সুমন ভট্টাচার্য :
উইং কমান্ডার অভিনন্দনের ফিরে আসা আসলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাফল্য। মানতেই হবে যে, এই কাজটা আগের কোনও সরকার করতে পারেনি। আমাদের অনেকেরই হয়তো মনে আছে কার্গিল যুদ্ধের সময় অজয় আহুজাকে কীভাবে কপালে গুলি করে মারা হয়েছিল। আরেক ভারতীয় জওয়ান নচিকেতাকে বন্দি করে রাখা হয়। যদিও পরে তাঁকে ছাড়ে নওয়াজ শরিফ সরকার। কিন্তু সেটা ছিল তৎকালীন পরিস্থিতিতে এক ধরনের মিডিয়া হাইপ তৈরি করার কৌশল। যা প্রয়োজন ছিল নওয়াজের।
আরেকটা বিষয় খেয়াল করার মতো, সেটা হল গত কয়েক দিনে পাকিস্তানি মিডিয়ার ভূমিকা। দেখা যায় যে, যুদ্ধ যদি বাঁধে তাহলে কী কী ক্ষতি হতে পারে ইত্যদি নিয়ে সে দেশের বামপন্থীদের দিয়ে লেখাচ্ছিল ও বলাচ্ছিল তারা। অতএব, দ্বিতীয় সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের পর একটা বিষয় পরিস্কার, এবার ভারত নয় বরং পাকিস্তান চাপে। জেনে রাখা ভালো, এর মধ্যে কাশ্মীর সীমান্তে প্রচুর সেইলিং করে ভারত। বাধ্য হয়ে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের গ্রামের পর গ্রাম থেকে লোক সরাতে বাধ্য হয় সীমান্তের ওপারের সরকার। কিন্তু কাশ্মীর সীমান্তে তারা পাল্টা সেইলিং করতে পারছে না। এমনিতে জম্মু বা অন্য সেক্টরগুলিতে পাকিস্তানি সেনা ইচ্ছে হলেই সেইলিং করে থাকে। কিন্তু কাশ্মীরে সেইলিং করলে তারা কাশ্মীরীদের বিশ্বাস হারাবে, অতএব…। অপরপক্ষে পুলওয়ামা কাণ্ডের পর গোটা পৃথিবী পাকিস্তানের বিপক্ষে চলে গেছে। আগে থেকেই আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্সের মতো দেশগুলো পাকিস্তানের জঙ্গি কার্যকলাপ নিয়ে সমালোচনা করছিল। মোদ্দা কথা, পাকিস্তান যখন কূটনৈতিক স্তরে গুরুত্ব হারাচ্ছে, মোদীর ভারত তখন চিনকে দিয়েও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কথা বলিয়ে নেওয়া শুরু করেছে। ক’দিন আগেই আমেরিকা জঙ্গি সমস্যা দমনে পাকিস্তানকে না জানিয়েই তালিবানদের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। তার মানে আন্তর্জাতিক স্তরে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করার জন্য যা যা দরকার সবই প্রস্তুত হয়েছিল। তার ফলেই ওআইসি (অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক করপোরেসন) পাকিস্তানের আপত্তি সত্ত্বেও ভারতকে তাদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানায়। ভারতীয় বায়ুসেনা পাকিস্তানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করায় তারা নিন্দা করে বটে, তবে আমন্ত্রণ বহাল রাখে। অর্থাৎ ইসলামিক রাষ্ট্রগুলিও পাকিস্তানকে সরিয়ে রেখে ভারতকে গুরুত্ব দেওয়া শুরু করেছে।
সোজা কথাটা হল মোদী সরকার কূটনৈতিক স্তরে অনেক বেশি আগ্রাসি তথা সফল। তাই আগের ভারতীয় সরকারগুলির মতো নিজেদের পাইলট পাকিস্তানে আছে জানার পরেও ‘ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও’ বলে কাঁদুনি গায়নি। বরং পাকিস্তান যখন শর্তসাপেক্ষে উইং কমান্ডার অভিনন্দনকে ছাড়তে চেয়েছে তখন উল্টে বলেছে বিনা শর্তেই ছাড়তে হবে। জেনেভা চুক্তির কারণেই ছাড়তে হবে। বিন্দুমাত্র পাত্তা দেয়নি ইমরানের আলোচনার প্রস্তাবকে। কান্দাহারের মতো লজ্জাজনক পুনরাবৃত্তি চায় না এই সরকার। তাছাড়া সে সময় যে মাসুদ আজহারকে ছাড়াতে বাধ্য হয়েছিল ভারত, তার পেছনে একটা অন্য গল্পও ছিল। তৎকালীন প্রভাবশালী আমলা এনকে সিংহের জামাই ছিল অপহৃত বিমানে। সরকার পক্ষের ওই আমলার চাপেই মাসুদের বিনিময়ে বিমানযাত্রীদের ছাড়িয়ে নেওয়া হয় বলে অনেকেই মনে করেন। একই কাণ্ড হয়েছিল যখন রুবাইয়া সৈয়দকে অপহরণ করা হয়। সে সময় ভিপি সিংহ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন রুবাইয়ার বাবা মুফতি মহম্মদ সৈয়দ। এবং এক্ষেত্রেও রুবাইয়াকে ছাড়াতে কুখ্যাত জঙ্গিদের মুক্তি দেয় সরকার। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী সরকার অন্য ধাতুতে গড়া। তাই অভিনন্দন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়ার পরেও সামান্যতম নরম মনোভাব দেখানো হয়নি। অথচ অভিনন্দনের বাবাও কিন্তু ভাইস এয়ার মার্সাল ছিলেন। তবু ভারত সরকার বুঝিয়ে দিয়েছিল, নিজের দেশের সেনার প্রতি দায়িত্ব আছে বটে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে পাকিস্তানের কাছে মাথা নত করতে হবে। ফলে দেখা গেল, পাকিস্তান অভিনন্দনকে জেনেভা চুক্তি অনুযায়ীই ছাড়তে বাধ্য হল। এর একটা কারণ অবশ্যই আন্তর্জাতিক চাপ। এই যে আজ চিনও পাকিস্তানের সঙ্গে নেই। এটা বিরাট সাফল্য। মোদীর সাফল্য।
যদিও একটি বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র হয়তো আগামীকাল তাদের প্রথম পাতায় হেডিং করবে ‘অভিনন্দন ইমরান’। কিন্তু আমার মতে হেডিং হবে—অভিনন্দন প্রমাণ করল ভারত এখন সুপার পাওয়ার।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news
সঠিক তথ্য তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ।