নিজস্ব সংবাদদাতা:
পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্র নেই– সময় থেকে সময়ান্তরে জনগণমন রচয়িতার জন্মস্থানের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠছে। সিদ্ধার্থ জমানার এমার্জেন্সির আলোচনা এক পাশে সরিয়ে রেখে বাম আমলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আবার মমতার আমলে বিজেপির গণতন্ত্র রক্ষার যাত্রা : একটি বিষয় অবশ্যই প্রমান করে যে রাজা আসে যায়, দিন বদলায় না!
কোনও দেশে বা কোনও রাজ্যে গণতন্ত্র আছে না নেই তা বোঝার কোনও মাপকাঠি আছে কি?
ভারত বিখ্যাত আইনজীবী সোলি সোরাবজি এই প্রসঙ্গে খুব গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার সঙ্গে যদি কেউ কোনও অঞ্চলের গণতন্ত্র প্রসঙ্গে কথা বলতে আসেন, আমি তবে সেই অঞ্চলের সংবাদপত্রে ও নিম্ন আদালতের রায়ে গণতন্ত্র আছে কিনা তা আগে দেখব। যদি দেখা যায় সেখানকার সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয়তে কেবলই শাসকের জয়গান, তাহলে ধরে নিতে হবে সেখানে গণতন্ত্র নেই। যদি দেখা যায় সেই অঞ্চলের নিম্ন আদালত কেবলই প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে চলেছে, তবে সেই অঞ্চলে গণতন্ত্র নেই। পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দারা সোরাবজির তত্ত্বের সঙ্গে নিজের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি একবার মিলিয়ে দেখে নিতে পারেন। কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী ও কংগ্রেসী ঘরানার রাজনীতিক অরুণাভ ঘোষ সোরাবজির বক্তব্যের খেই ধরেই বলেন, “যে রাজ্যের ভোটে বিরোধী প্রার্থী নেই, যেখানে শাসক দল ৭০% আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দীতায় জিতে যায় গায়ের জোরে। কিংবা বিরোধীরা ভয়ে প্রকাশ্যে আসতে চায় না, তার মানে সেখানে গণতন্ত্র নেই।” এক সময় বিধানসভার ভেতরে প্রায়ই রেগে উঠতেন তৎকালীন বিধায়ক সৌগত রায়। বলতেন, এই সরকার বিরোধীদের কথা বলতে দেয় না। ঘনিষ্ঠ আলোচনায় এই অধ্যাপক রাজনীতিকের মত ছিল, গণতন্ত্রে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার ফলাফল বিপজ্জনক হয়। এই প্রবণতা উগ্র রাজনীতির জন্ম দেয়।
সেই সব সময় এখন অতীত হলেও পরিস্থিতির বদল হয়েছে কী! উপর্যুপরি চারবার মুকুল রায়ের সভা বাতিল করে দিয়েছে প্রশাসন। এই ঘটনায় মুকুলের মুখ বন্ধ করতে মমতা-প্রশাসনের তৎপরতাই লক্ষ্য করছেন রাজ্যের নাগরিক সমাজের একাংশ। অরুণাভ ঘোষ বলেন, “হতে পারে ‘আমার’ সঙ্গে কারও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য আছে। কিন্তু তাই বলে ‘আমি’ তাকে সভা করতে দেব না! এর মানে ‘আমি’ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি না। এই ‘আমি’ হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এই কাজ করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আসলে মুকুল রায়কে আরও বড় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা দিচ্ছেন। হয়তো মুকুল রায়ের গুড়াপের সভা বেশি মানুষের চোখে পড়ত না। কিন্তু ওই সভা আটকানোয় তা চোখে পড়ছে। আসলে মুকুল রায়ের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। কারণ পর পর চার বার সভা আটকে মমতা প্রকারান্তরে মুকুলের গুরুত্ব বাড়িয়ে চলেছেন। এও সত্যি, যে মমতা মুকুলের সভাকে ভয় পাচ্ছেন। তাই তাঁর কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।’
বিশিষ্ট চিত্রকর সমীর আইচ এই খবরে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, “যে কোনও অসভ্যতারই আমি বিরোধী। মুকুল রায়ের কণ্ঠরোধ করার যে চেষ্টা চলছে তা দুর্ভাগ্যজনক। নিন্দা করার ভাষা নেই।”
সুপ্রীম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “এরকম চলতে পারে না। একটা স্বীকৃত রাজনৈতিক দল, যারা কেন্দ্রে ক্ষমতায় রয়েছে, তাদের সভা করতে না দেওয়ার ঘটনা অবাক করছে।”
অধ্যাপক এবং রাজ্যে রাজনৈতিক আলোচনার অতি পরিচিত মুখ বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঘটনার নিন্দা করলেও তাঁর মতামত কিছুটা ভিন্ন। তাঁর কথায়, ” গণতন্ত্র রক্ষার দায় বিরোধীদের বেশি। বিজেপি কেন ওখানে অবস্থান করে প্রতিবাদ আন্দোলন করল না?” বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন মুকুল রায়। তিনি বলেন, “ট্রিগার হ্যাপি মমতার প্রশাসনে তেমন কিছু করতে গেলে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা হত। আরও কয়েকজন মায়ের কোল খালি হত। পরিস্থিতি বুঝেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news