মূল রচনাঃ হরিশঙ্কর পরসাই
অনুবাদঃ পার্থসারথি পাণ্ডা
বড় চকমেলানো বিরাট একটা বাড়ি। তাতে তেরোটা ফ্যামিলি ভাড়া থাকে। বাড়ির মালিক চৌধুরিবাবু। তিনি পাশেই থাকেন, আর একটা বাড়িতে।
ভাড়ার বাড়িটাতে নতুন ভাড়াটে হয়ে এলেন এক ডেপুটি কালেক্টর। তিনি এর আগে গোয়ালিয়রে ছিলেন। সেখানকার এক লেডি টাইপিস্টের সঙ্গে লটঘট কেসে ধরা পড়েছিলেন, বিষয়টা কোর্ট অব্দি গড়িয়েছিল এবং পুরো একটা বছর উনি সাসপেন্ড ছিলেন। লোকাল খবরের কাগজে এ-নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছিল। কিন্তু যে কারণেই হোক মামলাটা ডিসমিস হয়ে গেল। ডেপুটিসাহেব চাকরিতে বহাল হলেন এবং বদলি নিয়ে এ-শহরে চলে এলেন।
ডেপুটিসাহেব আসার আগেই তাঁর আগের অফিসের এক শুভাকাঙ্ক্ষী এখানে এসে সাড়ম্বরে এসব কীর্তিকলাপের কাহিনি রটিয়ে গেল। এও বলে গেল যে, ডেপুটিসাহেব আসলেই খুব বাজে স্বভাবের, লম্পট ও চরিত্রহীন একটা লোক। এর আগে যেখানেই থেকেছেন, সেখানেই একটা-না-একটা কাণ্ড বাঁধিয়ে এসেছেন। কাজেই এসব কথা তেরোটা ফ্যামিলির মধ্যে হু হু করে ছড়িয়ে পড়তে দেরি হল না। তখন সবাই নিজেদের মধ্যে গজগজ করতে লাগল, আরে ভাই, এটা ভদ্দরলোকের পাড়া, ভদ্দরলোকের বাসা; সেই এখানেই কিনা এরকম একটা যাচ্ছেতাই লোককে এনে বসাচ্ছেন চৌধুরিবাবু! এটা কিন্তু খুব খারাপ হচ্ছে!
ডেপুটিসাহেব ভাড়া বাড়িটাতে পা দিয়েই বুঝতে পারলেন যে, তাঁর সব কাণ্ডকারখানা ইতিমধ্যেই এখানকার সবাই জেনে গেছে! তাই তাদের চোখে কেমন যেন ঘেন্না ঘেন্না দৃষ্টি! হঠাতই তাঁর নিজেকে বড় হীন মনে হয়, অসহায় বোধ হয়, বুকে একটা অস্বস্তি চেপে বসে। কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলে না, তিনিও কারো সঙ্গে কথা বলতে পারেন না। কেবল মাথা হেঁট করে কাজে যান আর ফিরে আসেন।
দিন দিন ভাড়াটেদের আফসোস বাড়ে; হায় রে, ভদ্দরলোকের পাড়ায়, ভদ্দরলোকের বাসায় শেষে কিনা এমন একটা লোক এসে জুটল!
অন্য কারও সঙ্গে না-হলেও আমার সঙ্গে ডেপুটিসাহেবের যৎসামান্য কথাবার্তা চলে। উনি সঙ্গে পরিবার আনেননি, একলাই থাকেন; আমারও সে বালাই নেই, তাই। কখনো-সখনো ইচ্ছে হলে উনি আমার কাছে এসে অল্প-একটু বসেন।
এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন উনি আমাকে এসে বললেন, এখানকার দাসবাবু কোথায় যান জানেন? দু’নম্বর রেলব্রিজ পেরিয়ে একটা বাজে মেয়েছেলের কাছে! বুঝতে পারছেন কাণ্ডটা!
