কিশোর ঘোষ :
থমসন ও রয়টার্সের সমীক্ষা কি সত্যি? অনেকের মতে সত্যি না। কিন্তু যদি সত্যি হয় তাহলে নতুন করে ভাবতে হবে দেশের নারী নিরাপত্তা নিয়ে। ভোটের রাজনীতি ভুলে একজোট হতে হবে কেন্দ্র ও রাজ্যকে। সেক্ষেত্রে আলাদা করে চিহ্নিত করা উচিত সেই সব অঞ্চলকে যেখানে মেয়েদের নিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি বিঘ্নিত। তবে এতদিনে একটা জিনিস পরিষ্কার—কেবল মাত্র আইন কঠোর করে ধর্ষণ, পাচার, বধূ নির্যাতনের মতো ঘটনা বন্ধ করা তো দূর কমানোও যাবে না। ‘ডাক্তার’কে বুঝতে হবে, ‘রোগে’র মূলে না গিয়ে ‘রোগী’কে ওষুধ গেলালে অসুখ সারে না। কিন্তু এই ‘অসুখ’ কতদূর বিস্তৃত হয়েছে?
সত্যি বলতে, ভারতের মাথা নিচু করে দিয়েছে থমসন ও রয়টার্সের চাঞ্চল্যকর সাম্প্রতিক সমীক্ষা। সমীক্ষা অনুযায়ী নারী নির্যাতনে ভারত এক নম্বর। এমনকী বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের থেকেও এ বিষয়ে আমরা ‘এগিয়ে’! এই সমীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে ন্যাশনাল ক্রাইম রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী। তথ্য বলছে, ভারতে প্রতি ১৫ সেকেন্ডে ১ টি করে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, প্রতি মিনিটে শ্লীলতাহানী ঘটে ৭ টি এবং পারিবারিক হিংসার ঘটনা ঘটে প্রতি ২০ সেকেন্ডে ১টি করে। ২০০৭ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে লাফিয়ে বেড়েছে এই জাতীয় অন্যায়। বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৩% হারে।
সত্যি বলতে, বর্তমান সমীক্ষার সঙ্গে সংবাদ মাধ্যমে নিয়মিত নজর রাখা সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। শহর কলকাতা তথা রাজ্যে প্রতিদিন কমপক্ষে একটি করে নারী নির্যাতনের খবর পাই আমরা। এর সঙ্গে নিয়মিত চোখে পরে বধূহত্যার ঘটনা। হঠাৎ হাওড়া কী শিয়ালদহ স্টেশন থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে নারী পাচারের সঙ্গে যুক্ত দুষ্কৃতীদের। মুখে অ্যাসিড ছুড়ে মারার ঘটনা, পথে-ঘাটে, ট্রেনে-বাসে নারী নিগ্রহের ঘটনা তো অহরহ ঘটছে। এই যদি রাজ্যের চিত্র হয়, তাহলে দেশের গুণতি যে পাইকারি হারে বাড়বে তা বলা বাহুল্য। রাজধানী দিল্লি থেকে শুরু করে দেশের ছোট-বড় শহরগুলিতে মাঝে মাঝেই ঘটে চলছে নারী নির্যাতনের একাধিক ঘটনা। যার কিছু কিছু নিয়ে শোরগোল পড়ে যাচ্ছে রাজনীতির ময়দানে। পুলিশ প্রশাসন যে তৎপর হচ্ছে না তা না। সচেতনতা প্রচারও চলছে জোরকদমে। কিন্তু পাশাপাশি নারী নিরাপত্তা নিয়েও চলছে রাজনীতি এবং পাল্টা রাজনীতি। এইখানেই হয়তো গোলমাল। দেশের নেতা-নেত্রীদের বুঝতে হবে, সব কিছু নিয়ে রাজনীতি চলে না। কোথাও কোথাও একজোট হয়ে কাজ করলে আখেরে লাভ হয়। অন্তত যার সঙ্গে জাতীয় মান-সম্মান জড়িত। কিন্তু তা হচ্ছে না। দোষারোপের রাজনীতি চলছে গোটা ভারত জুড়ে। কিন্তু বিষয় অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাই চ্যানেল হিন্দুস্থানের পক্ষে আমরা সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বললাম বিষয়টি নিয়ে।
