পার্থসারথি পাণ্ডা
দক্ষিণাত্যের গোকর্ণপুরে একটি মন্দিরে গোকর্ণেশ নামে শিবের এক লিঙ্গমূর্তি ছিল। সেই লিঙ্গদর্শনেই নাকি মানুষের সব পাপ ধুয়ে যায়। দেবলোকে কানাঘুষো হতে হতে সেই সংবাদটিই একদিন দেবকুলের ঋষি নারদের কানে উঠল। অমনি তাঁর ভারি কৌতূহল হল মহাদেবের সেই লিঙ্গরূপ দর্শনের। তিনি ঢেঁকি ছেড়ে এক ব্রাহ্মণের বেশ ধরে সাধের বীণাটি ঘাড়ে ঝুলিয়ে শিববন্দনা গাইতে গাইতে মন্দিরের সামনে হাজির হলেন। সামনে সরু পায়ে চলা পথ শেষ হয়েছে গিয়ে মন্দিরের সিঁড়িতে। পথের দুধারে কলকে, আকন্দর বন। আর আছে একটি ভারি সুন্দর চাঁপা ফুলের গাছ, তার গা ফুলে ফুলে ভরা। সেই ফুলের অপরূপ শোভা দেখে বিভোর হলেন নারদ। যখন তাঁর চটক ভাঙল তখন দেখতে পেলেন চাঁপা গাছের সামনে দাঁড়িয়ে এক ব্রাহ্মণ। হাতে তাঁর ফুলের সাজি। নারদ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওহে ব্রাহ্মণ, তুমি কি এই সুন্দর চাঁপা ফুলগুলি চয়ন করতে এসেছ?’
ব্রাহ্মণ সত্য সত্যই সেই চাঁপা ফুলগুলো সংগ্রহ করতে এসেছিল। কিন্তু কেন জানিনা, নারদকে সেকথা সে কিছুতেই বললো না। বরং বেমালুম মিথ্যে বলে বসল, ‘না না ঠাকুর, ফুল তুলতে কেন আসবো, আমি ভাটভিখারি মানুষ, যাচ্ছি ভিক্ষে করতে!’
তাই তো তাই। নারদ আর বাক্য না বাড়িয়ে এগিয়ে গেলেন শিবের মন্দিরের দিকে। শিবকে দর্শন ও প্রণাম করে তিনি যখন সেই পায়ে চলা পথটি ধরে ফিরছিলেন, তখন ব্রাহ্মণের সঙ্গে আবার দেখা। ব্রাহ্মণের হাতের সাজিটি তখন পাতা দিয়ে ঢাকা, তাতে কি আছে বাইরে থেকে কিছুই বোঝার উপায় নেই। তাই নারদ তাঁতকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওহে ব্রাহ্মণ, তোমার সাজিতে কি আছে?’ ব্রাহ্মণ একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, ‘সাজিতে?…ওই সামান্য ভিক্ষে আর কি।’ কথা বলতে বলতেই নারদকে ছাড়িয়ে সে এগিয়ে গেল। লোকটার ভাবগতিক তো ভালো ঠেকছে না, কিছু একটা যেন লুকোতে চাইছে! ব্যাপারটা কি?–এসব ভাবতে ভাবতেই তিনি হাজির হলেন পথের ধারে সেই চাঁপা গাছটির কাছে। দেখেন, ওমা, তার সমস্ত ফুলই কে যেন এইমাত্র তুলে নিয়ে গেছে! তিনি চাঁপা গাছকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আহা রে, তোমার সমস্ত ফুলই কি ওই ব্রাহ্মণ তুলে নিয়ে গেছে?’ তার উত্তরে চাঁপা এমন ভাব দেখালো যেন সে কিচ্ছুটি জানে না, ‘ফুল কি? ব্রাহ্মণ কে? তুমিই বা কে?’ নারদ বুঝলেন কিছু একটা তো রহস্য আছে, নইলে ব্রাহ্মণ-চাঁপা এরা সব বেকুবের মতো আচরণ করে কেন! আসল ঘটনাটা না-জানা অব্দি তো স্বস্তি নেই!