পরদিন দেখলাম, ডেপুটিসাহেবের হেঁট মাথা যেন খানিকটা উঁচু হয়েছে!
এদিকে ভাড়াটেদের আফসোস তখনও ঘোচে না, শেষে কিনা এমন দুশ্চরিত্র-লম্পট একটা লোককেই আমাদের সঙ্গে এসে জুটতে হল! দুত্তোর!
দু’তিন দিন পরে ডেপুটিসাহেব আবার হাজির। বললেন, ঐ যে আমাদের মিসেস চোপড়া, তাঁর কেচ্ছার কথাটা কি জানেন? আরে ওনার বিয়েটাই তো একটা জলজ্যান্ত কেচ্ছা! তিনজনের সঙ্গে জব্বর লুল্লুড়ি, তাতেই পেট ফুলে ঢোল! ঐ তিনজনের মধ্যে চোপড়াই একমাত্র ব্যাচেলার ছিল, তাই ওকেই বিয়েটা করতে হল।
দেখলাম, পরদিন ডেপুটিসাহেবের মাথা আর একটু উঁচু হল।
তখনও অবশ্য ভাড়াটেরা বলতে ছাড়ল না, সবই কপালের দোষ রে ভাই, তাই এমন একটা বেচাল লোকের পাল্লায় এক খোঁয়াড়ে থাকতে হচ্ছে, ছ্যাঃ ছ্যাঃ ছ্যাঃ ছ্যাঃ!
দিন তিন-চারেক পরে ডেপুটিসাহেব যেন এক্কেবারে হাঁপাতে হাঁপাতে এলেন। এসেই বললেন, শ্রীবাস্তবের মেয়ের কাণ্ডটা শুনেছেন? উচ্ছন্নে গেছে বুঝলেন, উচ্ছন্নে গেছে! গ্রিন হোটেলে একটা লোকের সঙ্গে নাকি ধরা পড়েছে! কি কেলেঙ্কারি বলুন তো!
ডেপুটিসাহেবের মাথা এবার আর একটু উঁচু হল।
ভাড়াটেদের ভাবনা তবুও যেন যায় না, আপদমার্কা লোকটা কবে যে বিদেয় হবে কে জানে! এতটা দুশ্চরিত্রও মানুষ হয়!
কেমন করে কে জানে, অল্পদিনেই ডেপুটিসাহেব এখানকার প্রায় সবারই কিছু-না-কিছু গোপন কেচ্ছা বের করে ফেলেছিলেন। জানি না সেসব সত্যি, নাকি তাঁর মনগড়া। তবে এটা বুঝেছি যে, লোকটা বেশ উঁচুদরের খেলুড়ে, একেবারে ‘ওস্তাদ’! যতবার তিনি কারও কেচ্ছার খবর ফাঁস করেছেন, ততবারই তাঁর মাথা একটু একটু করে উঁচু হয়েছে।
এমনি করে দেখতে দেখতে কিছুদিনের মধ্যেই ডেপুটিসাহেবের হেঁট মাথা পুরো স্ট্রেট হয়ে গেল। চালচলনে ভারিক্কি ভাব এলো। অনেকের সঙ্গে অল্পবিস্তর আলাপও শুরু হল।
এরই মধ্যে একদিন আমি বললাম, এক একা আর কত কষ্ট করবেন, এবার স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসুন…
ডেপুটিসাহেব বললেন, আরে মশাই, আনতেই তো চাই। কিন্তু, এখানে তো আর হুট করে আনা যায় না। ভদ্রলোকের পাড়ায় একটা ভদ্রলোকের বাসা না-পাওয়া অব্দি কেমন করে আনি বলুন তো!
[লেখক পরিচিতিঃ হরিশঙ্কর পরসাই আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখক। ব্যঙ্গসাহিত্যে তাঁর বিশেষ খ্যাতি। মধ্যপ্রদেশে ২২ আগস্ট ১৯২৪ সালে তাঁর জন্ম, মৃত্যু ১০ আগস্ট ১৯৯৫ সালে।]
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news