কিশোর ঘোষ 
বর্ষা যেন গ্রীষ্মের শত্রু! উল্টোটাও সত্যি।
বর্ষাকাল বাইরে বেড়িয়ে পড়তে বলে। গ্রীষ্মে যেমন কাজ না থাকলে ঘরে থাকাই মঙ্গল। এমনকী লোকে বাধ্য হয়ে দরজা জানলা বন্ধ করে ঠাণ্ডা মেঝেতে চিৎপটাং। সবার সাধ্যে তো এসি কুলোয় না। যদিও একেকটা কালবৈশাখী এসে খানিক আরাম দেয়। কিন্তু সে আর কতক্ষণ! সন্ধের কালবৈশাখীর খুচরো শীত রাত ফুরোতেই ফুড়ুৎ। সকালে ফের চোখ গরম করা সূর্যের থ্রেট। সেই বিজ্ঞাপনটা ছিল বেশ—সূর্যদেব আকাশ থেকে স্ট্র দিয়ে শুষে নিচ্ছে মানুষের এনার্জি। ব্যাপারটা কিন্তু সত্যি। গরমকালের একেকটা দিনান্তে যখন বাড়ি ফিরি আমরা, বুঝতে পারি, বাস্তবিক শরীরে জীবনি-শক্তি বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। আর বর্ষা?
সে তেতেপুড়ে থাকা জীবনের জীবনসুধা ঢালবে বলে আকাশ কালো করে জরো হয়। গোটা ক্যানভাস বদলে যায় ওমনি! শুরুতেই যা বলছিলাম—তার ডাক রবীন্দ্রভাষায় ‘বাহিরপানে’।
রবীন্দ্রনাথ যখন উঠলই তখন মহাকবির শিলাইদহ সাজাদপুর জীবন পর্বের কথা উঠবেই। সে সময় লেখা ‘ছিন্নপত্রে’র চিঠির পর চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ গ্রাম বাংলার বর্ষার ভয়ঙ্কর সুন্দর দৃশ্যের বর্ণনা করে গেছেন। সে দৃশ্য কখনও মনোরম, কখনও দুর্দান্ত দুর্যোগের। বর্ষা কীভাবে পাড় ভাঙে, কেমন করে ডুবিয়ে দেয় যাত্রীবোঝাই নৌকো তাও অনুভব করেছিলেন কবি। জমিদার রবীন্দ্রনাথের বোটই তো একাধিকবার পড়েছিল মারণ দুর্যোগে। একবার তো কোনওরকমে বাঁচা। মাঝির উপস্থিত বুদ্ধিতে, মূল নদী থেকে এক খালে নৌকো ভিরিয়ে প্রাণে বেঁচেছিলেন সেযাত্রা। সে যাক গে, আসল কথা হল, এতকিছুর পরেও রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু ছিল বর্ষা। বর্ষার রূপ নিয়ে তিনি যত গান, কবিতা লিখেছেন সম্ভবত আর কোনও ঋতু নিয়ে ততো লেখেননি। কেন?
হয়তো এই জন্য যে বর্ষা মানে প্রেম। বর্ষা মানে সবুজ। সৃষ্টির উৎসব। শীতে যে পাতা ঝড়ে গেছিল, গরমে যে গাছ-মাটি পুড়ছিল, বর্ষা আসে তাকে তার প্রার্থীত প্রাণ ফিরিয়ে দিতে। এ কারনেই হয়ত বর্ষাকাল এতটা উপভোগ্য। স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী তাই আমরা সাধারণ মানুষ মেতে উঠি বৃষ্টির মরসুমে।
ওই দেখুন ময়দানে বনস্পতির পাতার ছাতার তলায় তরুণ-তরুণী। প্রথম কয়েক ফোটা গায়ে পড়বে না ঠিক। কিন্তু মুষলধারে হলেই ভিজবে। আর সেটাই তো চায়। তাই ব্যাগের ভেতর ছাতা থাকলেও খুলবে না ওরা। এক বৃষ্টিতে দু’জনের স্নান না হলে কীসের প্রেম? কলেজস্ট্রিট চত্বরে জল জমতেই বেড়িয়ে পড়েছে কলেজের যৌবনের দল। প্যান্ট গুটিয়ে, শাড়ি-ওড়নার আঁচল কোমরে পেচিয়ে হুল্লোড়ে মেতেছে। এবার ওরা হয়তো কফি হাউসে কী বসন্ত কেবিনে ঢুকে বসবে। অর্ডার করবে কবিরাজি আর চা। আড্ডা দিতে দিতেই শুকিয়ে যাবে ভেজা জামা, সালওয়ার। হয়তো সর্দি হবে, জ্বর হবে। লেকিন কুছ পরবা নেহি। এদিকে সন্ধের বর্ষা মানে চপ-মুরি-কাঁচা পেয়াজ-কাঁচা লঙ্কা কাঁচা ঢপ! একদল অবসর প্রাপ্ত আবার বৃষ্টি নামতেই ছাতা উঁচিয়ে চায়ের দোকানে। বেঞ্চের তলায় ভেজা ছাতা গ্যারেজ করে চা-ধুমপান সহযোগে ঠেকবাজিতে মাতবে, সেলিব্রেট করবে বর্ষা। এরা আমিত শাহ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সোনিয়া গান্ধীদের থেকে রাজনীতিটা বেশি বোঝে, সৌরভ-শচীনের থেকেও বড় ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ। আর খাওয়ানদার পার্টি?