বিধায়ক (সিপিআইএম) তন্ময় ভট্টাচার্য্য বললেন, ‘আমাদের রাজ্যে ২০১১ সালের পর ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে চলেছে। কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীর সরকার বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। কাজের কাজ না করে। ছত্তিশগড় ধর্ষণে, হরিয়ানা গনধর্ষনে, নারী ও শিশু পাচারে উত্তরপ্রদেশ প্রথম, পশ্চিমবঙ্গ দ্বিতীয়। এটা লজ্জার। বানতলা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। নারী নির্যাতন সেই মহাভারতের আমল থেকে চলে আসছে। যা খুবই নিন্দনীয়।’
গীতশ্রী সরকারের মতে, ‘যখন স্কুলে পড়তাম আমাদের ভূগোল বইতে ছিল পশ্চিমবঙ্গ ধান উৎপাদনে প্রথম, ভারত গম উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়। সেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো পড়বে দেশ গনধর্ষণে প্রথম, শিশু পাচারে দ্বিতীয়। কেন্দ্রীয় সরকারের বিধায়ক ধর্ষণকারীদের নিয়ে মিছিল করছেন। এটা লজ্জার। আইন থাকলেও বাস্তবায়ন নেই।’
বিজেপি নেত্রী দেবশ্রী চৌধুরী বলেন, ‘এই সমীক্ষা বাস্তব নয়। এদেশের তুলনায় ইসলামিক দেশগুলিতে নারী নির্যাতন বেশি হয়। মাত্র ৫০০ জনের উপর সমীক্ষা করা হয়েছিল।’
তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক সব্যসাচী দত্তর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য, ‘কোন দেশ প্রথম? ভারতবর্ষ? প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করুন।’
রাজ্য সরকারের মন্ত্রীসভার অন্যতম চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘নারী নির্যাতনকে ভারত সরকার যেভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছে তাতে এটা প্রাপ্য ছিল। পশ্চিমবঙ্গে ‘কন্যাশ্রী’, ‘রূপশ্রী’র মতো প্রকল্প চালু করে কন্যাদের যেখানে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও প্রকল্প শুধু নামের আর বিজ্ঞাপনেই রয়ে গেল।’
পেশায় আইনজীবি, পাশপাশি কংগ্রেস নেতা ঋজু ঘোষালের মতে, ‘অত্যন্ত দূর্ভাগ্যের। সামাজিক অবক্ষয়। আইন প্রনয়ণ না হলে এগুলি ঘটবে। যারা এগুলি করছে তারা কোনও না কোনওভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় পাচ্ছে। সিলিকন ভ্যালিতে ভারত কাজ করছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রথম না হয়ে, মহাকাশ গবেষনা ও উপগ্রহ পাঠানোতে প্রথম না হয়ে এইরকম একটা বাজে ঘটনাতে প্রথম হয়েছে। এটা খুবই দূর্ভাগ্যের বলে মনে করি।’
খেয়াল করুন, সমাজের প্রতিনিধিরা বিষয়টির নিন্দা করলেন ঠিক। কিন্তু কোথাও যেন নিজেদের জাস্টিফাই করার চেষ্টা করে গেলেন। সেই দোষারোপের রাজনীতি! আর এই সুযোগেই অনর্থ ঘটে যাচ্ছে একের পর এক। নাবালিকাও যেমন নির্যাতিত হচ্ছে, তেমনি বৃদ্ধাকেও ছাড়ছে না লুম্পেনরা।
হতে পারে থমসন ও রয়টার্সের এই সমীক্ষার বাস্তব ভিত্তি নেই। তা সত্যি হলে ভালো। কিন্তু, তবু, তথাপি বিষয়টি নিয়ে সর্বস্তরে কাজ হওয়া উচিত। অন্যদের নয়, নিজেদের মা-বোনের নিরাপত্তার জন্য।
(তথ্য সহায়তা ও সাক্ষাৎকার : সমাপ্তি রায়)
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news