অচিন্ত্য বিশ্বাস : 
১৯৫৩-র ২৩ জুন, দমদম বিমান বন্দরে এল শ্যামাপ্রসাদের দেহ ৷ লাখো মানুষ কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শেষ যাত্রায় অংশ নিলেন পরদিন ; চোখের জলে বিদায় জানানো হল এই মহাজীবনকে ৷ তখন বাঙালী রাজনৈতিক ক্ষুদ্রতায়, সংকীর্ণতায় নিজেকে বন্ধ করেনি ৷ ১৯২৫-এ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের দেহ যেদিন দার্জিলিং মেলে এল, সেদিনও এমনই মিছিল দেখেছিল কলকাতা ৷ ১৯৪১-এর ২২-শে শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণের পরও তাই। শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না ৷ প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর বন্ধু শেখ আবদুল্লা তখন কাশ্মীরের উজির-এ-আজম! শ্যামাপ্রসাদ চেয়েছিলেন সারাদেশে এক বিধি, এক পতাকা, এক রাষ্ট্রীয়তা। কাশ্মীরের বিশেষাধিকার, আলাদা পতাকা আর বিধি তিনি চাননি ৷ গিয়ে ছিলেন কাশ্মীর ৷ ভারত রাষ্ট্রে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যেতে অনুমতি লাগবে তা তিনি কিছুতেই মানেননি ৷ যথারীতি প্রবেশমাত্র আবদুল্লার পুলিশ তাঁকে বন্দী করে ৷ ১১ মে ১৯৫৩।তাঁর বন্দীদশার কথা দেশ জানল তরুণ কর্মী অটলবিহারী বাজপেয়ীর মাধ্যমে ৷ ৪৫-দিন শ্রীনগরে নিশাতবাগের সাব-জেলে বিনা চিকিৎসায় তীব্র শীতে শীতবস্ত্র ছাড়া তাঁকে থাকতে হয় ৷ ২৩ জুন তাঁর মৃত্যু হয় ৷ স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করেছেন অনেকে ৷ এই দিনটিতে দেশকে সত্যিকারের স্বাধীনতার পরিস্থিতি দেওয়ার জন্য আত্মবলিদান করলেন বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর সন্তান শ্যামাপ্রসাদ৷ জওহরলাল তখন জেনিভায়! কিছুদিন আগে খবর নিয়ে এসেছেন শ্যামাপ্রসাদ সম্পর্কে ৷ মা যোগমায়ার কাছে লিখলেন চিঠি : ‘প্রায় পাঁচ সপ্তাহ আগে যখন আমি কাশ্মীরে যাই, তখন বিশেষ করে তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছে খবর নিয়েছিলাম …’ ৷ এই চিঠিটি ভুলে ভরা ৷ বহু তথ্য জেনেশুনেও মিথ্যে করে লেখা ৷ এই নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনও তদন্ত হল না ৷ কংগ্রেসীদের কাছে আশা করি না কিন্তু গত চার বছর তো বিজেপি শাসন করছে! কেন হল না? আগেও তো অটলবিহারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন? বিজেপির কি চাই ক্ষুদিরাম থেকে শ্যামাপ্রসাদের মত কিছু আত্মত্যাগী ছবি? এই সব পোস্টার আর কিছু মূঢ় স্তাবকতা করা নেতা?
১৯৫৩-র ১-লা জুলাই পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক জনবিক্ষোভ হয় ৷ মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় আর কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষ জওহরলাল নেহেরুকে জানান শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে ঘিরে রাজ্যের সর্বত্র কংগ্রেস বিরোধী হাওয়া প্রবল ৷ বাঙালী চিরকাল আবেগে ভাসে৷ আজ আমরা এইসব অন্যায়ের বিচার চাইতে ভুলে যাই ৷ নেতাজীর মৃত্যু নিয়ে কথা বলেন তাঁর পরিবারেরই একাংশ! এক বঙ্গরত্ন সাংসদ তো আবার পাকিস্তানের জামাই! বই লিখে ফেলেন নেতাজী মৃত! কিন্তু মৃত্যুর রহস্য উন্মোচন হয় না ৷ শ্যামাপ্রসাদের অস্বাভাবিক মৃত্যুকেও আমরা ভুলে থাকি ! বিচার চাই না ৷ ক্রমে তাঁকে ভুলে থাকি ৷
কেওড়াতলা মহাশ্মশানের পাশে কিছু কুলাঙ্গার তাঁর মূর্তি কলঙ্কিত করে ! এইসব বিপ্লবীকে আমরা বলি না শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় না থাকলে এইসব মহাবিপ্লব পশ্চিমবঙ্গ গঠিত না হলে কোথায় হত? ঢাকা না নাছেরাবাদ? এ প্রশ্ন করেন না কেউ ৷ মেরুদণ্ডহীন এক চলমান গড্ডলিকা ঘাসে ঘাসে চরে ফেরে। শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুর চেয়ে বাঙালী হিন্দুর এই আত্মিক মৃত্যু আরও দূরপ্রসারী আরও ভয়ঙ্কর।
(লেখক গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য্য)
মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news