নীল রায় ও সূর্য সরকার
দিনটা ছিল গত বছর ২১ জুলাই ! সকাল ৮ টার কিছু আগে পিছনের রাস্তা দিয়ে ধর্মতলার সমাবেশ মঞ্চের দিকে গটগট করে হেঁটে যাচ্ছিলেন তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী। আর কয়েক ঘন্টা পরেই শহীদ দিবসের সমাবেশে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বক্তৃতা দেবেন লাখো লাখো জনতার উদ্দেশে। তাই সেদিন তৃণমূলের বক্সীদার দম ফেলার ফুরসৎ নেই বলেই আলোচনা হচ্ছিল উপস্থিত যুব তৃণমূল কংগ্রেস নেতা-কর্মী মহলে। মঞ্চে উঠে এক কাণ্ড দেখেন তৎকালীন দক্ষিণ কলকাতার সাংসদ। মঞ্চের ওপরে দাঁড়িয়ে সামনের উপস্থিত জনতার দিকে তাকিয়ে চমকে যান তিনি। সুব্রত বক্সি দেখতে পান মঞ্চের চারিপাশ ঘিরে বসে থাকা তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ। বলা ভালো তাঁর অনুগামীরা যুবরাজকে খুশী করতে লাখ লাখ অভিষেকের মুখোশ বিলি করেছিল সেদিন। এবং মঞ্চের খুব কাছেই বসে থাকা উৎসাহী কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তা বিলি করে, তা পর়তেও বলেছিলেন। চারিদিক অভিষেকময় দেখেই রাস ভারী সুব্রত বক্সী বেজায় ক্ষেপে যান। মূল সভা মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড় ছবি ছাড়া আর কোথাও তাঁর নাম গন্ধ পর্যন্ত না দেখে, মঞ্চের সিঁড়ি ধরে নামতে শুরু করেন তিনি। অগ্নিশর্মা বক্সীদাকে দেখে তখন যুবনেতা-কর্মীদের থরহরি কম্প অবস্থা! সকলেই ততক্ষণে বুঝে গিয়েছেন দলের সভাপতির এ হেন প্রতিক্রিয়ার কারণ। যুব কর্মীরা পরিস্থিতি সামাল দিতে অনুরোধ করলেন বছর ৬৭-র উত্তর কলকাতার তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সভাপতি জীবন সাহাকে। কিন্তু বক্সীদাকে থামায় কার সাধ্যি! সভাস্থলের মূল দরজার দিকে যখন বেশ অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছেন সুব্রত বক্সী, সেই সময় প্রায় দৌড়ে তাঁর কাছে এসে পৌঁছান রাজ্যের মন্ত্রী এক ছেলে। পদাধিকার বলে যিনি যুব তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যের সাধারণ সম্পাদক। সুব্রত বক্সিকে থামিয়ে হাতজোড় করে ওই যুবনেতা বলেন, “কাকু তুমি আজকের সমাবেশ থেকে এভাবে চলে গেলে ভুল বার্তা যাবে। প্লিজ তুমি যেও না।” নিজের ক্ষোভের কথা তাঁকে কর্কশ গলায় জানান সুব্রত বক্সী। বলেন “এভাবে রাজনীতি করতে আসিনি।” বাধ্য ছাত্রর মতো তাঁর কথা শুনে হাতজোড় করেই আবারও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদককে মঞ্চে ফেরার অনুরোধ করেন মন্ত্রী পুত্র। পুত্রসম যুবনেতার এমন ব্যবহার দেখে মাথা ঠান্ডা করে মঞ্চে ফেরেন সুব্রত বক্সি।
গত বছর একুশে জুলাইয়ের সমাবেশে অভিষেকের দাপট ছিল প্রশ্নাতীত। লোকসভা ভোটে শোচনীয় পরাজয়ের পরও পিসি তাঁর ভাইপোকে আগলেই রেখেছেন। তাই এবারের ২১ জুলাইয়ের সমাবেশে যুব সংগঠনের সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেন বেশ কিছুটা বেপাত্তাই রইলেন। বাংলার রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, ভোট গুরু প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শেই কী ভাইপো অভিষেককে প্রচারের আলো থেকে দূরে সরিয়ে রাখছেন মমতা? এবার ২১-এর প্রস্তুতির গোড়া থেকে ভাইপো ‘অদৃশ্য’! রাজ্যজুড়ে কোনও সভা – মিছিলে দেখা নেই তাঁর। মুখ অমিল প্রচারের পোস্টার, কাট-আউটেও। প্রচারের একমাত্র ‘মুখ’ সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি এতদিন দলকে টেনেছেন। আগামীর ‘দুর্যোগে’ তিনিই ‘পার করনে ওয়ালা’!
