পার্থসারথি পাণ্ডা :
প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ ‘হিমু’ নামের একটি বুদ্ধিমান বাউন্ডুলে চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন। ‘হিমুর মধ্যদুপুর’ উপন্যাসে সেই হিমুর অসাধারণ একটি পর্যবেক্ষণ এবং দারুণ একটি উপলব্ধি রয়েছে বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে, দাঁড়ান, সেটা হুবহু তুলে দিই– ”সবচে সহজ পণ্য হল মানুষ। মানুষ কেনা কোন সমস্যাই না। মানুষদের মধ্যে সহজেই কেনা যায় বুদ্ধিজীবীদের। তাঁরা খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেন কখন বিক্রি হবেন।” এই উপলব্ধি ও পর্যবেক্ষণ কানা বেগুন কেনা বাঙালির বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার সঙ্গে একেবারে খাপে খাপ মিলে যাচ্ছে! আমি তো দাদা বঙ্গসন্তান পঞ্চুর বাপ, তাই দেদার মিল পাচ্ছি!
এ দেশে বুদ্ধিজীবী কারা? হালের সংজ্ঞায়, যাঁরা শিল্পসাহিত্যের স্রষ্টা এবং সেই সৃষ্টির বুদ্ধিদীপ্ত বিশ্লেষক, তাঁরাই বুদ্ধিজীবী। যাঁরা নিয়মিত মিডিয়ায় সমাজ-শিল্প-মানবাধিকার বিষয়ে ক্ষোভ উগরে দেন এবং সময়ে সময়ে নিতান্তই চুপ করে থাকেন, তাঁরাই বুদ্ধিজীবী। উট যেমন কাঁটা বেছে বেছে খায়, তেমনি যাঁরা আখের বুঝে বেছে বেছে প্রতিবাদ করেন, তাঁরাই বুদ্ধিজীবী। যাঁরা কোন প্রতিবাদসভায় আমন্ত্রিত হয়ে বা নিজের গরজে আচমকা হাজির হয়ে মোবাইল দেখে সদ্য ধোঁয়া ওঠা উদ্দীপনী কবিতা পাঠ করেন ও গিটার কাঁখালে উজ্জীবনী গান করে তাকে আন্দোলনের রূপ দিয়ে ছাড়েন এবং তারপর যাঁদের আর পাত্তা পাওয়া যায় না, তাঁরাই বুদ্ধিজীবী। যাঁরা শিরদাঁড়ার বন্দনা গেয়ে, ‘বন্দেগি জাহাঁপনা’য় মঞ্চ মাতান, তাঁরাই বুদ্ধিজীবী। যাঁরা যুদ্ধের সময় পিছনে থাকেন, লঙ্গরখানায় আগে লাইন দেন, তাঁরাই বুদ্ধিজীবী।
আপনি যদি প্রাচীনপন্থী হন, ‘বুদ্ধিজীবী’ বলতে আপনি যদি কয়েক দশক আগের প্রাচীন বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের ছবি চোখের সামনে খুলে বসেন, তাহলে খুব বড় ভুল করবেন। সেইসব বুদ্ধিজীবীরা বড্ড আবেগপ্রবণ আদর্শবাদী ছিলেন, শিক্ষাটাকে ধান্দাবাজিতে লাগাবার মতো মোটেই হিসেবী এবং চালাক ছিলেন না। তাঁদের অনেকের গায়েই হয়তো পার্টির স্ট্যাম্প পড়েছিল, কিন্তু আদর্শে না বনলে তাঁরা সেই পার্টির সংশ্রব ছাড়তেও দ্বিধা করেননি। নিজের আদর্শে অটল এই মানুষগুলো নিজের আখের গোছাতে নীতিহীন বিরুদ্ধ পার্টিতে নাম লেখাবার কথা ভাবতেও পারেননি। তখন বুদ্ধিজীবনের আর এক নাম ছিল স্যাক্রিফাইস। এখন অবশ্য সে-সব কথা ভুলে যান। পরিবর্তনের ক’দিন আগে থেকেই আম আদমির কাছে ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটি নেহাতই একটি উৎকৃষ্ট গালাগালে পরিণত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে শব্দটি বাংলা গালি অভিধানে সম্মানের সঙ্গে জায়গা করে নেবে এবং বাছা বাছা কয়েকজনের নাম তাতে উদাহরণ হিসেবে সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে বলেও আশা করা যায়! যা বলছিলাম, এখন ‘বুদ্ধিজীবী’ মানেই মতাদর্শ আর জীবনযুদ্ধ এক করা গাল-তোবড়ানো বুদ্ধিদীপ্ত চোখের একটা চেহারা নয়, সে চেহারায় এখন একরাশ গ্ল্যামার। তাই এই গ্ল্যামারাস বুদ্ধিজীবীরা প্রতিবাদ জানাতে যান সেখানেই, যেখানে গ্ল্যামার আছে।
যেমন ধরুন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যদি কোন বিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন সংগঠিত করেন, তাহলে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কম্পিটিশান শুরু হয়ে যায়, কে আগে অংশ নিতে পারেন, তার জন্য! ছাত্রছাত্রীদের দাবি তাঁদেরও দাবি কি না, সেটা বড় কথা নয়; আসল কথা হচ্ছে, সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের সংগঠন মজবুত কিনা, তাঁদের আন্দোলনকে মিডিয়া গুরুত্ব দিচ্ছে কি না, সরকার আজ হোক বা কাল এই আন্দোলনকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবে কি না ইত্যাদি ইত্যাদি। এই শর্তগুলো পূরণ হলেই তাঁরা সেখানে হাজির হবেন। কারণ, তার মধ্যেই গ্ল্যামার আছে, প্রগতিশীল ভাবমূর্তি বজায় রেখে জনপ্রিয় হওয়ার সুযোগ আছে!
