Breaking News
Home / TRENDING / মৃণাল সেনের সঙ্গে কয়েকটি স্মরণীয় মুহূর্ত

মৃণাল সেনের সঙ্গে কয়েকটি স্মরণীয় মুহূর্ত

পার্থসারথি পাণ্ডা : 

বছর বারো আগের কথা। তখন নন্দনে মাঝেমাঝেই ছোট ছোট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল হতো। বিখ্যাত পরিচালক কিম্বা দেশ ধরে ধরে। নন্দন থেকে বিনিপয়সায় পাস জোগাড় করে সেসব ছবি দেখা যেত। তো, সেবার পাঁচ দিনের একটা ফেস্টিভ্যালে ইরানের ছবি দেখানো হচ্ছে নন্দন টু-তে, প্রতিদিন একটা করে। এই হলটা আকারে ছোট। পিছনের দিকে বসলে ছবি দেখতে তেমন জুত হয় না, চোখজুড়ে কেবল সামনের মাথা আদ্দেক আর পর্দা আদ্দেক। তাই একটু আগে ঢুকে সামনের দিকেই বসেছি। সেদিন দেখানো হবে পরিচালক আলি-রেজা রেইসানের অসাধারণ একটি ছবি, ‘দ্য জার্নি’। এর স্ক্রিপ্ট লিখেছেন বিখ্যাত পরিচালক আব্বাস কিয়ারোস্তামি।

ছবি শুরু হতে মিনিট দশেক দেরি। ডান দিকের রো-এর সামনের সারির দুটো সিট তখনও ফাঁকা। সেখানেই তিন নম্বর সিটে বসা এক ভদ্রলোক, তাঁর পিছনের সিটের আর এক ভদ্রলোকের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিয়েছেন। হঠাত দেখি হলের ভেতর মৃণাল সেন ঢুকেই হন হন করে এগিয়ে যাচ্ছেন ঐ দুটো ফাঁকা সিটের দিকে। তিনি কাছে যেতেই দুই ভদ্রলোকের গল্প থেমে গেল। তাঁরা মৃণাল সেনের পরিচিত নন বলেই মনে হল। তবু, প্রথম সারির ভদ্রলোক একটা সিটে মৃদু চাপড় দিতে দিতে বললেন, ‘মৃণালদা, বসুন…এখানটায় বসুন।’ অযাচিত খাতির করতে দেখে মৃণাল সেন তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে পড়েই গম্ভীরভাবে বললেন, ‘ওটা কি ভাঙা?’ ভদ্রলোক তাঁর রসিকতা বুঝতে না-পেরে একটু ভেবলে গেলেন। আমতা আমতা করে বললেন, ‘কই ভাঙা না তো, ভালোই তো…’। মৃণাল এবার হাসতে হাসতে ‘ও আচ্ছা, তাহলে বসছি’ বলে ভদ্রলোকের দেখানো সিটটাতেই বসে পড়লেন। শুনতাম মৃণাল সেন নাকি দারুণ রসিক মানুষ, সেদিন সেই মায়াবী আলোর প্রেক্ষাগৃহে তাঁর সেই রসিক মনের পরিচয় পেয়েছিলাম।

এসময়ই একবার সৌভাগ্য হয়েছিল নন্দনেরই একটা সেমিনারে তাঁর মুখে তাঁর ছবির কিছু অভিজ্ঞতা শোনার।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পটি থেকে পূর্ণেন্দু পত্রী ‘স্বপ্ন নিয়ে’ বলে একটা ছবি করেছিলেন। ছবিটা প্রেমেন্দ্র মিত্রের একদম পছন্দ হয়নি। কথায় কথায় মৃণালকে সেকথা একদিন বললেনও তিনি, ‘ছবিটা কিচ্ছু হয়নি জানো, কিচ্ছু হয়নি…’। তাঁর বলার মধ্যে অদ্ভুত একটা কষ্ট ছিল, শিল্পী মনের দারুণ এক যন্ত্রণা ছিল। সেই যন্ত্রণা চেতনে-অবচেতনে ছুঁয়ে গিয়েছিল মৃণালকেও, তিনিও তো শিল্পী। তাই হয়তো একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। সেটা চেতন-অবচেতনের খেলায়, নাকি কাকতালীয়ভাবে-জানি না…

তখন ‘খারিজ’ ছবি করে ফেলেছেন মৃণাল। একদিন মাঝরাতে ঘুমটা ভেঙে গেল। এবার পরের ছবি তো করতে হবে, কিন্তু কি নিয়ে করবেন? কোন বিষয়ে? সেই ভাবনায় অস্থির হয়ে পায়চারি শুরু করলেন। সে যেন এক দিশাহীন অবস্থা।

তবে, এই রকম দিশাহীন অবস্থায় পড়লেই তিনি একটা খেলা খেলতেন। যে-কোন একটা বই টেনে নিতেন, তার যে-অংশটা এক টানে খোলে সেই অংশটাই পড়তে শুরু করতেন। সেভাবেই তিনি এবারও যেন অবচেতনায় র‍্যাক থেকে টেনে নিলেন একটা বই। দেখা গেল, বইটা আসলে ‘প্রেমেন্দ্র মিত্রের শ্রেষ্ঠ গল্প’। আর অদ্ভূতভাবেই এক টানে বইটা খুলে যে গল্পটা প্রথম বেরোল, সেটা ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’!

