পার্থসারথি পাণ্ডা 
বৈদিক যুগ থেকেই ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কের মধ্যে পিতা-পুত্রের সম্পর্কের ঐতিহ্য প্রবহমান রয়েছে। শাস্ত্রে জাতকের যে পাঁচ জন পিতার কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে গুরু বা শিক্ষাদাতাও একজন। বাড়িতে পিতারাও সেকালে ছিলেন বেশ রাশভারী, কঠোর শাসক। তাই ধীরে ধীরে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও পিতৃসুলভ শাসনভারও তুলে দেওয়া হয়েছিল শিক্ষকের হাতে। একদিন লোকের বিশ্বাসই হয়ে উঠেছিল যে, পণ্ডিতের হাতে প্রহার না খেলে বিদ্যে হয় না। টোলে বা স্কুলে ছেলেকে পড়তে দিতে এসে বলে যেতেন, মাথা আর মুখ বাঁচিয়ে মারতে। স্বভাবদোষে অনেকে এমন মার মারতেন যে, কেলেঙ্কারি বাঁধিয়ে ছাড়তেন। তাই বিদ্যাসাগরমশাইয়ের বাবা ঠাকুরদাসমশাই ছেলেকে মারকুটে পণ্ডিতের টোল থেকে ছাড়িয়ে তুলনায় শান্তশিষ্ট এক পণ্ডিতের পাঠশালায় ভর্তি করেছিলেন। এখন অবশ্য মারামারির পাঠ উঠে প্লে-স্কুলের কনসেপ্ট চালু হয়ে গেছে এদেশেও। বাড়িতে বাবা বন্ধু, স্কুলে স্যারেরাও বন্ধু। শাস্ত্রীয় পঞ্চপিতার চরিত্রও হয়েছে এখন একেবারে একালের ছাঁচে ঢালা।
টোলের যুগের শিক্ষাব্যবস্থায় শাস্তি যেমন ছিল, অনেক ক্ষেত্রে তার মধ্যে ছাত্রদের প্রতি শিক্ষক-পণ্ডিতের ভালোবাসাও ছিল। এমনই একটি ঘটনার কথা জানা যায় প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ও ব্যাকরণ রচয়িতা বোপদেবের জীবনী থেকে—
প্রায় হাজার বছর আগের কথা। একদিন টোলের পণ্ডিতমশাই কোবরেজের ছেলে বোপদেবকে মারতে মারতে টোল থেকে বের কর দিলেন। বললেন, যেন সে টোলের দরজা আর না মাড়ায়! মাথা নীচু করে বেরিয়ে এলেন বোপদেব। তাঁর অপরাধ? অপরাধ একটাই, তিনি এক্কেবারে নিরেট! পণ্ডিতমশাই ব্যাকরণের সূত্র যা শেখান, কিছুতেই মনে রাখতে পারেন না। তাই পণ্ডিতমশাইয়ের খুব রাগ তাঁর ওপর। অমন আপদ টোলে আসার চেয়ে, টোল উঠে যাওয়া ভালো!
বোপদেবের মনে খুব দুঃখ হল। তিনি ভাবলেন, আমি বুঝি সত্যিই নিরেট। বিদ্যেবুদ্ধি আমার কিচ্ছুটি নেই। বাবার মানসম্মান সব ডুবিয়ে ছাড়লাম, পণ্ডিতুমশাইয়েরও প্রিয় হতে পারলাম না! কিন্তু আমি তো মনে রাখতে চাই ব্যাকরণের সব সূত্র, কিন্তু কিছুতেই যে মনে থাকে না!—এসব ভাবতে ভাবতে বোপদেব এলেন একটা পুকুরের পাথর বাঁধানো ঘাটে। সেখানে এসে বসলেন। হঠাত তাঁর চোখ পড়ল ঘাটের পাথরের ওপর একটা গোল দাগ। কেমন করে হল এই দাগ? প্রথম প্রশ্ন জাগল তাঁর মনে। মনই খুঁজতে লাগল তার উত্তর। সেকালে কলসি কাঁখে মেয়েরা পানীয় জল নিতে আসতেন পুকুরে। তাঁর চোখে ভেসে উঠল—জল নিতে এসে পেতলের কলসি মেয়েরা নামিয়ে রাখছেন পাথরের ওপর। কলসির তলায় থাকে ধাতুর গোল-সরু বিড়ে, যাতে কলসি মেঝেতে ঠিকঠাক বসে; দিনের পর দিন সেই বিড়ের ঘষা লেগে পাথরের ওপর গোল দাগ হয়ে গেছে। কারণটা এভাবে খুঁজে ফেলতেই বোপদেবের মনে যেন বিদ্যুতের ঝিলিক মেরে গেল। নিরেট পাথরের বুকে দিনের পর দিন যদি ঘষা লেগে দাগ হতে পারে, তাহলে বার বার পাঠ করে আমিই বা পড়া মনে রাখতে পারব না কেন? আমি কি পাথরের চেয়েও নিরেট?–এই উপলব্ধিই বোপদেবকে পণ্ডিত করে তুলেছিল পরবর্তীকালে। অপমান থেকে আত্মজিজ্ঞাসা, ক্ষণিকের দেখা থেকে দর্শন—বোপদেবের চোখ খুলে দিয়েছিল। তিনি ছুটে গেলেন পণ্ডিতের কাছে, গিয়ে বললেন তাঁর উপলব্ধির কথা—পন্ডিতমশাই অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন ছাত্রের দিকে। এই তো চোখ খুলেছে, এই তো মনের বিস্তার ঘটেছে, মন ভাবতে শিখেছে—ভাবাতেই তো তিনি চেয়েছেন বার বার, সেই চিন্তনের পাঠ বোপ পেয়েছেন প্রকৃতি থেকে, গুরু হিসেবে তিনি উপলক্ষ্য হলেন বটে, তবে প্রকৃতিই যেন তাঁকে শিক্ষা দিয়ে গেল। যে পুত্রসম ছাত্রকে তিনি টোল থেকে বের করে দিয়েছিলেন, তাকেই জড়িয়ে ধরলেন তাঁর গর্বিত বুকে।
তারপর, পণ্ডিতমশাইয়ের শিক্ষা পেয়ে বোপদেব হয়ে উঠেছিলেন পরম পণ্ডিত। তাঁর কাছে যে ব্যাকরণ শাস্ত্র ছিল একেবারে দুর্বোধ্য, সেই শাস্ত্রের সূত্রগুলি নিয়েই তিনি একদিন রচনা করেছিলেন ‘মুগ্ধবোধ ব্যাকরণ’ গ্রন্থটি। এমন সহজবোধ্য ব্যাকরণ সেকালে আর দ্বিতীয়টি ছিল না।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news