পার্থসারথি পাণ্ডা:
বোধিসত্ত্ব বুদ্ধদেব শিষ্যদের উপদেশ দিতেন গল্পচ্ছলে। বলতেন তাঁর বুদ্ধ হয়ে জন্ম নেওয়ার আগেকার সব জন্মজন্মান্তরের কাহিনী। সেই যে-বার তিনি বারানসীর এক বিখ্যাত বণিক বোধিসত্ত্ব হয়ে জন্মেছিলেন, অসাধারণ জ্ঞান ও বুদ্ধির জন্য তাঁর তখন খুব নামডাক হয়েছিল, তো, সেই জন্মের একটি অভিজ্ঞতার কথা বুদ্ধদেব একদিন তাঁর শিষ্যদের কাছে বলেছিলেন…
গল্পে বণিক বোধিসত্ত্ব একদিন রাজপথ দিয়ে রথে চেপে যাচ্ছিলেন রাজবাড়ি। হঠাত পথের পাশে দেখতে পেলেন পড়ে আছে একটা মরা ইঁদুর। তাই দেখে তিনি আপন মনে বললেন, কারও যদি বুদ্ধি থাকে, বুদ্ধিকে কাজে লাগানোর উদ্যম থাকে, তাহলে এই মরা ইঁদুরটা দিয়েই সে জীবনে কিছু করে উঠতে পারবে।
বোধিসত্ত্বের রথের পাশ দিয়ে তখন যাচ্ছিল শহরের এক যুবক। সে শুনতে পেল বোধিসত্ত্বর স্বগত কথা। শুনে ভাবল, বোধিসত্ত্ব তো আলটপকা কথা বলার লোক নন, ইনি যখন বলছেন তখন নিশ্চয়ই এই ইঁদুরটা দিয়ে সত্যিই জীবনে কিছু একটা করে ওঠা যাবে। তাছাড়া বুদ্ধি আর উদ্যম তো তার আছেই। একবার চেষ্টা করে দেখাই যাক না কি হয়।
এসব ভেবেটেবে সে ইঁদুরটা পথের পাশ থেকে হাতে নিল তুলে। তারপর হাঁটতে শুরু করল শহরের এক গলি পথ দিয়ে। এদিকে হয়েছে কি, সেই গলিতেই এক মহাজন তার পুষ্যি বেড়ালের জন্য বেরিয়েছে খাবার খুঁজতে। তাই যুবকের হাতে বেড়ালের প্রিয়খাবার ইঁদুরটা দেখে মহাজনের খুশি আর ধরে না, সে অমনি কটা পয়সা দিয়ে ইঁদুরটা কিনে নিল যুবকের কাছ থেকে। পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো পয়সা কটা পেয়ে যুবকও খুব খুশি হল। ভাবল, বাঃ বেশ হল তো! মরা ইঁদুর দিয়ে এই যে পয়সা কটা রোজগার হল, দেখা যাক তো, তাই দিয়ে কিছু করা যায় কি না!
এই না ভেবে, সেই পয়সা ক’টা দিয়ে সে কিছু গুড় আর ছাতু কিনে ফুলবনের পথের ধারে গিয়ে বসল। অবেলায় সেই পথে ফুল তুলে ঘরে ফিরতে লাগল মালিদের দল। সারাটিদিন তারা বনে বনে ঘুরে খিদেয় তেষ্টায় খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তাই সেই যুবক যখন তাদের ছাতু, গুড় আর জল খেতে দিল, তখন মালিরা খুব খুশি হল। খুশি হয়ে তারা কিছু কিছু ফুল উপহার দিল যুবককে। সেই ফুল বেচে যুবকের গুড় ছাতুর কখরচের চেয়ে লাভ হল প্রায় দ্বিগুণ।

সেইসঙ্গে যুবকের কপালগুণেই বোধ হয় সেদিন বিকেলে আকাশ কালো করে খুব ঝড় উঠল। সেই ঝড়ে রাজার বাগানের বড় বড় গাছের ডাল গেল ভেঙে। কাজেই বাগানের মালির মাথায় পড়ল হাত। এত ডালপালা সে সরাবে কেমন করে! তখনই কোথা থেকে খবর পেয়ে যুবকটি হাজির হল গিয়ে সেই মালির কাছে। মালিকে বলল, মালিভাই, তোমার কোন চিন্তা নেই, ভাঙা ডালপালাগুলো যদি বিনিপয়সায় আমায় দিয়ে দাও, তাহলে বাগান পরিষ্কারের ভার আমার।
তাই শুনে মালি যেন হাতে চাঁদ পেল। সে তক্ষুনি বেজায় খুশি হয়ে রাজি হয়ে গেল। তখন যুবকটি করল কি, কয়েক পয়সার গুড় কিনে গেল পাড়ার ছেলেদের কাছে। গুড় খাইয়ে বাগান পরিষ্কারের কথা বলতেই অমনি তারা এক পায়ে খাড়া। নিমেষের মধ্যেই নাচতে নাচতে তারা ভাঙা ডালপালা সব জড়ো করে ফেলল এক জায়গায়। অন্যদিকে এক কুমোর তখন পড়েছে বিপদে। সে তো পোয়ানে হাঁড়ি পোড়াবে বলে পোয়ান সাজিয়ে তৈরি, কিন্তু ঘরে তার একটাও ডালপালা নেই। এবার কি করবে সে ভেবে পায় না কিছুতেই। এমন সময় সে একজন লোকের কাছে খবর পেল যে, রাজার বাগানে প্রচুর ডালপালা এক যুবক জমা করে রেখেছে বেচবে বলে। তক্ষুনি এসে সে সব ডালপালা নগদ পয়সায় কিনে নিয়ে গেল। এতে বেশ কিছু পয়সা এসে গেল যুবকের হাতে।
