সুমন ভট্টাচার্য : 
কার্গিলে আমার কোনও সেলফি নেই। স্যাটাস আপডেটও দিতে পারিনি।
তাহলে এই ২০১৮তে কার্গিল নিয়ে বা কার্গিল বিজয় দিবসে আমার কিছু বলার অধিকার আছে কি? নিশ্চিন্ত ছিলাম নেই, যদিও না এক রেডিও স্টেশনের মুখতার আলি নামে একজন ফোন করে আমাকে কার্গিল নিয়ে প্রশ্ন করার সময় পাকিস্তান নির্বাচন নিয়ে জানতে চাইতো। হ্যাঁ, মুখতার, মুখতার আলি আমাকে ঠিকই প্রশ্ন করেছিলেন। পাকিস্তানে ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ জিতে গেলে পরে কাশ্মীরের পরিস্থিতি কতটা বদলাবে? প্রশ্নটা আমাকে যতটা দু:শ্চিন্তায় ফেলল, ততটাই আশ্বস্ত করল, যাক, কেউ অন্তত এই নিয়ে ভাবেন।
না হলে ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে যাবতীয় আহ্লাদ এবং আদিখ্যেতার পরে আমরা তো বিশ্বকাপ জয়ী পাকিস্তান ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ককে যে কলকাতায় এনে সম্বর্ধণা দেওয়ার কথা ভেবে ফেলিনি, এটাই তো ঢের। আর হাফিজ সৈয়দ? কান্দাহার থেকে কাশ্মীর, লস্করে-তৈবার এই মূল মস্তিস্ককে যে এখনও কলকাতায় ‘কাশ্মীরে গণতন্ত্র এবং সেনাবাহিনীর ভূমিকা’ নিয়ে আলোচনাচক্রে ডাকা হচ্ছে না, এটাই কি ভাগ্য নয়? ২৫ জুলাই পাকিস্তানের নির্বাচনে ইমরানের দল অথবা হাফিজ সৈয়দের মদতপুষ্টরা ক্ষমতায় এসে গেলে কি হতে পারে, সেটা কি আমরা কেউ ভেবে দেখেছি?
কয়েক মাস আগে মধ্য এশিয়ার একটি দেশে আমার এক ভারতীয় শিক্ষাবিদ বন্ধু পাকিস্তানের রাজনীতিতে হাফিজ সৈয়দের আশা নিয়ে মন্তব্য করায় পাকিস্তানি দূতাবাসের আধিকারিকরা যেরকম অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন, তা মনে আছে। অতএব, আমরা না জানলেও এই নির্বাচনের গুরুত্ব কি, তা আরও অনেকেই জানেন। কার্গিলের বিজয় দিবস উৎযাপনের আগে তাই ভাবতে চেষ্টা করেছি টলিউডের অনেক নায়িকার, বা শুধু নায়িকাদের নয়, আরও অনেকের ‘হার্টথ্রব’ ইমরান খানকে নিয়ে উচ্ছ্বাস এবং ক্রিকেট লিখিয়েদের বই প্রকাশের পরিকল্পনা বাদ দিলে আমরা কতটুকু চিন্তিত পাকিস্তান, পাক সেনাবাহিনী এবং ইমরান খানের পরবর্তী রাজনীতি নিয়ে? যদি না হই, তাহলে ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা অথবা ক্যাপ্টেন কণাদ ভট্টাচার্যের স্মৃতি তর্পণ করার কি যৌক্তিকতা আছে?
