নিজস্ব সংবাদদাতা
টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় মেগা সিরিয়ালের বর্তমান প্রযোজকের সংখ্যা নিতান্তই হাতে গোনা। পাঁচ থেকে ছ’জন। এঁদেরই একাধিক সিরিয়াল চলছে স্টার, জি, কালারস বাংলা’র মতো চ্যানেলগুলোতে। প্রতিটি প্রযোজনা সংস্থার হাতে রয়েছেন একজন কি দুজন করে সিরিয়ালের গল্প ও সংলাপ লেখক। ফলে, একটি প্রযোজক সংস্থার একাধিক সিরিয়ালের প্রতিদিনের গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লেখার চাপ থাকে তাঁদের ওপরেই। এদিকে প্রতিদিনের গল্প চ্যানেল থেকে পাশ হয়ে এলে তবেই তার চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখে পাঠানো হয় ফ্লোরে এবং তার ওপর নির্ভর করেই শ্যুটিং শুরু হয়। এখন গল্প পাশ হতে দেরি হলে, সংলাপ লিখতে দেরি হয়, সংলাপ লিখতে দেরি হলে শ্যুটিং-এ দেরি হয়। একজন লেখকের ওপর অনেকগুলো সিরিয়ালের দায়িত্ব থাকলে এই দেরিটা আরও প্রলম্বিত হয়।
সমস্যাটা হল, ফ্লোরের মানুষ জানতে পারেন না, গল্পটা পাশ হয়ে আসবে কখন, পাশ হয়ে এলেও ফ্লোরে সংলাপ লেখা স্ক্রিপ্ট পৌঁছবে কখন। এদিকে সকাল সাতটা আটটা থেকেই কিন্তু আর্টিস্টদের ডেকে মেকআপ করিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। মাঝে মাঝেই দেখা যায়, সারাদিন বসিয়ে রেখেও গল্প বা স্ক্রিপ্ট কিছুই আসে না, আসবার সম্ভাবনাও থাকে না। তখন দিনের শেষে প্যাকআপ করে দেওয়া হয়। এই দিনটার মাইনে অবশ্য আর্টিস্টদের দেওয়া হয়। আবার কোন কোন দিন হয়তো দিনের শেষে সন্ধ্যে বেলায় স্ক্রিপ্ট এলো, তখন শুরু হল শ্যুটিং। চলল রাতভর। সারাদিন বসে থাকার পর রাতের একটা সময় পর্যন্ত হয়তো সিনিয়ার আর্টিস্ট টেলিকাস্টের কথা ভেবে শ্যুটিং করলেন, কিন্তু নতুন আর্টিস্টদের মুখ খোলা বারন। তাঁদের সেই ভোর অব্দি শ্যুটিং করে আবার সকালের শ্যুটিং এর জন্য থেকে যেতে হয় অনেকসময়ই। এতসবের পরেও মাইনে কিন্তু দিনের পর দিন পড়ে থাকে, পেমেন্ট ডিলে করা হয়। প্রযোজকের ব্যাঙ্কে সুদ বাড়ে। ফ্লোরে জিগির তোলা হয় চ্যানেল পেমেন্ট দেয়নি, তাই পে করা যাচ্ছে না। এসব কথা উড়ো খই এর মতো হাওয়ায় ভাসতে থাকে, সবাই সাসপেন্সে থাকে; কিন্তু কারো কাছে খোলসা করে বলা হয় না যে, কবে মাইনের টাকাটা পাওয়া যাবে। মাইনের ব্যাপারে তাড়া দিতে গেলে, কখনও গল্প থেকে সুন্দরভাবে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়, কখনও বা বেশ কিছুদিনের জন্য গল্পের চরিত্রটিকে কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া হয় হঠাত; কাকুতিমিনতি করলে আবার ফিরিয়ে আনা হয়। এই হচ্ছে অবস্থা।
