পার্থসারথি পাণ্ডা
তখন রৌদ্র মুহূর্ত। শিবের এক নতুন লীলার সাক্ষী হলেন দেবতারা। ভীষণ রকম কান্না শুনে তাঁরা শিবলোকে ছুটে এলেন। এসে দেখলেন, শিব শিশুরূপে উচ্চৈঃস্বরে কাঁদছেন, আর সেই কান্না প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তিন লোকে। দেবতারা শিবের এই লীলার মর্ম কিছুই না বুঝে কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গেলেন। তখন নারায়ণ এগিয়ে গিয়ে ক্রন্দনরত শিশু শিবকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে শিব, তুমি এমন করে শিশুর মতো কাঁদছ কেন? কাঁদতে কাঁদতে যেন শিশুর আবদারে শিব বললেন, আমায় তুমি সুন্দর একটি নাম দাও, একটিও মনের মতো নাম নেই আমার!’
তখন নারায়ণ স্মিত হেসে বললেন, ‘বেশ। তুমি তো এখন রোদন করছ, তাই তোমার নাম আমি দিলাম, ‘রুদ্র’। নামটা সুন্দর না? এটা নিশ্চয় তোমার মনের মতো হল?’ শিবের কান্না আরও বেড়ে গেল। তিনি অবুঝ শিশুর মতো মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘না না না, তুমি আরও আরও ভালো নাম আমায় দাও!’ নারায়ণ আবার স্মিত হেসে বললেন, ‘আচ্ছা বেশ, তোমার নাম দিচ্ছি তাহলে ‘সর্ব’, ‘শর্ব’ আর ‘উগ্র’। এবার খুশি তো?’ কিন্তু না, তাতেও শিশু ভোলানাথের মন ভরল না। তিনি কাঁদতে কাঁদতে সেই একইভাবে অবুঝের মতো বললেন, ‘না, না, আমায় আরও ভালো নাম দাও!’ তখন বেশ ভাবনায় পড়ে গেলেন নারায়ণ। আকাশ পাতাল ভেবেও বুঝতে পারলেন না কোন নামে শিব তুষ্ট হবেন, কোন নাম পাওয়ার অভিলাষ শিবের মনে! ভাবতে ভাবতেই একসময় তাঁর মাথায় খেলে গেল যেন বোধের বিদ্যুৎ প্রবাহ! পেয়ে গেলেন আশুতোষের তুষ্টির সন্ধান। তিনি স্বভাবসুলভ স্মিত হেসে বললেন, ‘হে শিব, তুমি সকল দেবতাদের মধ্যে প্রধান, তাই তোমার নাম দিলাম, ‘মহাদেব’! এবার তুমি খুশি তো?’ হ্যাঁ, এইবার শিবের মনে ধরল। থেমে গেল তাঁর কান্না। ফুটে উঠল তাঁর মুখে প্রশান্তির হাসি। হ্যাঁ, এই নাম, এই স্বীকৃতিই তো তিনি চাইছিলেন। দেবাদিদেব মহাদেবকে তুষ্ট করতে পেরে নারায়ণের সঙ্গে সমস্ত দেবতারা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন এবার। তাঁরা মহাদেবের বন্দনা করে বিদায় নিলেন।
‘মহাদেব’ নামটি শিবের অত্যন্ত প্রিয় হলেও ‘রুদ্র’, ‘সর্ব’, ‘শর্ব’, ‘উগ্র’ প্রতিটি নামই যেহেতু নারায়ণের দেওয়া; সেহেতু এই নামগুলোও শিবের ভূষণ, শিবের কাছে সম্মানের। এই সমস্ত নামের মাহাত্ম্য শিবের আচরণের সঙ্গে জুড়ে রইলো। রুদ্ররূপে শিব যেন আকাশপাতাল কাঁপানো ভীষণ কান্নার মতোই সংহারের এক মূর্তি। রাজা, মহারাজা, ধনী, দরিদ্র, পাপীতাপি, এমনকি দেবতারাও তাঁর সেই রুদ্ররূপের কোপ থেকে রক্ষা পান না, তাই তিনি এই রূপে পরমেশ্বর। ‘উগ্র’ নামেও তাঁর এই স্বভাবেরই প্রকাশ। আর ‘সর্ব’ ও ‘শর্ব’- নাম দুটির মধ্যে আছে অগ্নির মতো মানুষের সমস্ত কর্মের অহংকার ছাই করে ফেলার ইঙ্গিত। তাই চিতার ছাইয়ের ওপর বসে মহাদেবের এই নামের জপ করেন কেউ, সাধনা করেন কেউ; তাহলে তিনি মহাদেবের প্রিয় হয়ে ওঠেন। আর যেখানে ভক্তের স্থান, সেখানেই ভগবানের বাস। তাই শ্মশানে চিতাভস্মের মাঝে মহাদেবেরও বাস ও বিহার। আসলে, মহাদেবের উদ্দিষ্ট চিতা বা শ্মশান শুধু লৌকিক অর্থেই সীমাবদ্ধ নয়, তা প্রতীকমাত্র। যে মানুষ বা ভক্ত তাঁর অন্তরের সমস্ত কামনা বাসনা, অহং ও আত্মপরবোধ পুড়িয়ে চিতার আগুনের মতো নষ্ট করে দিতে পারেন, তাঁর মধ্যেই মহাদেবের বাস। শিব পুরাণ মহাদেবের শ্মশান বাসের লৌকিক ও আধ্যাত্মিক–এই দুটো দিকই এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news