ব্যক্তি হিসাবে আমি স্মৃতিতে বাঁচি না, তাই কার্গিলে কি হয়েছিল, আমি কত বীরত্বের সঙ্গে রিপোর্টিং করেছিলাম, এই সব ‘বিরিয়ানি’তে ঘি নিয়ে আলোচনার আজ আর কোনও যৌক্তিকতা খুঁজে পাই না। তবু ‘পয়েন্ট অব রেফারেন্স’ হিসাবে বলতে পারি, কার্গিল থেকে ফিরে আসার বছর পাঁচেক পরে এক বান্ধবী, যিনি কিনা আবার প্রবল বামপন্থীও বটে, প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আচ্ছা কার্গিল নিয়ে এই যে সব লেখা ছাপা হতো, রাস্তার উপরে যুদ্ধ হচ্ছে, গাড়ির উপরে এসে গোলা পড়ছে, এগুলো তো সব তোমরা বানিয়ে বানিয়ে লিখতে তাই না?’ আমি শুনে খুব একটা চমকাইনি, কারণ ততদিনে আমি জেনে গিয়েছি যে আমাদের দেশের বামপন্থীরা এবং তথাকথিত প্রগতিশীলরা ১৯৯৯ এর কার্গিল যুদ্ধকে একটা ‘সাজানো যুদ্ধ’ বলে মনে করেন। ভোটে জিততে বাজপেয়ী বা বিজেপির চমক বলে বিশ্বাস করেন। ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ বা যেকোনও ধরনের উত্তেজনার ক্ষেত্রে ওনাদের সিদ্ধান্ত যে বেইজিং-এর দিক থেকে তাকিয়ে আসে, সেটা আমি বুঝতে শিখে গিয়েছি। ভাগ্যিস ১৯৭১ এর যুদ্ধের পর বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছিল, তা না হলে চিনপন্থীরা ‘আনুগত্য’ দেখাতে গিয়ে হয়তো এটাকেও ইন্দিরা গান্ধীর তৈরি ‘সেলুলয়েড ড্রামা’ আখ্যা দিয়ে দিতে পারতো।
আবার কার্গিলে ফিরি। ৫২ দিন একটা যুদ্ধক্ষেত্রে কাটিয়ে ফিরে আসার পর আপনার মনে অনেক স্মৃতি থেকে যায়। কিন্তু ফেলে আসা অতীত আর ভেঙে যাওয়া প্রেম, দুটোই যেহেতু জীবনে কোনও ‘ডিভিডেন্ড’ দেয় না, তাই ওগুলো ‘ফিক্সড ডিপোজিট’ হিসাবে রাখতে নাকি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বারণ করেছে। কিন্তু কার্গিলে যদি আপনি ফিরে যান, এই ২০১৮তে এবং সুরু নদীর জলে পা ডুবিয়ে আপনি একটু রোম্যান্টিকও হতে চান, এবং বান্ধবীর হাত ধরে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করতে চান, তখনও যদি গোলা উড়ে আসে? আসলে উল্টোদিকের পাহাড়ে হাউইৎজার কামান নিয়ে বসে থাকা পাক সেনাবাহিনীর সদস্যরা তো সবসময় আপনার সঙ্গে ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা নাও করতে পারে! কিংবা থ্রি ইডিয়েটস-এ দেখানো সেই অপরূপ লাদাখ বেড়াতে যাওয়ার জন্য যদি পাসপোর্ট লাগে, তাহলেও কি আমাদের খুব বেশি দু:খ হবে?
১৯৭১ এর ডিসেম্বর মাসে ভারত-পাক যুদ্ধের সময় জেনারেল নিয়াজি রোজ ঢাকায় সাংবাদিক সম্মেলন করে বলতেন, পাক সেনাবাহিনী কিভাবে এগিয়ে চলেছে। তার সঙ্গে রোজ, একেবারে সিরিয়ালের শেষে টাইটেল কার্ডের মতো, তিনি বলতেন, ‘ভাবছি একেবারে ফোর্ট উইলিয়ামটা দখল করে নিয়ে ওবেরয় গ্রান্ডে চা খেতে খেতেই আপনাদের সঙ্গে যুদ্ধে আমাদের রণকৌশল কি ছিল তা নিয়ে আলোচনা করবো।’ সেটা যে হয়নি, তা ভারতীয় সেনাবাহিনীর কৃতিত্ব। ইমরান খানও তাঁর নব বিবাহিতা পত্নীকে নিয়ে কাশ্মীরে বেড়াতে আসতে চান বলে শুনেছি। সেটা যে এখনও তিনি করে উঠতে পারেননি, তার কারণ ওই কার্গিল।
শুধু এই জন্যেই ২৬ জুলাইটা আমি মনে রেখেছি। ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা, শচীন নিম্বলকরদের নাম মনে এলেই চোখের কোণে একটু জল চিকচিক করে। হ্যাঁ ঠিকই, ওরা চাকরির জন্য, সেনাবাহিনীতে বেতনের জন্য কার্গিলে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন। এতে, সেনাবাহিনীর শহিদ হয়ে যাওয়া ৪ জন অফিসারকে নিয়ে এতো ‘আদিখ্যেতা’র কি আছে? বেহালা থেকে বার্ণপুর বদলি হলে যখন আমরা কর্তৃপক্ষের ‘চক্রান্ত’ দেখতে পাই, তখন সেনাবাহিনীর জওয়ানদের নিয়ে ভাবার কিইবা আছে? তাই না!
তাহলে? ইমরান খান যদি ‘কার্গিল অ্যান্ড দেন, হাউ আই অকুপায়েড কাশ্মীর’ নামে কোনও বই লেখেন, সেই বইয়ের উদ্বোধনে কলকাতায় তাঁর মুগ্ধ ‘ভক্ত’রা কি বিশ্বকাপ জয়ী ওই পাকিস্তান দলের আর এক সদস্য জাভেদ মিঁয়াদাদ আর তাঁর ‘বেয়াই’কেও ডাকবেন? আসলে মিঁয়াদাদের বেয়াই তো দাউদ ইব্রাহিম। তাহলে ক্রিকেট, শারজা ইত্যাদি নিয়ে একটা চমৎকার আড্ডার আয়োজন করা যেতে পারে। নাম তো তৈরিই আছে, ‘ঘন্টাখানেক সঙ্গে ইমরান’!
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news