মূল হিন্দি রচনা : শরদ জোশী
অনুবাদ : পার্থসারথি পাণ্ডা
আমার তো মনে হয়, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার ব্রিগেড, স্কুলবাসের মতো কিছু জরুরি পরিষেবা ছাড়া আর যেসব সরকারী যানবাহন আছে, সব ঝেড়েঝুড়ে বেচে দেওয়া উচিত। জরুরি মনে হলে থানা আর বনদপ্তরকেও না হয় কয়েকটা করে জিপ দেওয়া যেতে পারে। ঠাঁটবাট বজায় রাখতে রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালের জন্য একটা করে গাড়ি বরাদ্দ করা যেতে পারে এবং প্রধানমন্ত্রীর জন্যও একটা গাড়ি ধরা যেতে পারে। বাদ বাকি সব গাড়ি সরকারি ঘাড় থেকে নামিয়ে দেশটাকে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেওয়া উচিত। কারণ, এগুলো একেবারেই ফালতু খরচ।
মন্ত্রী বা সরকারি অফিসারের গাড়ি কেন চাই? তাঁরা রোজ কোয়ার্টার থেকে অফিস আর অফিস থেকে কোয়ার্টার যাবেন সেজন্যই তো? কিন্তু এর বাইরেও তাঁদের ব্যক্তিগত আমোদ ও শখ-আহ্লাদ মেটাতে সরকারি গাড়ির যে বেহিসেবি ব্যবহার হয়, তার খরচ করদাতাদের ঘাড় ভেঙে কেন নেওয়া হবে! এ তো ঠিক কথা নয়। অফিসার যদি গাড়ি ছাড়া চলতে না পারেন, তাহলে নিজেই একখানা গাড়ি কিনে নিন না; সরকার তাঁকে কিস্তিতে কেনার সুযোগ করে দেবেন আর মাইনে থেকে মাসে মাসে কিস্তির টাকা কেটে নেবেন। যিনি গাড়ি কিনতে চাইবেন না, তিনি বাসে যাতায়াত করবেন। আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না, সরকারি বড় অফিসারের অফিসে যাওয়ার বোঝা সরকার বইবে কেন? সবাই যখন গাঁটের টাকা খরচ করে অফিসে যায়, এই অফিসারেরাই বা যাবেন না কেন? এঁদের এতো অভাব! এঁরা কি তাঁদের যোগ্যতামাফিক মাইনে পান না?
এটা মনে হতেই পারে যে, অফিসে আসার পর সরকারি বড় অফিসারটিকে হয়তো সরকারি কাজেই কোথাও বেরুতে হবে, তখন তিনি কি করবেন? গাঁটেরকড়ি খসাবেন? নিজের গাড়ির পেট্রোল পোড়াবেন? সরকারি কাজে তিনি সেটা করতে যাবেনই বা কেন? তাহলে সরকারী গাড়ি তো লাগবেই। তাই না?
এটা একটা সমস্যা, তবে এর সমাধানও আছে। গাড়ি চাই? সোজা ব্যাপার– ফোন করুন আর ট্যাক্সি ডেকে নিন। নিজের গাড়িতে গেলে কিলোমিটারের হিসেবে অফিসে বিল জমা দিন আর টাকা নিয়ে নিন। যে অফিসারটিকে রোজই সরকারি কাজে এখানে-ওখানে আসতে-যেতে হয়, তাঁকে অ্যালাউন্স দিয়ে দিন। অফিসার সে বড়ই হোন বা ছোট; সরকারকে দেখতে হবে যে, তিনি ভুয়ো বিল দিয়ে টাকা ঝাড়ছেন না তো! যদি তেমনটা করে থাকেন, তাহলে চোরের যা শাস্তি হয়, তাঁদেরও তাই হওয়া উচিত!
বছরের পর বছর বড় বড় গাড়ি কেনার খরচ, তাদের মেন্টেনেন্সের খরচ, ড্রাইভার, গ্যারেজ, ড্রাইভারের পেরোল-পেনশন, কাজে-অকাজে পেট্রোলের খরচ– এই যে বিপুল ব্যয়ের অনাবশ্যক ভার সরকার কেন বইবে! প্রাইভেট-ট্যাক্সি তো রয়েইছে। অ্যাপ ট্যাক্সি আছে। তাছাড়া এমন কোম্পানিও রয়েছে, ফোন করলেই যারা গাড়ি পাঠিয়ে দেয়। তাদের যদি বলেন, ভাই, এয়ারপোর্টে গিয়ে এক বিদেশি নেতাকে আচ্ছাসে রিসিভ করে আনতে হবে, জুতসই ঝাণ্ডা লাগিয়ে তিনটে গাড়ি পাঠিয়ে দাও তো! বলতে না বলতেই গাড়ি হাজির হবে সটান, যেমনটি চাই তেমনটি। এর মধ্যে একটা গাড়ি সবসময় অতিথির সঙ্গে রেখে দিন, রিসিভপর্ব শেষ হলে অন্য দুটো গাড়িকে ছেড়ে দিন। এরকম পরিস্থিতিতে এটুকু খরচ করাই যেতে পারে। কিন্তু, অতিথি সৎকারের জন্য এয়ারকন্ডিশনড গাড়িটি যদি সরকারি হয়, তাহলে, বছরে চার বার না-হয় বিদেশি অতিথি তাতে চড়ে ধন্য হন বা সরকারকে ধন্য করেন। কিন্তু, অন্য সময়? মন্ত্রী বা অফিসারের ছানা তাতে চড়ে রোজ স্কুলে যায় আর মেমসাহেব হপ্তায় তিন দিন শপিং করতে যান। এই বাজে খরচটা দেশ বইবে কেন, কিসের জন্য বলুন তো?
এবার বলি সেই মন্ত্রীদের কথা, যাঁরা শুধুমাত্র কোয়ার্টার আর গাড়ি বাগাবার লোভেই মন্ত্রী হন! আমার তো মনে হয়, এঁদের গাড়ি দেওয়াই উচিত নয়। প্রতি মাসে এঁদের হাতে ট্যাক্সির কুপন ধরিয়ে দেওয়া উচিত। তাও লিমিটেড। ক্ষমাঘেন্না করে বলা উচিত, নিন গো দাদা, নিয়ে কেতাত্থ করুন! এটা নিয়ে সারামাস নেতাগিরি করুন, আন্ডাবাচ্চা বা চামচা নিয়ে যেখানে ইচ্ছে ঘুরে বেড়ান, যা ইচ্ছে হয় করুন, আপনার মতো অপগণ্ডদের পেছনে এর বেশি খরচ সরকার করবে না!
যে-দেশে অসংখ্য মানুষ দারিদ্র্যরেখার নীচে, যে-দেশে ভণ্ড ব্যবসায়ী ঋণের নামে ব্যাঙ্ক লুটেও পার পেয়ে যায়, যে-দেশে ভোটের আগে প্রতিনিয়ত চাকরির জন্ম হয়, ভোট পেরোলেই যে-দেশে সব ভোঁ ভা ম্যাজিক, যে-দেশে সরকারি শিক্ষক ও কেরাণীর ডিএ আটকে থাকে আর মন্ত্রী-আমলার বেতন বাড়ে নিয়ম করে, যে-দেশ বিশ্বে এবং বাস্তবেই গরীবের দেশ, সে-দেশের দশের টাকায় নেতা-মন্ত্রী-আমলা-অফিসারের এত আড়ম্বর কীসের?
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news