।
তরুণ সেন
বাংলা সঙ্গীত জগতের একটি জনপ্রিয় নাম প্রতীক চৌধুরী। মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে হঠাত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি গতকাল ১৯ ফ্রেব্রুয়ারি প্রয়াত হয়েছেন।
প্রতীক গান শিখতে শুরু করেছিলেন একেবারে ছোট্ট বয়স থেকেই। মা পূর্ণিমা চৌধুরী ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞা। তাই ছোট্ট প্রতীককে তালিম দিতে শুরু করেন তিনি নিজেই। এদিক থেকে মা-ই তাঁর প্রথম সঙ্গীতগুরু। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এসেছিল মায়ের কাছ থেকে, যে ভালোবাসা তাঁর ছিল আজীবনের সঙ্গী। তবে, শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীত নয়, মা তাঁর সাথে পরিচয় ঘটিয়েছিলেন ছিলেন সঙ্গীতশাস্ত্রের প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য অন্যান্য ধারাগুলির সঙ্গেও। এটাই তাঁকে পরবর্তীকালে ভারসাটাইল আর্টিস্ট হয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল।
মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি গুরু হিসেবে পেয়েছিলেন শ্রীযুক্ত শীতল মুখার্জিকে। তাঁর কাছ থেকে তালিম নিতে নিতে গজলের প্রতি প্রতীকের অন্য এক ভালোবাসা তৈরি হয়। এই গানই হয়ে ওঠে তাঁর আত্মার গান। শ্রোতার মনে মায়াজাল বিস্তার করতে সমর্থ হয় তাঁর ব্যারিটোন ভয়েস ও নিজস্ব গায়কী। গজল গানের সূত্রেই তিনি নয়ের দশকের শুরুতে দূরদর্শন ও মঞ্চে তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন পূর্ব ভারতের প্রতিনিধিস্থানীয় গজল গায়ক হিসেবে। প্রখ্যাত গজলশিল্পী গুলাম আলি, জগজিৎ সিং এবং পঙ্কজ উধাসের সঙ্গে একই মঞ্চে একসঙ্গে বিভিন্ন সময়ে গান গেয়েছেন এবং তাঁদের প্রসংসাধন্য হয়েছেন, স্নেহধন্য হয়েছেন।
এই সময় তাঁর যোগাযোগ হয় সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্রের সঙ্গে। তিনি তখন টিভির বিভিন্ন অ্যাড ফিল্মের জিঙ্গল তৈরির জন্য নাম করতে শুরু করেছেন। প্রতীকের মধ্যে তিনি এ-জগতে সম্ভাবনা দেখেছিলেন। ভয়েস ট্রেনিং, টেকনিক্যাল ট্রেনিং-এর মধ্য দিয়ে তিনি এই ধরণের গানের জন্য তৈরি করে নিলেন প্রতীককে। তারপর একে একে কুকমি, অজন্তা হাওয়াই, খাদিম’স, বোরো ক্যালেন্ডুলা, বাবুল প্রভৃতি প্রোডাক্টের অ্যাড ফিল্মে জিঙ্গল গেয়েছেন তিনি এবং বিজ্ঞাপণ জগতের কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বেশ নাম করলেন।
বাংলা সঙ্গীত জগতে প্লে-ব্যাক সিঙ্গার তিনি প্রথম আত্মপ্রকাশ ১৯৯৪ সালে। এই পেশাদার জগতে প্রবেশ করতে গিয়ে সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্র ও পরিচালক স্বপন সাহা তাঁকে প্রভূত সাহায্য করেন। এই সাহায্যের কথা প্রতীক সবসময় মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করতেন। বাংলা ছবিতে স্বপন সাহা ছাড়াও প্রভাত রায়, অনুপ সেনগুপ্ত, অঞ্জন চৌধুরী, হরনাথ চক্রবর্তী, মিলন ভৌমিক, সুব্রত সেন প্রমুখ পরিচালকদের ছবিতে প্লে-ব্যাক সিঙ্গার হিসেবে তিনি গান গেয়েছেন। প্লে-ব্যাক সিঙ্গার হিসেবে প্রতীকের ছবির তালিকায় রয়েছে ‘পাতালঘর’, ‘সখী তুমি কার’, ‘মায়ার বাঁধন’, ‘তুমি এলে তাই’, ‘বাঙালি বাবু’, ‘জীবন যোদ্ধা’, ‘মায়ের সিঁদুর’, ‘গুণ্ডা’, ‘বিদ্রোহ’, ‘এক যে আছে কন্যা’ প্রভৃতি। তবে, এসবের মধ্যে তাঁর ‘এক যে আছে কন্যা’ ছবির টাইটল ট্র্যাক তাঁকে সঙ্গীত রসিকদের কাছে প্রভূত জনপ্রিয় করে তোলে।
আধুনিক গানের বেশকিছু জনপ্রিয় অ্যালবাম রয়েছে প্রতীকের, যার মধ্যে অন্যতম- ‘ভীমরতি’, ‘মন বাওরা’, ‘মুখোশ’, ‘স্বপ্ন বিক্রি আছে’ প্রভৃতি। এসব অ্যালবামের গানে তাঁর গুণমুগ্ধশ্রোতা পেয়েছেন কথায়-সুরে ও সঙ্গীতায়োজনে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিশ্রণে এক অনন্য শ্রুতির স্বাদ। তাঁরা স্বীকার করেন যে, প্রতীকের গান একটু অন্যরকমের। এই ‘অন্যরকম’ হয়ে ওঠাতেই তো একজন শিল্পীর সিদ্ধি। প্রতীক সেই ‘সিদ্ধি’ অর্জন করেছিলেন।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news