তরুণ সেন:
বয়স প্রায় সত্তর ছুঁইতে চাহিতেছে, তবুও নির্বাচন কমিশনের শিক্ষা কমপ্লিট হইল না! তাহা নাকি ধাপে ধাপে, মানে, স্টেপ বাই স্টেপ অগ্রসর হইতেছে! আলেকজান্ডারের কালে দুর্ভাগ্যবশত নির্বাচন কমিশনের জন্ম হয় নাই! হইলে সেলুকাসকে সম্বোধন করিয়া আলেকজান্ডারকে বলিতে শুনা যাইত, ‘সত্য সেলুকাস, কী বিচিত্র দেশ এই ভারতবর্ষ! আর ততোধিক বিচিত্র এই দেশের মহামান্য নির্বাচন কমিশন!’ এতকাল পরে, এই সেদিন ভোটের দ্বিতীয় দফা খতম হইবার পর তাঁহাদের যেন ন্যাপের চটক ভাঙিয়াছে, যেন ‘হঠাৎ দেশে উঠল আওয়াজ-“হো-হো, হো-হো, হো-হো”/ চমকে সবাই তাকিয়ে দেখে সিপাহী বিদ্রোহ!’–তাঁহারা দেখিলেন, বঙ্গভূমি নাকি দশ বছর পূর্বের বিহার হইয়া গিয়াছে!
হয়েছে তো। হয়েছে! বহুকাল হল হয়েছে! আরে মশাই, আপনারা কি এতদিন নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন? সারা বছর ধরেই ধর্মের জন্য, কর্মের জন্য, কায়েমী স্বার্থ আর দখলদারি বজায় রাখার জন্য যে অসন্তোষ সারা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, তা আপনাদের চোখে পড়েনি? কে আপনাদের চিনিয়ে দেবে কোন বুথ সেনসিটিভ, কোনটা নয়? কার চোখে আপনারা দেখবেন শাসক, না বিরোধীর? নিজেদের চোখ নেই? আপনাদের কি দায় নেই জনগণের বিশ্বাসের মর্যাদা দেওয়ার? আপনাদের স্বশাসনে যে ঘুণ ধরেনি, সেটা প্রমাণ করার কোন দায় নেই? আমরা, যারা সরকারি শিক্ষার পাঁয়তারা পেরিয়ে সরকারের কাছেই চাকরি চেয়ে তাড়িত হই, উপেক্ষার পাত্র হই, অধিকার চেয়ে কুকুরের সঙ্গে তুল্য হই; আমরা, যারা চাকরি পেয়ে অপনাদের কাছে সামান্য ভোটকর্মী হয়ে উঠি, নিরাপত্তা চেয়ে উপেক্ষিত হই, মিথ্যে প্রতিশ্রুতিতে বিভ্রান্ত হই, অধিকার আদায়ে কঠোর হয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী ছাড়া ভোটকর্মে যোগ দেব না বললে শাস্তি পাওয়ার হুমকি সয়ে সবকিছু মেনে নিতে বাধ্য হই। সেইমুহূর্তে শাসক ও আপনাদের একই মুদ্রার দুই পিঠ মনে হয়! স্যার গো, আমরা ভুক্তভোগী, বিগত পঞ্চায়েত ভোটের ভোগান্তি ভুলিনি, পৌরভোটের ভোগান্তি ভুলিনি, শিরদাঁড়াহীন প্রাদেশিক নির্বাচন কমিশনারদের ভুলিনি, শাসকের পোঁ ধরার ইতিহাস ভুলিনি, সদ্য ভোটে দুই দফার বিক্ষিপ্ত অশান্তি সত্বেও বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষকের হাস্যআস্যে বিমানবন্দরীয় জোক–পুলিশের কাজে তিনি নাকি বেজায় তুষ্ট, ভুলিনি! এতকিছুর পরে এতদিনে মায়ের কাছে মাসির গপ্পো কইতে এসে বলছেন–বিহার হয়েছে!
শাসক যেমন আমাদের ধর্ষনের দাম ঠিক করে দিয়েছেন, আপনারাও তো ঠিক করেছেন মৃত্যুর দাম! পুরো মরলে দশ লাখ, আদ্দেক মরলে পাঁচ। ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়, একশো শতাংশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না! আমরা তো আসলে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘টোপ’ গল্পের সেই জমাদারের বাচ্চাটার মতো, গণতন্ত্র ধরার টোপ হিসেবে আমাদের মতো নামহীন ক’জন আমআদমী যদি চিরতরে হারিয়েও যায়, তাতে কার কিই বা এসে গেল! তাই না স্যার?
বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই তো পোড়া পশ্চিমবঙ্গে ছাপ্পা, বুথদখল, বোমাবাজি, অপহরণ, রাজনৈতিক দাঙ্গা, প্রচার মিছিলে হামলা, প্রার্থীর ওপর হামলা এবং ভোট নিয়ে যাবতীয় ছ্যাঁচড়ামো বহাল তবিয়তে চলছে। এবারও কন্টিন্যুইটি জার্ক করেনি! কয়েকজনকে হত্যা করার কাজও হয়ে গেছে! বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগের আঙুল উঠেছে শাসকের দিকে। নির্ভেজাল এই দুঃসহ পরিস্থিতির মাঝেই নির্বাচন কমিশনের হরতাকর্তাদের গণতন্ত্রের শিক্ষা চলছে! হ্যাঁ, একটি জনপ্রিয় সংবাদপত্র ও পোর্টালে পড়লাম প্রতিটি দফা থেকে ‘শিক্ষা’ নিয়েই নাকি তাঁরা সুরক্ষা শতাংশ বাড়াচ্ছেন! আহা রে, ভারতীয় নিরো বাঁশি বাজাচ্ছেন! তাঁদের শিক্ষা–শম্বুকের স্বপ্ন, আমাদের ভবিষ্যৎ!
হে প্রভু, নত হয়েই তো আছি, আর কত নোয়াবে আমাদের!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news