কিশোর ঘোষ:

বর্ষাকালে শান্তিতে প্রেম করতে দেয় না ওরা। এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়াতে দেয় না, বসতে দেবে না, শুলে কানে গান শোনাতে আসবে! সব দেখে শুনে মনে হয় মশা শুধু ম্যালেরিয়া বাঁধায় না, সে রাজনীতিও করে।
এই তো, বছর খানেক আগের কথা, ডেঙ্গু না ডেঙ্গি (সম্ভবত ছেলেদের হলে ডেঙ্গু, মেয়েদের হলে ডেঙ্গি!) বিপদে ফেলে দিয়েছিল রাজ্য সরকারকে। শহর ও শহরতলির শয়ে শয়ে মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল ডেঙ্গুতে। সুযোগ পেয়ে বিরোধীরাও হাতা গুটিয়ে নেমেছিল ময়দানে। তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছিল, মশা নির্ঘাত প্রতিষ্ঠানবিরোধী। তবে কিনা সে কেবল ক্ষমতায় থাকা সরকারের উল্টো দিকে ভন-ভন করে না, সে আদতে সমগ্র মনুষ্যকুলের বিপক্ষে। কারণ ঘুরিয়ে এই গ্রহে মানুষের সরকারই তো চলছে। তারাই ক্ষমতায়। বাকি প্রাণীকুল রাজনীতির পরিভাষায় দুর্বল ‘বিরোধী পার্টি’। তলিয়ে ভাবলে, বহু কাল ধরে নিরবে একটা তৃতীয় ‘বিশ্বযুদ্ধ’ চলছে—প্যারালাল ওয়ার্ল্ড ওয়ার! সেখানে এক পক্ষ মানুষ, তথা মানব সভ্যতা। অন্য দিকে দুনিয়ার যাবতীয় অবলা প্রাণীকুল। সম্ভবত সেই তাদের ‘গেরিলা সামরিক বাহিনী’ হল গিয়ে কোটি কোটি মশা।