মিডিয়ায় খবর হয় না, কিন্তু মাঝে মাঝেই জুনিয়ার টেকনিশিয়ানদের সাময়িক কর্মবিরতি চলে নানান ফ্লোরে। চেক না পেলে কাজ হবে না। ঘন্টা চার পাঁচের স্ট্রাইক চলে। পুরো ইউনিট বসে যায়। তখন বকেয়া চেকের পুরোটা না হলেও খানিকটা ঠিক এসে হাজির হয়। চরম অব্যবস্থার মাঝে আর্টিস্ট ছাড়াও ভোগান্তির শিকার হন পরিচালক ও সহকারী পরিচালকেরা। তাঁদের অবস্থা আরও খারাপ। তাঁদের চাকরি বাঁধা মাইনের। অতিরিক্ত খাটুনিতে অতিরিক্ত মাইনে বা ওভার টাইম কিচ্ছু নেই। সে শ্যুটিং দিন-রাত টানা যতক্ষণই চলুক না কেন। মনে অসন্তোষ থাকলেও কিছু বলতে গেলে কাজ চলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রতিটি মুহূর্তেই। ছুতোনাতায় ঠিক বাদ দিয়ে দেওয়া যায় এঁদের। কন্ট্রাক্ট পেপারে সই করিয়ে এঁদের কাজ হয় না, জয়েনিং লেটার থাকে না, ফলে ‘কাল থেকে আসতে হবে না’ বললেই কাজ শেষ। তাই ‘দু’নয়নে ভয় আছে, মনে সংশয় আছে’! আর্টিস্টদের এই ধর্মঘট তাঁরাও সমর্থন করছেন ভেতর থেকে, ‘চুপ’ সমর্থনে উগরে দিচ্ছেন অসন্তোষ।
সবার অসন্তোষ মাথায় রেখে মাস তিন আগে ফেডারেশনের তরফ থেকে শ্যুটিং ও পেমেন্টের এই অব্যবস্থা দূর করতে নিয়ম করা হয়েছিল যে, চব্বিশ ঘন্টায় চোদ্দ ঘন্টার বেশি কাজ হবে না। রাত দশটার পর আর শ্যুটিং করা যাবে না। মাইনের টাকা সময় মতো দিতে হবে। এইসব প্রস্তাবে প্রযোজকেরা সম্মত হয়ে সইসাবুদও করেছিলেন। এর পর আর একটি প্রস্তাবে আর্টিস্টরা সুষ্ঠু কর্মসংস্কৃতি ফেরানোর জন্য সারা দিনে দশ ঘন্টার বেশি কাজ করবেন না বলেন। তাঁদের বক্তব্য, যেকোন শ্রম নির্ভর ইন্ডাস্ট্রিতেই কাজের একটা সুষ্ঠু সময়সীমা থাকে, থাকা উচিত, এখানেই বা সেটা কেন থাকবে না! প্রথমে তাঁদের এই প্রস্তাবও প্রযোজকেরা মেনে নেন, কিন্তু পরে বেঁকে বসেন। তারই ফল এই চারদিনের ধর্মঘট। তাঁরা জানান, দাবি আদায় না-হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে। নজরুল মঞ্চের মিটিং-এ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, দীপঙ্কর দে’র মতো বর্ষীয়ান অভিনেতাদের উপস্থিতিতে তাঁরা এই শপথ নিয়েছেন, সেখান থেকে সহজে তাঁরা পিছু হটবেন না। এই লড়াইয়ে তাঁদের জয় হলে, সেটা নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে কর্মসংস্কৃতির জয় হবে বলেই মনে করছেন তাঁরা। আন্দোলনের চার দিনের মাথায় টনক নড়েছে মুখ্যমন্ত্রীর। বৃহস্পতিবার নবান্নে আলোচনার জন্য দু’পক্ষকেই ডেকেছেন, এখন দেখা যাক, হার, জিত, নাকি সমঝোতা—কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news