লোকসভা ভোটের ফলাফলে ধাক্কার অন্যতম ‘ক্রেডিট’ অভিষেকের! তাঁর দায়িত্বে ( লিখিত-অলিখিত) থাকা প্রায় গোটা জঙ্গলমহলে চোখে সর্ষে- ফুল দেখেছে তৃণমূল। যেখানেই ‘যুবরাজ’ পা রেখেছেন, দলের ভিত আলগা হয়েছে সেখানেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর তাঁকে করে তোলা হয়েছিল দলের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড”! ফলে তিনি বিগত ৩-৪ বছরে রাজ্য চষেছেন বটে। কিন্তু, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আড়ালে আবডালে জেলা স্তরের নেতাকর্মীরা বলছেন, ভাইপোর অতি সক্রিয়তা দলে বৃদ্ধি পেয়েছে “মাদার বনাম যুব”র দ্বন্দ্ব। যা তৃণমূলকে ঠেলেছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আর সাংগঠনিক অক্ষমতার কানাগলিতে। লোকসভা ভোট বৈতরনী উৎরাতে গিয়ে “লেটার” মার্কস পাওয়ার বদলে “ফেল” করেছে তৃণমূল। ভোটের পর তা বুঝেছেন স্বয়ং মমতাও! এমনটাই মনে করেন তৃণমূল নেতারা। তাই অভিষেক দলের অন্দরে অলিখিত ক্ষমতার অধিকারী হলেও, তাঁকে আপাতত লোকচক্ষুর আড়ালে পাঠিয়ে দিয়েছেন পিসি। কেড়ে নেওয়া হয়েছে জেলাওয়ারি দায়িত্ব, মিলেছে ভোটার লিস্ট সামলানোর মতো রাজনীতির শিক্ষানবীশের কাজ। সঙ্গে পেয়েছেন “ভোট গুরু” প্রশান্ত কিশোরের দেখভালের দায়িত্ব। লোকসভা নির্বাচনের পর দু-একটি সাংবাদিক বৈঠক বা দলের নিহত কর্মীদের বাড়ি গিয়েছেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। এর মধ্যে অবশ্য কিছুদিনের জন্য লন্ডন গিয়েছিলেন হারের “হ্যাঙ্গওভার” কাটাতে। তবে প্রতি বছর ২১ জুলাইয়ের সমাবেশে যে মূল পোস্টার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি দিয়ে হয়, তার বাইরেও জেলা জুড়ে একাধিক পোস্টার লাগানো হয়। সেখানে তৃণমূল সুপ্রিমোর ছবির সঙ্গে জ্বলজ্বল করত অভিষেকের ছবিও। চলতি বছর কিন্তু ভাইপোর ছবির দেখা নেই। সূত্রের খবর, প্রতিবার ২১ জুলাইয়ের আগে তৃণমূলের তরফে পোস্টার, কাট – আউটের সিডি জেলায় জেলায় পাঠানো হয়। সেই সিডিগুলিতে এবার অভিষেকের কোনও ছবি নেই। যত খুশী পোস্টার, যেমন খুশী হোক না কেন? ছবি শুধু থাকবে মমতারই, কড়া নিদান দিয়েছে দল!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news