নারদ আবার ফিরে গেলেন মন্দিরে। মন্দিরে ঢুকেই তিনি তো অবাক। কে যেন এইমাত্র চাঁপা ফুল দিয়ে মহাদেবকে পুজো করে গেছে। গুণে দেখলেন, ঠিক একশো আটটা চাঁপা ফুল। সেইসময় মন্দিরের পূজারি এলেন পুজো করতে। তাঁকে নারদ জিজ্ঞেস করলেন, হে ব্রাহ্মণ, আপনি কি জানেন, এই একশো আটটি চাঁপা ফুল দিয়ে কে পুজো করেছে মহাদেবকে?’ পূজারি বললেন, ‘আর বলবেন না, এক দুষ্ট ব্রাহ্মণ রোজ এভাবেই মহাদেবের পুজো করে। ইচ্ছে থাকলেও তার জন্যই চাঁপা ফুল পাওয়ার জো থাকে না আমাদের।’ নারদ আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার সঙ্গে তো ব্রাহ্মণের দেখা হয়েছিল, আমায় তো এ-কথা বলল না?’ পূজারি হেসে বললেন, ‘তাহলেই হয়েছে আর কি! আসলে সে ভয়ে ভয়ে থাকে কেউ পাছে তার পুজোর উদ্দেশ্য না জেনে ফেলে! তাই চাঁপা গাছটিকেও বুঝিয়ে সুঝিয়ে কিছুতেই সত্যিটা বলতে দেয় না।’ নারদ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তার উদ্দেশ্যটা কি?’ পূজারি বললেন, ‘তার একটাই উদ্দেশ্য, শিবকে তুষ্ট করে রাজাকে বশে রাখা–‘
পূজারির কথা শেষ হওয়ার আগেই সেখানে কাঁদতে কাঁদতে হাজির হল এক বুড়ি বামনি। সে এসেই মহাদেবের বেদির কাছটিতে বসে বিলাপ করে কাঁদতে লাগল। নারদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কি হয়েছে গো বুড়ি মা? কাঁদছ কেন?’ বুড়ি বলে, ‘দুখের কথা আর কি বলব বাছা, বজ্জাত বামুনটা আমাদের সব কিছু কেড়ে নিলো গো… হে মহাদেব, তুমি এর প্রিতিকার কর বাবা…আর যে সহ্য হয় না!’ বলেই বুড়ি আবার কাঁদতে লাগল। নারদ জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন বজ্জাত বামুন? কি কেড়ে নিলো?’ কাঁদতে কাঁদতে বুড়ি যা জানালো, তা হল—
বুড়ো বামুন আর বুড়ি বামনির একটি মেয়ে আছে। কিন্তু মেয়ের বিয়ে দেবার মতো বুড়োর কানাকড়িটিও নেই। তাই বুড়োবুড়ির ভাবনার আর শেষ ছিল না। তখন একদিন সেই দুষ্ট ব্রাহ্মণটি বুড়োর কাছে এসে মিষ্টি কথায় বুঝিয়ে সুঝিয়ে বলল যে, রাজার কাছে চাইলে রাজা তার মেয়ের সব ব্যবস্থা করে দেবেন। আর যাতে পাওনাগণ্ডা তাড়াতাড়ি পাওয়া যায়, সেই ব্যবস্থা সে করবে। রাজবাড়িতে গিয়ে বুড়োবুড়ি তো অবাক। রাজাকে যেন সে বশ করে রেখেছে। তার কথাই যেন রাজার কথা! রাজভাণ্ডার থেকে নিজে তো ধনরত্ন কতকিছুই নিলো, বুড়োবুড়িকেও মেয়ের বিয়ের জন্য যথেষ্ট ধন পাইয়ে দিলো। ও মা, বাড়িতে এসে বুড়োবুড়ির ভিক্ষের ধনও সে কেড়েকুড়ে নিয়ে চলে গেল! এখন বুড়োবুড়ির অবস্থা যে কে সেই, মেয়ের বিয়ে দেবে কি করে?
সব শুনে নারদের খুব রাগ হল। তিনি শিবকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে প্রভু, তুমি দুষ্ট ব্রাহ্মণকে দয়া করছ, আর এই দরিদ্র বৃদ্ধবৃদ্ধার ওপর নির্দয় হচ্ছ…এ তোমার কেমন বিচার প্রভু?’ তাঁর অভিযোগ শুনে শিব সামান্য লজ্জিত হয়ে বললেন, ‘কি করবো বাপু, আমি যে চাঁপা ফুল বড্ড ভালোবাসি। আর ওই ব্রাহ্মণ আমাকে নিত্য একশো আটটি চাঁপায় পুজো করে। এই ফুলে যে আমায় পুজো করে সে জগতশুদ্ধ আমাকেও বশ করতে পারে। তাই সে রাজাকেও বশ করতে পেরেছে, আমাকেও বশ করেছে।’ নারদ বললেন, ‘তাহলে এ-অন্যায়ের প্রতিবিধান?’ শিব বললেন, ‘তুমি আমার পরমভক্ত। তুমি যে প্রতিবিধান করবে, তাই হবে সত্য, তাই হবে শাশ্বত।’ শিবের আদেশ পেয়েই মনের সমস্ত রাগ নিয়ে ক্ষোভ নিয়ে বুড়োবুড়ির সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবিধান করতে নারদ বেরিয়ে এলেন মন্দির থেকে। সেই দুষ্ট ব্রাহ্মণ তখন খানিক দূরের একটি পথ দিয়ে রাজবাড়ির দিকে যাচ্ছিল। ভীষণ স্বরে নারদ হুঙ্কার দিয়ে তাকে থামলেন, ‘ওরে দুষ্ট ব্রাহ্মণ, তুই মানব হয়ে জন্ম নিয়েও অমানবিক অন্যায় করছিস, মিথ্যাচার করেছিস, পরের ধন অন্যায়ভাবে অপহরণ করেছিস; আমি তোকে অভিশাপ দিচ্ছি তুই এক্ষুনি ঘৃণ্য রাক্ষসযোনিতে জন্ম নিবি!’ বলতে বলতে রাগে কাঁপতে লাগল নারদের সমস্ত শরীর। দারুণ বেগে তিনি হাজির হলেন চাঁপা গাছটির সামনে, উন্মত্ত ক্রোধে অভিশাপ দিলেন তাকেও, ‘ওরে দুর্মতি, দুষ্ট ব্রাহ্মণের পরামর্শে তুই যে মিথ্যাচার করেছিস, সেই অন্যায়ে তোর যে ফুল মহাদেবের প্রিয় ছিল, যে ফুলে পূজা করে জগৎ বশীভূত করার ক্ষমতা রাখত মানব; সেই ফুল আজ থেকে আর মহাদেব গ্রহণ করবেন না, সেই ফুলে পুজো দিলে আজ থেকে মানব মহাদেবের কোন কৃপাই লাভ করতে পারবে না, লাভ করবে কেবল অমঙ্গলের রোষ!’—এই বলে নারদ দর্পের সঙ্গে পৃথিবী ছেড়ে স্বর্গলোকের দিকে পাড়ি দিলেন।
এভাবেই মর্ত্যে শিবের পুজোয় সেদিন থেকে চিরদিনের জন্য চাঁপা ফুল নিষিদ্ধ হয়ে গেল।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news