ঘুম থেকে উঠে যদি দেখে আকাশের মুখ ভার। যদি বোঝে, বৃষ্টির আজ সারাদিনের প্রোগ্রাম, সঙ্গে সঙ্গে বন্দোবস্ত করবে ইলিশ মাছ, ডিম ভাজা সহযোগে খিচুড়ির। এক সময় ছিল, সেদিন হয়তো স্কুল ছুটি এবং মেঘ গুরগুর বর্ষা নেমেছে জলেস্থলে। ওমনি ফুটবল নিয়ে মাঠে নামা। যত না খেলা তারচেয়ে বেশি স্যার-রা, সবুজ ঘাস ধোয়া কাদাজলে হাপুস স্নান। তবে ঘুরেফিরে বর্ষাকাল যে আসলে প্রেমের ঋতু তার প্রমাণ দেয় সদ্য বিবাহিত ওই দম্পতি। যুবক স্বামী খাওয়া-দাওয়া করে অফিসের উদ্দেশ্যে রেডি, কিন্তু দশদিক অন্ধকার করে নামল ঘণঘোর…। আর ময়ূর পেখম মেলল স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই ঢিপ ঢিপ বুকের ভেতরে। তবে কেউ স্বীকার করবে না। মেয়ে উলটে দুষ্টুমি করে বলবে, অফিস কামাই করো না কিন্তু। ছেলে মিষ্টি হেসে বলবে, হুমম। তারপর…।
এই সমস্ত ঘটনাই আসলে সমর্থন করে উচ্ছল সৃষ্টির ঋতুকে। যার রঙ অবধারিত ডিপ সবুজের অভিযান। ছোট ছেলে থেকে আসক্ত বৃদ্ধ, সকলেই মাসধিক কাল মনে মনে আনন্দ-কাগজের নৌকো ভাষায় বুকের উঠোনে জমা জ্বলে। আর কবিদের কবিতা পায়। খুব। কারণ জলে ভরা নদী, আকাশে ভাসা কালো মেঘের জাহাজ, কদম ফুলে ভরন্ত গাছ, সবুজ মাঠ, ক্ষেতের ফসল—সকলেই যে নিজের নিজের কাব্য রচনায় অক্লান্ত! বর্ষা মানে সত্যজিৎ রায়ও বটে।
শেষে এ কথা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে, আধভেজা থেকে যাবে লেখা। মনে করুণ ‘পথের পাঁচালি’, সেই দৃশ্য, আকাশ ধোয়া অনন্তধারায় ভিজছে দূর্গা। হাটু ছাপানো চুল খোলা। আনন্দে নেচে নেচে বৃষ্টির সঙ্গে খেলছে সে! আর গাছের তলায় জরোসরো অপু। দিদির পাগলামীর পর্যবেক্ষক। আরেক সিনেমা—কিংবদন্তী অভিনেতা তুলশি চক্রবর্তী আভিনীত ‘পরশপাথর’।
অফিস পাড়ার ছুটির কালে নামল বর্ষা। জনৈক কেরানি তুলশি এক পার্কের এক আচ্ছাদনের তলায় গরিবের ছেড়া ছাতা বন্ধ করে আশ্রয় নিল। আর ওই বৃষ্টির ধারায় মিশে তাঁ পায়ের কাছে এসে পড়ল ‘প-র-শপা-থ-র’!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news