএম। তিনি জানেন, কাঁটা দিয়ে কীভাবে কাঁটা তুলতে হয়। অতএব সিপিএম চাইছে শ্লোগান দিয়েই প্রথম পরিচ্ছেদটা বরং শুরু করা যাক।
বেলদার কিশোরী রিয়া মাইতি কৃষক সভার মিছিলে যে সব শ্লোগান দিলেন তাতে আর যাই হোক কৃষকদের স্বাক্ষর নেই। তিনি কী বললেন?
‘‘শিক্ষামন্ত্রী টুকে পাস শিল্পমন্ত্রী টাইম পাশ, এই তৃণমূল আর না।’’ আর কী বললেন?
‘‘অর্থমন্ত্রী দিচ্ছে বাঁশ, কৃষিমন্ত্রী কারাবাস, এই তৃণমূল আর না আর না …।”
এই শ্লোগানের মধ্যে একটা অর্থ নিহিত রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তা হল, অনেক তো হল, এবার আর বিজ্ঞানমনস্কতা, প্রগতিশীলতা আর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার নামে কলি ফিরবে না। অতএব এবার বাংলা সিরিয়ালে ফেরা যাক। যে সিপিএম একসময় ব্যক্তির চরিত্র হননে সিদ্ধহস্ত ছিল বর্তমানে আবার সেই পথেই ফিরছে তারা।
একে নিশ্চয়ই আলিমুদ্দিন মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির বৈপ্লবিক অগ্রগতি বলেই মনে করছে, কারণ, ইতিমধ্যে এই সব শ্লোগান ‘লাল ঝান্ডা করে পুকার’ ধ্বনিকে ফিকে করে দিয়েছে। তবে শুধু শ্লোগানে তো চিড়ে ভিজবে না। আর সেই জন্যই এখন সিপিএমকে বামপন্থী দর্শনও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। যে দর্শনের মধ্য দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক মানচিত্রে স্থান করে নেবে ভেবেছিল সে ভাবনা ছেড়ে এখন তারা পায়ের তলায় মাটি পেতে ‘ও আমার দেশের মাটি’ কেই বুকের মধ্যে স্থান দিচ্ছে। এখন বুঝেছে লেনিন-স্ট্যালিন-মার্ক্স করে আর চলবে না, এখন একদিকে প্রাক সত্তরের শ্লোগান আর অন্যদিকে দেশের মাটিতে বামপন্থার সন্ধান করতে হবে।
সাংবাদিক-ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ বহুদিন আগেই লিখেছেন, যে ভারতীয় কম্যুনিস্টরা দেশের মাটিতে বামপন্থার খোঁজ না করে বিদেশে পাড়ি দেওয়াটা আখেরে তাদের কোনও কাজে আসেনি। ভগৎ সিংয়ের ফাঁসির পরেও তাঁকে বিপ্লবী কম্যুনিস্ট বলে স্বীকার করেনি আগমার্কা কম্যুনিস্ট পার্টি। তারা বিদেশের মাটিতে কম্যুনিস্ট খুঁজেছেন। এ রাজ্যে মমতার হাতে সবকিছু খোয়ানো শুধু নয়, সারা দেশেও তারা কল্কে পাচ্ছে না কারণ দেশের মাটিকেই তারা কোনওদিন মাথায় তুলে নেয়নি। এখন কিঞ্চিত হলেও তাদের ঘুম ভেঙেছে। তাদের মুখপত্রে রামমোহন রায়ের যুক্তিবাদের প্রশংসা চলছে।
একসময় বিমান বসু বিদ্যাসাগর মেলার আয়োজন করেছিলেন, সরকার থেকে যাওয়ার পরেই তাদের মেলাও উঠে যায়। এখন ফের তারা এই দেশের মাটিকে হাতিয়ার করে উঠে দাঁড়াতে চাইছে। তাদের এই আধুনিক সংস্করণে নতুন এবং পুরানোর একটা মেল বন্ধনের চেষ্টা চলছে, আর ভারতীয়ত্বের মধ্যে বামপন্থী দর্শনের চারা প্রোথিত করে তারা আগামী দিনের স্বপ্ন দেখছে। বেলদার কিশোরীর মত আজকের নয়া প্রজন্ম যে বিদেশের মাটি আর পুরানো শ্লোগানে রুচি রাখে না তা ভালমত সিপিএমের হৃদয়ঙ্গম হয়েছে। তাদের কাছে ‘টুকে পাশ’ বা ‘টাইম পাস’ অনেক লাগসই শ্লোগান। তবে সিপিএম বড়ই দেরি করে ফেলল। তাদের বিপরীতে যে অপর কাডারভিত্তিক দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দল এখন বাজার কাঁপাচ্ছে সেই বিজেপি না বলতে শুরু করে, আমরা যে কথাটা এতদিন ধরে বলছি সেটা তোমরা এতদিন পরে কেন ধার করলে। বহুদিন ধরে ‘ভারতীয়ত্ব’ বলে গা গরম করেছে বিজেপি।
বিজেপি বা তৃণমূল কী বলল, তা নিয়ে অবশ্য এখন আর ভাবার সময় নেই মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট দলের। এ লড়াই বাঁচার লড়াই, এ লড়াই জিততে হবে। জেতা-হারার প্রশ্ন পরে আগে তো রিয়া মাইতিদের মাঠে নামানো যাক। পলিত কেশেদের মাঝে একটু সবুজ রং তো অন্তত শোভা পাক।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news