যাক গে, আসল কথা হল, মশা মারতে কামান না দেগে উপায় ছিল না মানুষের। কারণ গত ১০ হাজার বছরের পৃথিবীতে বাঘ-ভাল্লুক যত মানুষকে হত্যা করেছে, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি মানুষকে খুন করেছে মশা। বলা বাহুল্য, মশা তথা মশাবাহিত রোগ (বিশেষত ম্যালেরিয়া) এবং মানব সভ্যতা ইতিহাসের হাইওয়ে ধরে পাশাপাশি হেঁটে আসছে। তবে দিন বদলেছে, মশা-জ্বর নিয়ে গবেষণা অনেক দূর গড়িয়েছে। যেমন, অ্যান্টিম্যালেরিয়াল ভ্যাক্সিন, নতুন অ্যান্টিম্যালেরিয়াল ড্রাগ এবং ম্যালেরিয়া জিনোম প্রজেক্টের উপর গবেষণা ইত্যাদি। তার মানে মশা ভার্সেস মানুষের যুদ্ধে একপক্ষ জিতে গেছে, এমনটাও নয়। অতএব, মশা নিয়ে কালে কালে দেশে দেশে পঞ্চায়েত পৌরসভার কর্মচারীরা পরেসান হবেন না কেন! কীটতত্ত্ববিদ, চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা যাকে বলে গলদঘর্ম। এশিয়া থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ থেকে আমেরিকা—সবখানে এক বছরে মশা নিধনের জন্য যত বাজেট ধরা হয়, পাগলা হাতি বা মানুষ খেকো বাঘের আক্রমণ থেকে নাগরিকদের বাঁচাতে ততো বাজেট ধরা হয় না। হিসেব পরিস্কার—প্রাণীটি ক্ষুদ্র কিন্তু গুরুত্বের বিচারে বিশাল। তাই দেখি, অনাদিকাল থেকে মশা ও মানুষের শত্রুতা চলছে। যেমন ধরুণ, অত বড় দিগ্বিজয়ী গ্রিক বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। তাকে পর্যন্ত নাকানিচোবানি খাইয়ে ছেড়েছিল মশা! ভদ্রলোক অনায়াসে এ দেশটাকে কব্জা করতে পারতেন, কিন্তু মশার ঝামেলায় পিছোতে হল! এমনি এমনি বলছিলাম, যে এরা পৃথিবীর প্রথম গেরিলা যোদ্ধা! এমনকী লালমুখো সাহেবদেরও চ্যালেঞ্জ করেছিল। ন্যাশানাল লাইব্রেরি যান, অনামা ইংরেজ সিভিল সার্ভেন্টদের রোজনামচা, আত্মজীবনী পড়ুন। চোখ ফেটে জল আসবে আপনার। বাপ-মা-বউ-সন্তান ছেড়ে আইসিএস হয়ে বাংলায় এসে কী বিপদেই না পড়েছিল বেচারারা। জীবনানন্দের ঢের আগে ওঁদের প্রকৃতই ‘বিপন্ন বিস্ময়ে’ পাঠিয়ে ছেড়েছিল ভারতীয় মশককুল। বহু ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্ট মশার কামড়েই বাংলার মাটিতে সমাধিস্থ হন। এরপর বলতেই হয় মশার মতো ভয়ঙ্কর ভিলেন দুটো হয় না।
কিন্তু রস অনেকটা সামলে দিলেন। ১৮৯৭ সালে কলকাতার পিজি হাসপাতালে বসে ড. রোনাল্ড রস আবিষ্কার করলেন—ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু প্লাসমোডিয়াম কী ভাবে মশার শরীরে থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। বাঙালি হিসেবে গর্ববোধ হয়। কারণ যুগান্তকারী এই আবিষ্কারের সূতিকাগার পিজি হাসপাতাল, শহর কলকাতা। ১৯০২ সালে যে কারণে মেডিসিনে নোবেল পান ড. রস।
বাঙালি জীবনে মশার গুরুত্ব টের পাওয়া যায় বাংলা সাহিত্যের দিকে তাকালেও। সংবাদ প্রভাকরের জনক কাঁচড়াপাড়ার কবি লিখেছিলেন, ‘রাতে মশা দিনে মাছি,/ এই নিয়ে কলকাতা আছি’। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদাতে মশা আছে—বর্ধমানের মশা, চড়ুই পাখির মতো সাইজ। মনসামঙ্গল কাব্যে মশা উপস্থিত কালকেতু আর ফুল্লরার ব্যাক্যালাপে। ‘মশা’ গল্পের সূত্রেই ঘনাদার সঙ্গে বাঙালির পরিচয়। সম্প্রতি নয়ের দশকের এক প্রতিভাবান তরুণ কবি অনির্বাণ দাস মশা নিয়ে লিখে ফেলেছেন আস্ত কাব্যগ্রন্থ—‘মশামঙ্গল কাব্য’।
কেন লিখবে না! গত বছরেও পৃথিবীব্যাপী শুধু ম্যালেরিয়াতেই মারা গেছেন ৬,২৭,০০০ মানুষ। ৭০০ কোটি মানুষের পৃথিবীতে ৩২০ কোটি মানুষ যখন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিতে, তখন পুচকে মশাকে গুরুত্ব না দিয়ে উপায় কী বলুন! আবার এ দুনিয়ায় ওরা আছে বলেই কত মানুষের পেট চলছে কিনা!

টিভি চ্যানেলগুলোয় কোম্পানির পর কোম্পানি কত যে মশা প্রতিরোধক বন্দোবস্তের বিজ্ঞাপন দিয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত! কেউ ধূপ বেচে, কেউ ইলেক্ট্রিক লিকুইড, কারও স্প্রে আছে, কারও হাতে পায়ে মাখার মলমের ব্যবসা। এক ধরনের ব্যাটও মেলে। তাতে ফটাস ফটাস মশা মরে। তবে মশারির উপরে কোনও কথা হবে না!
আমার ধারনা ঘরের মধ্যে ঘর—আপাত ভাবে অতি সাধারণ মশারিই মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার।
অতএব এই ভরা বর্ষার মরসুমে জানলার বাইরে যত খুশি বৃষ্টি পড়ুক, ঘরের মধ্যে যত রাজ্যের মশা উড়ুক। কুছ পরোয়া নেহি। বাঙালি মশারি টাঙিয়ে প্রেম করবে। পথে পথে কদমফুল ঝরে থাকা ঋতুতে।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news