জ্যোতিস্মিতা রায়
পুলওয়ামা হামলার পর বদলার আগুনে ফুটছে গোটা দেশ। দেশবাসীর একটা বড় অংশ চাইছে, সমবেদনা অনেক হয়েছে, এবার উচিৎ শিক্ষা দিতে হবে পাকিস্তানকে। রাজনৈতিক নেতারাও এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই। কোথাও প্রধানমন্ত্রী বলছেন, তাঁর হৃদয়েও আগুন জ্বলছে, কোথাও বিরোধী দলনেতা বলছেন, এবার এসপার নয় ওসপার। এরইমধ্যে তাল মিলিয়ে তৃণমূলের বয়েসে তরুন অথচ গুরুত্বপূর্ণ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, তাঁর ‘ছেলে’ হলে তিনি তাঁকে সেনাবাহিনীতেই পাঠাবেন। প্রশ্ন উঠছে এখানেই। ছেলে হলে তবে সেনাবাহিনীতে কেন? মেয়েরা কী সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার উপযুক্ত নয়! সেনাবাহিনীর তিনটি বিভাগেই মহিলাদের যোগ দেওয়ার অবকাশ রয়েছে। আলাদা করে প্রমীলা বাহিনী রয়েছে সেনার। তরুন নেতার চিন্তা-ভাবনায়.এমন লিঙ্গবৈষম্য কেন সে প্রশ্নও মাথাচাড়া দিয়েছে। অভিষেকের কন্যাসন্তান রয়েছে। তার গণ্ডি কী শুধুমাত্র পড়াশোনা করে বিয়ে বা সন্তানের লালন পালন? নিদেনপক্ষে অন্য কোনও চাকরি? অভিষেকের রাজনীতির হাতেখড়ি যাঁর হাত ধরে, তিনি তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি নিজে সেনাবাহিনীতে না গেলেও জীবনযুদ্ধ কম করেননি। রাজনীতির ময়দানে এখনও লড়ে যাচ্ছেন তিনি। রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কুর্সির দিকে এখন দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যাঁরা বস্তাপচা ভাবনা মাথায় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, “আরে, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া কি মুখের কথা? কত্ত ঝুঁকি রয়েছে!” কিংবা “জঙ্গিদের সামনে বন্দুক নিয়ে পারবে নাকি একটা মেয়ে?” এমন প্রশ্নকর্তারা যে মিতালী মধুমিতার নাম শোনেন নি তা বলা বাহুল্য। ভারতীয় সেনার লেফটানেন্ট জেনারেল মিতালী মধুমিতা এমন একজন নারী যিনি সাহসিকতার পদক পেয়েছেন পূর্ব উত্তর ভারত ও জম্মু কাশ্মীরে সফল অপারেশনের জন্য। তালিকায় রয়েছেন বাঙালি বীরাঙ্গনাও পদ্মাবতী বন্দ্যোপাধ্যায়, ভারতীয় বায়ু সেনার প্রথম এয়ার মার্শাল। তিনি নর্থ পোলে গবেষণা করতে যাওয়া প্রথম ভারতীয় মহিলাও বটে। এরকম দৃষ্টান্ত আরও রয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বর্তমানে ১৫৬১ জন মহিলা অফিসার রয়েছেন, বায়ু সেনায় মহিলার সংখ্যা ১৫৯৪ এবং নৌ-সেনায় মহিলা রয়েছেন ৬৪৪। এঁরা সকলেই নিজ কাজে যোগ্য ও দক্ষ। সমুদ্রের গভীর থেকে সুদূর মহাকাশ, সব জায়গায় নিজেদের প্রমাণ করার পরেও কেন এই ছূৎমার্গ?
একজন সাংসদ, দেশের একজন বিখ্যাত নেত্রীর ভ্রাতুষ্পুত্র, কীভাবে এমন সেক্সিস্ট মন্তব্য করলেন! বিস্ময় তৈরি হয়েছে সব মহলে। দেশজুড়ে যেখানে মহিলাদের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেওয়া হচ্ছে, তাঁর নিজের দলের নেত্রীই যেখানে পুরস্কৃত ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্প নিয়ে গর্ব করে থাকেন, সেখানে অভিষেকের কী আরও একটু সচেতন হয়ে মন্তব্য করা উচিত ছিল না! এই প্রশ্নও উঠেছে রাজনৈতিক মহলে। কোনও চাকরি কোনও লিঙ্গ পরিচয়ের জন্য সীমাবদ্ধ নয়, তা সকল যোগ্য নাগরিকের অধিকার, এসব কথা মানুষকে বোঝাবার দায়িত্ব তো রাজনীতিকদেরই। এই বিষয়ে রাজ্যেরই এক প্রবীন রাজনীতিকের বক্তব্য, সস্তায় হাততালি কুড়োনোর প্রবণতা বড়দেরই এখনও যায়নি আর অভিষেক তো ছোট ছেলে। এই রাজনীতিক যাই বলুন না কেন বয়েসে নবীনদের থেকেই মানুষ নতুন যুগের রাজনীতি, নতুন রাজনৈতিক ভাষা, সমাজ ভাবনা আশা করে। এমতাবস্থায় এমন একটি মন্তব্য করে নারী সমাজকে তো ছোট করে দেখালেনই অভিষেক একই সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক পরিপক্কতা যে এখনও নিচের দিকে সে প্রমাণও দিলেন। অন্তত অভিষেকের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এমন কথাই উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news