পার্থসারথি পাণ্ডা:
প্রতিমায়, ঘটে এবং সিজুয়া অর্থাৎ মনসা গাছের ডাল দিয়ে — নানান ভাবে দেবী মনসার পুজো হয়। সিজুয়া গাছের ডাল দিয়ে মনসার পুজো হয় কেন? তার পেছনেও একটা গল্প আছে।
শিব মেয়ে মনসাকে জন্ম দিয়ে ভুলেই গেছিলেন। তিনি তো ভোলানাথ, তাই। একদিন হঠাতই পদ্মবনে যুবতী মনসার সঙ্গে তাঁর আলাপ। এতদিন বঞ্চনার গ্লানি থেকে মেয়েকে বাড়িতে আনলেন। কিন্তু পত্নী চণ্ডী কিছুতেই সৎ মেয়েকে ঘরে ঢুকতে দিলেন না। রাগের বশে কানা করে দিলেন মনসাকে। শিবকে বাধ্য করলেন মনসাকে নির্বাসনে পাঠাতে। তখন শিব সংসারের শান্তি বজায় রাখতে মেয়েকে নির্জন সিজুয়া পর্বতে রেখে এলেন। সিজুয়া গাছ কাঁটা গাছ, তার নীচে সাপেদের আশ্রয়। সেই গাছ আর সাপ হল মনসার সঙ্গী। সিজুয়া গাছের নাম হল, মনসা গাছ। এখান থেকেই ধীরে ধীরে মনসা বা সিজুয়া গাছ হয়ে উঠল দেবী মনসার প্রতীক। আর একটা ব্যাপার রয়েছে, এই প্রতীকায়নের পিছনে অন্য এক ব্যঞ্জনা আছে। দেবী হিসেবে মনসার জীবনটা একেবারে ঠিক কাঁটার মতো, বাবার বঞ্চনা, বিমাতার গঞ্জনা ও চোখ কানা করে দেওয়ার মতো নিষ্ঠুরতা, বাবা বিয়ে দিলেন জরৎকারু মুনির সঙ্গে, মুনি তাকে ছেড়ে পালালেন। সংসারটা ভেসে গেল। যত বঞ্চনা একটা মানুষের জীবনে আসতে পারে, তার সবই ভোগ করতে হয়েছে মনসাকে। এই কাঁটার জীবন বয়েই কাঁটা গাছ হয়েছে তাঁর প্রতীক।
নাগপঞ্চমীর দিন বাংলার ঘরে ঘরে দেবী মনসার পুজো হয়। মূলত মনসার ডাল পুতে দুধকলার নৈবেদ্য দিয়ে উঠোনে এই পুজোর চল। এ পুজো মেয়েদের পুজো, এটা তাদের ব্রতধারার মধ্যেই পড়ে। তাই এর ব্রতকথাও আছে। সেখানে আছে এই ব্রতের শুরুর কাহিনি—
বেনের বাড়িতে চার ভায়ের চার বউ। আর আছে তাদের শাশুড়ি। শাশুড়ি ছোট বউকে দেখতে পারে না বলে, বাকি তিন বউও ছোট বউকে পাত্তা দেয় না। খুব বৃষ্টি হচ্ছে একদিন। বাতাসে শীত শীত ভাব। তাই রান্নাঘরে উনুনে হাত সেঁকছিল তিন জা আর গল্প করছিল। বড় জা বলল, ইস, আজ যদি খিচুড়ি আর বেগুন ভাজা হতো না, তাহলে খেয়ে খুব সুখ হত। মেজ জা আর সেজ জা বলল, এসময় যদি গরম গরম কলাই ভাজা পাওয়া যেত, তাহলে খুব ভালো হত। শুধু ছোট বউ বলল যে, আজ যদি গরম ভাত আর পুঁটিমাছের টক পাওয়া যেত তাহলে বেশ খাওয়া হত। তিন জা তার কথা শুনে ঠোঁট বাঁকাল, গরীবের মেয়ে তার আবার মাছভাতের সাধ, মরে যাই! ওদিকে কিন্তু ছোট বউ স্নান করতে গিয়ে পুকুরের ঘাটের কাছে কিলবিল করতে দেখল দুটো মাছের ছানা, তাদের তুলে নিয়ে এসে রাখল ঘরের ভেতর হাঁড়িতে। তিন বউ হিংসেয় মরে ভাবল, ইস আমাদের ইচ্ছেপূরণ হল না, আর ছোট বউ কিনা মাছভাত খাবে!