অন্যদিকে ধর্মতলার মেয়ো রোডে এসএসসি চাকরিপ্রার্থীদের অনশন মঞ্চে গেঁয়ো গেঁয়ো চেহারার ছেলেমেয়েগুলো সরকারের অন্যায় ব্যবস্থার মধ্যে চাকরির দাবিতে নিরন্তর রিলে অনশন করে একে একে অসুস্থ হচ্ছে, ইতিমধ্যেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে অনেককে। এমনকি অনশন করতে করতে সন্তানসম্ভবা একটি মেয়ের গর্ভপাতও হয়ে গেছে ক’দিন আগে। সরকারী উপেক্ষা আর অকালের ঝড়বৃষ্টিতে মাথায় তেরপল টেনে নিজেদের দাবি নিয়ে মাটি কামড়ে পড়ে আছে তারা। ভোটের দিন ঘোষণা হতেই ভোট নিয়ে ব্যস্ত হয়েছে মিডিয়া, বদান্যতা হারিয়েছে তারা। পক্ষকাল পেরিয়ে যাওয়া এই আন্দোলনে এখনো কোন বুদ্ধিজীবীর আগমণ বা অনুপ্রবেশ কিছুই ঘটেনি। গেঁয়ো গেঁয়ো ছেলেমেয়েদের প্রতিবাদে সে গ্ল্যামার কোথায়! এসব ক্লিশে ব্যাপার নিয়ে তো আর কবিতা-গান লেখা যায় না, আরে বাবা, ভেতর থেকে না এলে এ তো আর টেনে আনবার নয়! আর তাছাড়া, সরকারী ব্যবস্থার সঙ্গে একরকম সন্ধি তো হয়েই রয়েছে!
ভোটের প্রাক্কালে ঘোড়াকেনাবেচার কালে, বেশ কয়েকবছর হল বুদ্ধিজীবীদের দর বেড়েছে খুব। নির্বাচন কমিশন যাঁদের ‘ভোটার’ বলেন,
সেইসব জনগণের দুর্বলতা দুই জায়গায়। সেটা খেয়াল রেখে যাঁদের অভিনেতা-অভিনেত্রীর গ্ল্যামার দিয়ে মাত করা যাবে না, তাদের রাজনেতার ঢপচাতুরীর সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদের বাকচাতুরী মিশিয়ে মাত করা হবে। আমাদের আজন্ম বিশ্বাস, বুদ্ধিজীবীরা তলিয়ে ভাবার তৃতীয় চোখ দিয়ে অনেকদূর দেখতে পান, তাঁরা ক্রান্তদর্শী। ফলে, তাঁরা দেশ লাটে উঠেছে বললে আমরা ধরেই নিই দেশ উচ্ছন্নে গেছে আর দেশ প্রগতির শিখরে বললেই তুর্কি নাচনে মেতে উঠি। এঁরা যার যার কাছে বিক্রি হন, লেখা দিয়ে শিল্প দিয়ে তাঁরা তাঁদের সপক্ষে প্রচার করেন। দুঃখের হলেও সত্য কথা, হাতে গোনা দু’একজন ছাড়া আজ বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন, বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন, শ্রদ্ধা হারিয়েছেন! ঠকতে ঠকতে আমরা এতদিনে বুঝেছি, যৌথখামারের গান লিখতে সাম্যবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ হবার কোন প্রয়োজন নেই; ছন্দের জ্ঞান, শ্রোতার মন বুঝে ভাষার মারপ্যাঁচে প্রগতির বুকতানি আর হাওয়া বুঝে বাজার ধরতে পারার গুণ–এগুলো থাকলেই হল আর কিচ্ছু চাই না।
ধান্দাবাজ বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে বিক্ষুব্ধ বুদ্ধিজীবীরা দরে সস্তা। যতটা সম্মান পাবার কথা ছিল ততটা নাকি পাননি, যতটা বদান্যতা পাওয়ার কথা ছিল তাও নাকি পাননি–এই হল বিক্ষুব্ধদের কমন ক্ষোভ। যেন এই সম্মান আর বদান্যতার হিসেবটুকু কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে নিতেই তাঁরা শিল্পীসাহিত্যিকবুদ্ধিজীবী হতে জন্ম নিয়েছিলেন, জীবনে যেন আর কোন তাঁদের আবেগ ছিল না, লক্ষ্যও ছিল না। তাঁরা যেন এলোমেলো করে দে মা, লুটেপুটে খাই নেতাদেরই দ্বিতীয় সংস্করণ! এঁদের খানিক তোল্লাই দাও, দু’একটা সস্তা পুরস্কার বা উপাধিটুপাধি দিয়ে দাও, চৌদ্দপুরুষেও বুঝবে না এমন একটা সরকারী ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব দিয়ে দাও। তাতেই এঁরা ধন্য। ব্যস, থলে ভর্তি, বাজার করা শেষ! তারপরই সার্কাস শুরু, রিংয়ের ভেতর এবং বাইরে; নাচাও তাদের তাইরে নাইরে নাইরে! তখন শিল্প-সাহিত্য এবং সততা, পা চাটবে ক্ষমতার!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news