পার্থসারথি পাণ্ডা
তারিণীবাবু আমাদের স্যার ছিলেন। ক্লাসে একটা গল্প তিনি প্রায়ই বলতেন। যদিও গল্পটা আমরা প্রায় সবাই জানি। তবু বলি। সেই গল্পে, একদিন নদীতে স্নান করতে গিয়ে ছোট্ট নানক দেখলেন যে, কয়েকজন মন্ত্র পড়তে পড়তে আঁজলা ভরে জল নিয়ে অঞ্জলি দিচ্ছে জলে। তাই দেখে নানক তাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এসব কী করছ গো? তারা বলল, আমরা আমাদের স্বর্গত তিন পুরুষকে জল পান করাচ্ছি। তখন নানক তাদের পাশে বসে তাদের মতো করে মন্ত্র বলে জল অঞ্জলি দিতে লাগলেন। একজন জিজ্ঞেস করল, এই তুই আবার কাকে জল দিচ্ছিস? নানক বললেন, আমার ক্ষেতের গাছে।
লোকটা বলল, দূর বোকা এভাবে কি ক্ষেতে জল দেওয়া যায় নাকি?
নানক বললেন, অত দূরের স্বর্গে তোমার মরে যাওয়া তিন পুরুষকে যদি এভাবে জল দিতে পার, তাহলে এই নদীর কাছে ক্ষেতের জ্যান্ত গাছে জল দেওয়া যাবে না কেন?
এই যুক্তিতে তর্পণকারীদের এক্কেবারে ভেবলে দিয়েছিলেন নানক। এই গল্পটা বলে বেশ মজা পেতেন তারিণীবাবু। আমরা মজা পেয়েছিলাম মহালয়ার দিন, তারিণীবাবুকে সকাল সকাল যুক্তকচ্ছ হয়ে কোশাকুশি নিয়ে নদীতে গিয়ে তর্পণ করতে দেখে।
এ কীরকম হল স্যার?
স্যার তাঁর স্বভাবসিদ্ধ হাসিটি ঠোঁটের কোনায় রেখে বললেন, এই রকমই হয় রে, কোথাও কিছু নেই, আবার অনেক কিছুই আছে জানিস। এ হচ্ছে দেখার ব্যাপার, তোর অন্তর যা দেখবে, চোখে তুই তাই দেখবি। আচার আমাদের মজ্জায় মিশে রে বাপ, সেও তো অন্তরে বসে, সেও অনেক কিছু বিশ্বাস করায়, অনেক কিছু দেখায়। যুক্তি সেখানে খাটে না। খাটাতে মাঝে মাঝে ইচ্ছেও করে না জানিস। আর তর্পণের কথা বলছিস? বাবা-মা খুব চাইত মহালয়ায় ছেলে জল দেবে মুখে। তাঁদের সেই সামান্য ইচ্ছেটুকু পূর্ণ করা কি ছেলে হিসেবে আমার কর্তব্য নয়, বল?
এই শেষ কথার পর আর কথা চলে না। আমাদের অন্তর খুলে দিয়ে স্যার চলে যান, সেখানে আর দর্শনের বিরোধীতা থাকে না। দর্শন আর কর্তব্য মিলেমিশে সব এক হয়ে যায়।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news