এদিকে ছোট বউ চান টান করে এসে মাছ কুটতে এসে দেখে, ওমা মাছ কোথায়, এ যে সাপের ছানা! সে যাই হোক, সাপের ছানাদের তাড়িয়ে না দিয়ে তাদের দুধ কলা খেতে দিয়ে মানুষ করতে লাগল। তাদের সঙ্গে ভাই পাতাল। একদিন সাপের ছানারা বড় হয়ে স্বর্গে মা মনসার কাছে চলে গেল। সেখানে গিয়ে তারা মাকে বলল যে, মর্ত্যে যে দিদি তাদের মানুষ করেছে সেই দিদির বড় দুঃখ, বড় অভাব। শাশুড়ি উঠতে বসতে তাকে খোঁটা দেয়, জায়েরা গায়ের ঝাল মেটায়। এখানে তাকে এনে কিছুদিন রাখতে চায় তারা। মা মনসা এ প্রস্তাবে মত দিলেন। নাগভাইরা ছোট বউকে স্বর্গে নিয়ে এলো। মা মনসাকে প্রণাম করল সে। মা বললেন, বাছা, তুমি এসেছ, এতে আমি খুশি হয়েছি, কিন্তু সাবধান কখনও দক্ষিণ দিকে যেন চেয়ে ফেলোনা, এতে তোমার অকল্যাণ হবে। ছোট বউ ঘাড় নেড়ে জানাল, বেশ।
দিন যায়। একদিন নাগভাইদের জন্য দুধ গরম করতে গিয়ে কীভাবে যেন তার চোখ চলে গেল দক্ষিণ দিকে, সে দেখল মা মনসা নিরাভরণ নিরাবরণ হয়ে নৃত্য করছেন। সেই অপরূপ নাচ দেখে সে চোখ ফেরাতে পারল না। তখন সে দুধ গরম করতে ভুলে গেল, নাগেরা এসে তাড়া দিতে তার চটক ভাঙে এমন তাড়াহুড়োয় দুধ এমন গরম করল যে, নাগেদের জিভ পুড়ে গেল। আর এতেই নাগেরা তার ওপর ক্ষেপে গেল, বলল, তারা ছোট বউকে কামড়ে দেবে। স্বর্গে কামড়ালে তার কিচ্ছু হবে না, তাই মর্ত্যে নিয়ে যেতে হবে তাকে। তারা মা মনসার কাছে গিয়ে সব কথা গিয়ে বলল। আর এও বলল যে, মা যেন ছোট বউকে মর্ত্যে পাঠিয়ে দেন।
ছোট বউয়ের ভারি বিপদ। মায়ের ততদিনে মায়া পড়ে গিয়েছিল তার ওপর। তবু নাগেদের কথায় গা ভর্তি গয়না পরিয়ে দিয়ে তাকে তিনি মর্ত্যে রেখে এলেন। পেছনে পেছনে লুকিয়ে নাগেরাও এলো তাকে দংশন করবে বলে। কিন্তু মায়ের কৃপায় ছোট বউ এমন কোন ভুল করল না যে, নাগেরা তাকে দংশন করে। দিনটা ছিল পঞ্চমী তিথি। মায়ের পরামর্শে ছোট বউ উঠোনে মনসার ডাল পুঁতে গোবর ছড়া দিয়ে দুধকলার নৈবেদ্য দিয়ে মা মনসার পুজো করল। তাই দেখে নাগেদের মনে আর কোন রাগ রইল না। নাগদের থেকে আর কোন বিপদের আশঙ্কাও রইল না। এভাবেই মর্ত্যে প্রচার হয়েছিল শ্রাবণের পঞ্চমী তিথিতে মনসা পূজার। দেশের নানান অঞ্চলে এই পঞ্চমী নাগপঞ্চমী নামেও পরিচিত।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news