শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়
মৃণাল সেন সম্পর্কে গল্পটা এক বন্ধু বলেছিল। হতে পারে পুরোটাই বানানো। হতে পারে নিখাদ সত্যি। তখনও এসআরএফটিআই তৈরি হয়নি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স চালু করার চিন্তাভাবনা চলছে। বাংলার বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকারেরা বসেছেন বৈঠকে। আলোচনা চলছে পাঠক্রম নিয়ে। কোন কোন বিষয় নিয়ে কত নম্বরের পরীক্ষা থাকা উচিত, সেই নিয়ে মতবিনিময়। একজন প্রস্তাব দিয়েছেন এরকম— ভারতীয় সিনেমা ১০০ নম্বরের, হলিউড সিনেমা ৫০, আর হলিউডের বাইরের আন্তর্জাতিক সিনেমা ৫০ নম্বর। মৃণাল সেন নাকি বলেছিলেন, ‘না না, ভারতীয় সিনেমা ৫০ হলেই হবে। বাকি ৫০ আলাদা করে লাটিন আমেরিকান সিনেমা নিয়ে।’ একজন ইতস্তত করে নাকি বলেছিলেন, ‘লাটিন আমেরিকান সিনেমা নিয়ে তো বাংলা ভাষায় তেমন বই–টই পাওয়া যায় না...’ মৃণালবাবু বাধা দিয়ে বলেছিলেন, ‘বই না থাকলে বই লেখা হবে!’ কে লিখবে সেই বই? অতটা ব্যুৎপত্তি কার আছে? দাঁতের ফাঁকে পাইপ কামড়ে ধরে মৃণাল সেনের সটান জবাব, ‘আমার বন্ধু লিখবে।’ আচ্ছা বেশ। কে সেই বন্ধু? কোথায় যোগাযোগ করা যাবে? একইরকম ত্বরিত জবাব এসেছিল— বুয়েনস্ আয়ের্স!
এই গল্পটা নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রায়শই হাসাহাসি হতো। কিন্তু হাসির পরতটা খসে পড়লে যেটা থাকত, সেটা এক চলচ্চিত্রকারের আন্তর্জাতিক মনন। অথচ মানুষটা একই সঙ্গে কী অসম্ভব স্থানীয় এবং সহজলভ্য ছিলেন। আজকাল যে পরিচালকরা সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে বিরুদ্ধবাদীদের ‘ব্লক’ করে দেন সোশাল মিডিয়ায়, তাঁরা হয়ত ভাবতেও পারবেন না, কত সহজে লোকটার কাছে এগিয়ে গিয়ে কথা বলা যেত। হ্যাঁ, সমালোচনাও গুরুত্ব দিয়ে শুনতেন। তার পাল্টা যুক্তিগুলো দিয়ে নিজের কাজটাকে, তার সপক্ষের যুক্তিগুলোকে সমর্থন করতেন।
একটা ঘটনা খুব মনে পড়ছে এই প্রসঙ্গে। জার্মানি থেকে, জার্মান রেডিও ডয়চে ভেলের জন্যে মৃণাল সেনের একটা সাক্ষাৎকার নেব। টেলিফোনে। যেহেতু বড় সাক্ষাৎকার, তার আগে একটু পড়াশোনা করেছি। করতে গিয়ে জানতে পেরেছি মৃণাল সেনের প্রথম ছবি ‘রাতভোর’–এর কথা, যেটা নিয়ে প্রকাশ্যে উনি কখনও আলোচনা করতে চান না। মনে হয়েছে, এই তো, পেয়ে গেছি! দুর্বল জায়গার খোঁজ। আসলে তখন আমার সেই বয়েস, যখন বিখ্যাতদের বিপাকে ফেলতে পারলে এক ধরনের অসভ্য ফূর্তি হয় সাংবাদিক হিসেবে! তো শুরু হয়েছে সাক্ষাৎকার। ‘বাইশে শ্রাবণ’ ছবির প্রসঙ্গ দিয়ে আলোচনা শুরু। তার পর ‘ভুবন সোম’, ‘আকালের সন্ধানে’, ‘খারিজ’। প্রচুর কথা বলছেন মৃণাল সেন। একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে চলে যাচ্ছেন প্রসঙ্গান্তরে। ভাল সাক্ষাৎকার বলতে যা বোঝায়, সেটাই চলছে তখন। কাজেই কোনও দরকারই ছিল না তার মাঝখানে একটা নেহাতই অপ্রিয় প্রসঙ্গ টেনে আনার। কিন্তু বোকাপাঁঠা যেহেতু ঢুঁসো মারার বদভ্যাস ভুলতে পারে না, দুম করে জিজ্ঞেস করলাম— আচ্ছা, রাতভোর ছবিটা নিয়ে আপনি কখনও আলোচনা করেন না কেন?
কয়েক মিনিটের অস্বস্তিকর নীরবতা। আমি ততক্ষণে ভাবতে শুরু করেছি, এবার বোধহয় ফোনটা রেখে দেবেন। অন্য যে কোনও পরিচালক হলে বোধহয় তাইই করতেন। কিন্তু তিনি মৃণাল সেন। খোঁচা খেয়ে যেমন মানুষ অস্ফুট আর্তনাদ করে ওঠে, ঠিক সেইভাবে তিনি বললেন— ‘আ–আ–হ, ওই ছবিটার কথা আপনি মনে করিয়ে দিলেন কেন! ওটা খুব খারাপ ছবি একটা। আমি ওই ছবিটার কথা ভুলে যেতে চাই!’ কিন্তু তার পর যেটা করলেন, সেটাও বোধহয় একমাত্র মৃণাল সেনই করতে পারেন। আমাকে বোঝাতে শুরু করলেন, কেন ছবিটা খারাপ, কোথায় খারাপ। অথচ উনি জানেন রেকর্ডিং চলছে। নিজের প্রথম কাজের যা যা খুঁত তিনি ধরিয়ে দিচ্ছেন, সব ধরে রাখা হচ্ছে টেপে। তাও, কথাগুলো যেন ওঁকে বলতেই হতো। বললেন। তার পর বললেন, সাক্ষাৎকারে এই কথাগুলো না থাকলেই ভাল হয়।
থাকেনি। বাদ দিয়েছিলাম। এমনকি আলাদা করে আর্কাইভ করাও থাকেনি। কারণ জীবনের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ততক্ষণে আমায় দিয়ে দিয়েছেন মৃণাল সেন। নিজের বিশ্বাসের মতো, নিজের ভুলগুলো সম্পর্কেও একইরকম সৎ থাকতে হয়। সেই সততার অপব্যবহার হবে কি না, ভাবতে নেই। বরং বিশ্বাস রাখতে হয়। মৃণাল সেন তাঁর সিনেমার মধ্যে দিয়ে সেই টুকরো টুকরো বিশ্বাসই আমাদের দিয়ে গেছেন।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news