অসাধারণ সেই গল্পটা তিনি এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললেন। একবার, দু’বার, কয়েকবার। মাথার মধ্যে ভিড় করতে লাগল ছায়া ছায়া ছবিরা। তখনই ঠিক করে ফেললেন, এটাই ছবি করবেন। কিন্তু বাংলাতে তো আর করা যাবে না, করতে হলে হিন্দিতে করতে হবে। তাই সই। পরদিন সকালেই ছুটলেন প্রেমেন্দ্র মিত্রের কাছে। তাঁকে ছবির কথা বলতেই তিনি তো বেজায় খুশি, ‘করো করো, তুমি করলে ভালো হবে। তবে একটু তাড়াতাড়ি করো, চোখ দুটো শেষ হয়ে যেতে বসেছে, দেখো, ছবিটা যেন দেখতে পাই…’।

তখন প্রেমেন্দ্র মিত্রের দৃষ্টিশক্তি ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছিল, এগিয়ে যাচ্ছিলেন অন্ধত্বের দিকে। তবে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যাবার আগেই তাঁর ইচ্ছে পূরণ করতে পেরেছিলেন মৃণাল। অসম্ভব পরিশ্রম দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি গল্পটি থেকে তৈরি করে ফেলেছিলেন ‘খণ্ডহর’ ছবিটি। রিলিজের আগেই স্পেশ্যাল স্ক্রিনিং-এর ব্যবস্থা করেছিলেন প্রেমেনের জন্য। অন্ধকার প্রেক্ষাঘরে ক্ষীণতর দৃষ্টি নিয়ে ছবিটি দেখে মুগ্ধ প্রেমেন ইচ্ছেপূরণের আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন। আবেগে জড়িয়ে ধরেছিলেন মৃণালকে। মৃণালের মুখেও তখন নিশ্চয়ই ফুটে উঠেছিল মানুষ ও শিল্পীর অনির্বচনীয় এক দীর্ঘস্থায়ী তৃপ্তি। দীর্ঘস্থায়ী বলেই এত বছর পর সেদিন শতখানেক ফিল্ম বুঝতে চাওয়া ছেলেমেয়ের মাঝে এই স্মৃতিটি চারণার মুহূর্তে তাঁর মুখে সেই তৃপ্তির স্বাদ আমি পেয়েছিলাম!

বারো বছর আগের সেই সেমিনারেই মৃণাল জানিয়েছিলেন, সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা। দু’জন দুই মনন ও মেজাজের শিল্পী। তাই শিল্প নিয়ে তাঁদের মধ্যে অনেক সময়ই মতানৈক্য হয়েছে, মনোমালিন্য কখনই হয়নি। তাঁর ‘আকাশ কুসুম’ ছবিটি সত্যজিতের পছন্দ হয়নি, সেই অপছন্দের কথা সত্যজিৎ বলেছিলেন, লিখেওছিলেন। তাই নিয়ে দুজনের যুক্তি-প্রতিযুক্তিতে পত্রিকার পাতার আসর গরম হয়েছে। কিন্তু এই মতানৈক্য সেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহজ বন্ধুত্বের জন্যই মনোমালিন্যতে গিয়ে পৌঁছয়নি। মৃণাল বলছিলেন, ‘ভুল মাস্টার্সদেরও হয়।’

একবার সত্যজিৎ মৃণালকে দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘কাদের জন্য সিনেমা বানাচ্ছি মৃণালবাবু! বন্ধুর মুখে অপর্ণার মৃত্যুর খবরটা শুনে শোকে অপু তাকে চড় মারল, এতেও তারা হেসে ওঠে!’ মৃণাল বলেছিলেন, ‘ভুলটা কিন্তু আপনারই মানিকবাবু। চড় খাওয়ার পর আবার বন্ধুর রিয়াকশন লাগিয়েছেন। ওর বোকা বোকা রিয়াকশন দেখে দর্শক তো হাসবেই! তাদের দোষ কি, ভুলটা তো আপনারই।’ সঙ্গে ছিলেন সত্যজিতের স্ত্রী বিজয়া। তাই শুনে তিনি বলেছিলেন, ‘এ কী কথা বলছেন মৃণালবাবু-’। তাঁকে থামিয়ে দিয়ে সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘উনি ঠিকই বলেছেন। সত্যিই এটা ভুল হয়েছে।’

এঁরা মাস্টার বলেই মহৎ। একে-অপরের কাছে সৎ-ভাবে ভুল স্বীকার করতে তাই তাঁদের বাঁধেনি। একে-অপরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শিল্পের কাছে সৎ না-থাকলে এটা কখনই সম্ভব হতো না।

মৃণাল সেনকে কাছ থেকে দেখার কোন সুযোগ হয়নি। চকিতে সামনে থেকে দেখেছি, তাও তো বারদুয়েক মাত্র। আর ঐ সেমিনারসূত্রেই একবার হয়েছিল তাঁর চরণ ছোঁয়ার সৌভাগ্য। সেটুকুই আমার সম্পদ।

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *