পার্থসারথি পাণ্ডা
কাল আকাশে যখন মেঘ হাওয়ায় পাল তুলেছিল, পথে তখন জগন্নাথের রথের ধ্বজা সেই হাওয়ায় যেন পত পত করে উড়তে উড়তে হাত বাড়াচ্ছিল সহযাত্রী মেঘের দিকে। তারই চাওয়াতে টুপ টুপ করে ঝরে পড়ল টুকরো টুকরো বৃষ্টি, ভিজিয়ে দিল রেশমের ধ্বজার কাঁপতে থাকা শরীর।
পথের দু’পাশে মানুষের ব্যারিকেড। মাথার ওপর মেঘের ফুটো ছাতা। সেই ছাতা উদোম ভিজিয়ে দিচ্ছিল তাদের। তবু জায়গা ছেড়ে একচুল নড়ছিলেন না কেউ। এমন তো নয়, এঁদের কেউ কোনদিন রথযাত্রা দেখেননি, বরং প্রতি বছরই তো নিয়ম করে দেখে থাকেন—সেই একই সাজ, সেই একই শোভাযাত্রা, একই রীতি, একই আচার, সেই একই দেবতা জগন্নাথ-সুভদ্রা, বলরাম—তাহলে কীসের টানে কেন এই মানুষগুলো বৃষ্টি উপেক্ষা করে ভিড় উপেক্ষা করে নতুন কী দেখার অভিলাষে পথের পাশে অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন? এখানেই বোধহয় ঈশ্বরের লীলা, রবীন্দ্রনাথ এই ‘লীলা’র অন্তরে পেয়েছেন আনন্দ, ঈশ্বরকে প্রতিদিন প্রতিবার নতুন করে দেখার ও পাওয়ার আনন্দ, এঁরাও তখন সেই আনন্দময়লীলা উপভোগ করার জন্যই সবকিছু ভুলে উদ্দীপনাময় আপেক্ষায় ছিলেন।
এই লীলায় শামিল হয়ে জগন্নাথও তখন খুবই আনন্দিত। তিনি রথের এই যাত্রায় আসলে অনুগমন করছিলেন। কারণ, প্রথমে চলছিল দাদা বলরামের রথ, তারপর বোন সুভদ্রার রথ, আর তারপর সব শেষে তাঁর রথ। রথের রশিতে যারা টান দিচ্ছিলেন তাঁরা তখন হয়ে উঠেছিলেন লীলাময়ের লীলার অংশ, তাঁর পার্ষদ। চারিদিক মুখরিত হয়ে উঠেছিল কীর্তনের সুরে আর ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে।
পথের দু’পাশের ভিড় থেকে বার বার ঝলসে উঠছিল মোবাইলের ক্যামেরা, এই যাত্রাটুকু স্থির আর চলমান ফ্রেমে ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষায়। সেই ভিড়েই চোখ খুঁজছিল রাধারানীকে। দেড়শ বছর পার করে দেওয়া সেই বালিকাটিকে। পৃথিবীর বয়স বেড়ে গেলেও তার বয়স এতদিনে একচুল বাড়েনি। সে এখন কলকাতার পথে পথে, স্টেশনের বাইরে বাস করে, বাস করে পথশিশুদের মাঝে। অন্যদিন সে তার অলস হাত বাড়িয়ে দেয় পথচলতি মানুষের দিকে, স্টেশনে টিকিট কাউন্টারের লাইনের পাশে দাঁড়িয়েও অনেকসময় হাত বাড়ায়। অনেকেই তাকে উপেক্ষা করে, কেউ তার অপেক্ষার অবসান ঘটায়। একটাকার সহজ দক্ষিণায়। কিন্তু রথের দিন এই রাধারানী আর এক হাতে মাথার জটাধরা চুলে উকুনের পিছু পিছু এক হাতে বিলি কাটতে কাটতে অন্য হাত কারও দিকে বাড়ায় না। এদিন তার এক হাতে রথের রশি, অন্যহাতে অর্থের প্রার্থনা। ছোট্ট একতলা রথ, তার ভেতরে আরও ছোট্ট মাটির মূর্তিতে গায়ে গা ঘেঁষে পাশাপাশি। মূর্তির সামনে ছোট্ট ঠোঙায় হাতেগোনা কয়েকটা নকুলদানা। রথ চলে অলিগলি বেঁকে, রাধারানী দেখে মা-বাবার হাত ধরে রুনু-টুনু-রিক পাঁপড়ে কামড় দিতে দিতে আরও পাঁচরকমের বায়নাক্কা করতে করতে ছায়াছবির মতো পাশ কাটিয়ে চলে যায়। রাধারানী ভাবে আরও তিনিটে টাকা জমলে সেও একখানা পাঁপড় কিনতে পারবে। হাতে সবে জমেছে টুং টুং কয়েনে দু’টাকা। তবু তখনো তার মনে বেশ আনন্দ। অনেক না-পাওয়া চিরকালই তো আছে, চিরকালই হয়তো থাকবে, হাত পাতা থাকবে, আধ পেটা খাওয়া থাকবে, দু-পাঁচদিন চান না-করা থাকবে, মাথায় উকুনের সংসার বাড়বে, মানুষের উপেক্ষা বাড়বে, আর একটু বয়স বাড়লে চারপাশে লোলুপ দৃষ্টি বাড়বে; তবু সেসব নিয়ে মন আর ভাবতে চায় না রাধারানীর। ঐ যে পথের দুপাশের মানুষ, বড় রথের রশিতে যে সব মানুষ অন্য এক আনন্দে মেতেছে, সেও সেইরকমই এক আনন্দে মাততে চায়। যদিও তার সেই ছোট্ট রথ প্রাতিষ্ঠানিক রথের কাছে তুচ্ছ, সাধারণের চোখে তুচ্ছ, কিন্তু সেখানেও তো তিনিই অধিষ্ঠান করছেন, তাঁর মুখেও তো হাসির রেশ, চোখে ব্রহ্মাণ্ডের বরাভয়। তার সেই ছোট্ট রথের সবটা জুড়েই তিনি আছেন, রাধারানী হয়তো অতটা বোঝে না, তবে আনন্দটুকু সে তার মতো করে চার আনা পায়, আর পায় বারো আনা তৃপ্তি। সেটুকুতেই তার মনে হয়, রথের দিনটা আর পাঁচটা দিনের চেয়ে তার কাছে এক্কেবারে আলাদা। এই মনে হওয়াটাই ‘আনন্দ’, এই মনে হওয়াটাই ‘লীলা’। এই লীলারসেই সাধারণ অসাধারণ হয়ে যায়, পথশিশুটিও পায় অসীম অনন্যসাধারণের সন্ধান। লহমার জন্য হয়ে ওঠে চিরদিনের রাধারানী। বলে ওঠে- ‘জয় জগন্নাথ!’ আর তখনই প্রশান্তিতে ভরে ওঠে প্রভু জগন্নাথের লীলাকমলের মতো ব্রহ্মময় মুখমণ্ডল, সেই প্রশান্তি তিনি ছড়িয়ে দেন চরাচরে…
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news