সেই পয়সা দিয়ে সে কিছু গুড় আর ছোলা কিনে এক মাঠের ধারে এসে একদিন বসল। কারণ, সেই মাঠে পাঁচশো ঘেসেড়া ঘাস কাটতে আসে প্রতিদিন। ঘাস কেটে আঁটি বেঁধে বাজারে বিক্রি করে তারা। সেদিন ঘাস কেটে রোদে তেতেপুড়ে ঘেসেড়ারা যখন খুবই ক্লান্ত হয়ে গেল তখন যুবক তাদের কাছে গিয়ে গুড়জল আর ছোলা খেতে দিল। ঘেসেড়েরা বেজায় খুশি হয়ে তাকে এক এক আঁটি করে ঘাস দিতে চাইল। তখন যুবকটি বলল যে, যেদিন তার দরকার হবে সে ঠিক চেয়ে নেবে।
এমনি করে কয়েকদিন কেটে যায়। তারই মধ্যে একদিন যুবক শুনল যে, শহরে এক বণিক নাকি পাঁচশো ঘোড়া নিয়ে সওদা করতে আসছে। খবরটা শুনেই সে গুড় ছোলা নিয়ে মাঠে গেল। সেদিন সে ঘেসেড়াদের বলল, ভাই, আজ তোমরা আমায় এক এক আঁটি করে ঘাস দিও, আর একটা কথা আমি বললে তবেই তোমরা ঘাস বেচো আজ, তার আগে নয়।
ঘেসেড়ারা বলল, বেশ তাই হবে।
তারপরেই গুড় ছোলা খেয়ে সবাই এক এক আঁটি করে ঘাস দিল সেই যুবককে।
যুবকের কথা মতো ঘেসেড়ারা সেদিন ঘাস বেচতে বেরল না। তাই বণিকেরা কোথাও ঘোড়ার জন্য ঘাস পেল না। শেষমেশ অনেক খুঁজে যুবকের কাছে গিয়ে পাঁচশো ঘোড়ার জন্য পেল মাত্র পাঁচশো আঁটি ঘাস। তাই সেগুলো তারা বেশ চড়া দাম দিয়েই যুবকের কাছ থেকে কিনে নিল। ঘাস বেচে যুবকের হাতে এতে এসে গেল একসঙ্গে অনেকগুলো টাকা।
আর একদিন সে শুনল যে, জাহাজঘাটায় এসেছে এমন একটি জাহাজ, যাতে নাকি রয়েছে অনেক মূল্যবান সব সম্পদ। সেই শুনে অমনি সে জমানো সব টাকাকড়ি নিয়ে হাজির হল এক্কেবারে জাহাজ ঘাটায়। সেখানে পৌঁছেই সটান সেই জাহাজের সমস্ত মাল সে বায়না করে দিল। তারপর বন্দরেই চাকরবাকর নিয়ে শিবির বানিয়ে বড় এক বেনের মতো সাজগোজ করে সময়ের অপেক্ষা করতে লাগলো।
এদিকে দেশে তো সেই খবর শুনে মহা শোরগোল পড়ে গেল। এমন বেনে কে আছে, যে একাই জাহাজসুদ্ধ মাল কিনে নেয়! তখন তাকে দেখতেই ভিড় করতে লাগল কত কত লোক। তার জন্য ব্যবসা লাটে ওঠার ভয়ে, দেখা করতে এলো শয়ে শয়ে শহরের সব বেনে। তারা জানালো যে, যুবক যদি জাহাজের মাল তাদের মধ্যে ভাগ করে বিক্রি করতে দেয়, তাহলে ব্যবসার কিছু কিছু মুণাফা তারা যুবককে দেবে। যুবক একটু ভাবনাচিন্তার ভান করে শেষমেশ বেনেদের কথায় রাজি হয়ে যায়। এইভাবেই কোথাও কিছু না করে স্রেফ বুদ্ধির জোরে তাদের মুণাফার ভাগ পেয়ে যুবক একেবারে হয়ে গেল দুলাখ টাকার মালিক। এমনি করে সে অল্পদিনেই হয়ে উঠল শহরের সবচেয়ে বড়লোকদের একজন।
তখন সে একদিন দেখা করতে গেল মহান বণিক বোধিসত্ত্বের কাছে। গিয়ে প্রণাম করে সমস্ত বৃত্তান্ত সে জানাল তাঁকে। তার উদ্যম ও বুদ্ধির পরিচয় পেয়ে বোধিসত্ত্ব এতটাই খুশি হলেন যে ধুমধাম করে নিজের মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে দিলেন।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news