পার্থসারথি পাণ্ডা : 
উত্তমকুমার তখন অরুণ। ছবিতে আসবেন, নাম বদল হবে—এসব বেশ পরের ভবিতব্য। সে এক উদ্দাম কৈশোরের কাল। ভবানীপুরের পদ্মপুকুর (১৯৪২ সাল পর্যন্ত এই পুকুরটিতে সাঁতার শেখানো হত, তারপর পানীয় জল সরবরাহের জন্য সাঁতার বন্ধ করে দেওয়া হয়।) দাপিয়ে তখন সাঁতার শিখছেন, নিজেদের লুনার ক্লাবের হাতেলেখা ম্যাগাজিনে কবিতা ও গল্প লিখছেন, ইন্দিরা সিনেমার পেছনে বিখ্যাত কুস্তিগির ননী ঘোষের আখড়ায় কুস্তি শিখছেন, সুকুমার গুপ্তর কাছে লাঠি খেলা শিখছেন আর পড়ছেন সাউথ সুবার্বন স্কুলে, ক্লাস এইট কি নাইনে।
কৈশোরে এ বয়সের জন্য যা কিছু নিষিদ্ধ, গুপ্ত; সেইসব জিনিসের প্রতিই স্বাভাবিক একটা আকর্ষণ থাকে। বড়রা সিগারেট টানে, জানে এতে ক্ষতি হয়, তবুও টানে। কেন টানে? চেখে দেখতে হবে তো জিনিসটা কেমন, কেন এর প্রতি এত টান?
সেদিন বিজলিতে চলছে ‘ঠিকাদার’ নামের বাংলা ছবি। তখনকার মেয়েদের হার্টথ্রব নায়ক দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনয় করেছিলেন এ ছবিতে। নায়িকা ছিলেন জ্যোৎস্না গুপ্ত। বন্ধুদের সঙ্গে নুন শো-তে জমিয়ে ছবিটা দেখা হয়ে গেল। তারপর হল থেকে বেরিয়ে প্ল্যানমাফিক একটু আড়ালে সরে গেলেন সদলে অরুণ। কাঁপা কাঁপা হাতে বেরুল ক্যাপস্টান ম্যাগনাম সিগারেট। প্রথম নিষিদ্ধ কাজটি করার উত্তেজনা ও ভয়ে তখন হাত কাঁপছে, বুক কাঁপছে। বাড়ির কেউ যদি কপালের ফেরে দেখে ফেলে তাহলেই চিত্তির! তাই চারিদিকে কয়েকজোড়া চোখের সতর্ক ও সজাগ দৃষ্টি ঘুরতে থাকে। সেই অবসরে দেশলাইয়ের জ্বলন্ত কাঠির আলতো ছোঁয়ায় জ্বলে ওঠে সিগারেট। হাতছানি দেয় নিষেধের পাহারা ছাড়িয়ে নিষিদ্ধ জগতে পা রাখতে। হাত থেকে সিগারেট উঠে আসে ঠোঁটে। এক একটানে হাতে হাতে ঘুরতে থাকে ‘রিলে’ হয়ে। ধোঁয়ায় ভরে ওঠে বুক, তারপর একটু অনভ্যাসের কাসি, জিভে সামান্য তেতো, মাথায় অল্প রিমঝিম। প্রথম দিনের এই অনুভূতিটাই সারাজীবনের জন্য পেয়ে বসল।
সিগারেটের আয়ু শেষ হল। এবার বাড়ি ফিরতে হবে তো, কিন্তু মুখ খুললেই সমানে বেরুচ্ছে সিগারেটের কড়া তামাকের গন্ধ! কি হবে? এভাবে বাড়ি ঢুকলে আড়ং ধোলাই এক্কেবারে নিশ্চিত। এখন উপায়? সামনেই শ্রীহরির মিষ্টির দোকান। উপায় খুঁজতে সবাই মিলে সেখানেই এসে ঢুকলেন। ভাবনাটা এমন যে, এর ওপর কচুরিমিষ্টি কিছু একটা খেয়ে নিলে সিগারেটের গন্ধটা চাপা পড়ে যাবে তার তলায়। ওমা কোথায় কি! গাণ্ডেপিণ্ডে গিলেও গন্ধ আর যায় না। আচ্ছা মুশকিল তো! ঠিক তখনই দলের একজনের মাথা থেকে বেরুল সিগারেটের গন্ধ বিদেয় করতে ওডিকোলন ইউস করলে কেমন হয়! তখন আগাপাশতলা ভাববার সময় নেই, সন্ধ্যে হয়ে গেছে বাড়ি ফিরতে হবে, নইলে সিগারেটের গন্ধ লাগবে না, এমনিতেই আচ্ছা সে উত্তম-মধ্যম জুটবে কপালে। তাই টাশ করে ওডিকোলন কিনে গায়ে মেখে, জিভেও কয়েক ফোঁটা ফেলে দিলেন সকলে। আর তাতেই ব্যাপারটা ক্লিক করে গেল। বেরিয়ে এলো স্বস্তির নিঃশ্বাস। নাহ, গায়ে মুখে কোথাও আর সিগারেটের গন্ধের ছিটেটুকুও নেই, তার বদলে ভুরভুর করছে মিষ্টি একটা গন্ধ। আঃ, কী শান্তি! সেই শান্তিটুকু নিয়ে পাঁই পাঁই করে যে যার বাড়ি ছুটলেন, পিঠ বাঁচাতে বাড়ি ফিরতে দেরি হওয়ার একটা আজব কারণ খাড়া করে ম্যানেজ করতে হবে যে!…
গল্পের শেষে সামান্য আক্ষেপ, বাঙালি তাঁদের প্রিয় মহানায়ক উত্তমকুমারের মৃত্যুদিন যতটা সমারোহে মনে রেখেছেন, জন্মদিন ততটা নয়। আজ, ৩ সেপ্টেম্বর, আজ উত্তমকুমারের জন্মদিন… বেঁচে থাকলে আজ বিরানব্বই বছরে পা দিতেন তিনি…
তথ্য ঋণঃ আমার আমি- উত্তমকুমার
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news