Breaking News
Home / TRENDING / গাঁধীজির তিন বাঁদর

গাঁধীজির তিন বাঁদর

মূল রচনা: শরদ জোশী

অনুবাদ: পার্থসারথি পাণ্ডা

এক বুড়ো বিজ্ঞের তিন ছেলে। তিনটেই পাজির পা-ঝাড়া। স্বভাবে বাপের একেবারে উল্টো। মুখে অকথা-কুকথার তোড়। আজ এ-এসে তাদের নামে বাঁদরামি-বদমাইসির নালিশ করে বিজ্ঞের কাছে, কাল করে এসে আর কেউ। তাঁর মনে তাই খুব দুঃখ।

একদিন ছেলেদের ডেকে তিনি বললেন, ‘আমি জানি, স্বভাবে তোমরা বাঁদরের মতোই বদমাশ, চতুর। তা এতটাই যখন বাঁদরের মতো হলে, তখন আদর্শ বাঁদর হতে তো পারতে। তেমনটা হলে, হয়তো তোমরা কিছু একটা হয়ে উঠতে পারতে।’

বিজ্ঞের কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝল না ছেলেরা। বোঝার চেষ্টাই তারা করল না। তবু কথার কথা, ছোট ছেলেটা অবোধ হয়ে জিজ্ঞেস করে বসল, ‘আদর্শ বাঁদর! সে জিনিসটা আবার কি!’

বিজ্ঞ বাবা তখন তাদের সেই তিন বাঁদরের কথা বললেন, ‘যার মধ্যে একটা বাঁদর মন্দ কিছু দেখবে না বলে চোখ বন্ধ করেছিল, আর একটা মন্দ কিছু শুনবে না বলে কান ঢেকেছিল। আর অন্যটা যাতে কাউকে মন্দ কথা না-বলে বসে, তাই মুখ বন্ধ রেখেছিল।’ তিন বাদরের গল্পখানা শুনিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিজ্ঞ বললেন, ‘তোমরা যদি তাদের মতো হতে পারতে, তাহলে তোমাদের ভালো হত, আমিও সুখী হতাম।’

বাবার কথাটা ছেলেদের মনে ধরল যেন। সম্মানেও লাগল! কেউকেটা একটা কিছু হয়ে বাবাকে দেখিয়ে দেবার ভাবনা নিয়ে গুম মেরে তিন ছেলে বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। পথে কেউ কারোর সঙ্গে কথা বলল না। খানিক দূর এগিয়ে একটা নদীর কিনারে এসে তারা বসল। মনের ভাবনা নিয়ে জলের ছোট ছোট ঢেউয়ের ওপর পাথর ছুঁড়তে লাগল। ছোট ছেলেটা প্রথম বলে উঠল, ‘আমি ঠিক করলাম, বাবার কথা মতো সারাজীবন আমি মুখে কোন মন্দ কথা বলব না। সেটা যদি সত্যিও হয় তবু বলব না।’

মেজ ছেলে বলল, ‘আমি কানে কোন কথাই শুনব না।’

বড় ছেলে চোখে কিছু দেখবেই না বলে শপথ করে বসল।

আদর্শ বাঁদরের মতো তাদের হতেই হবে, এই ভেবে তারা নদীর কিনার থেকে উঠল। বাপের কাছে খবর পাঠাল যে, তারা চাকরির খোঁজে বাইরে যাচ্ছ!

পথে নামল তিনভাই। চলতে চলতে পথে পড়ল এক চৌরাস্তার মোড়। সেখানে থেমে আর একবার নিজের নিজের শপথ আউড়ে তিনজন তিনটি রাস্তা ধরে তিন দিকে চলে গেল।

বিজ্ঞ বাবা ছেলেদের পথ চেয়ে বসে থাকেন, অনেকদিন কেটে গেল, ছেলেরা তবু ফিরল না। এবার মন খারাপ হয়ে ছেলেদের জন্য তাঁর ভারি দুঃখ হতে লাগল। এমন হল যে, বই পড়তেও আর ভালো লাগে না। একদিন মন এতটাই খিঁচড়ে গেল যে, চোখের সামনে থেকে আদর্শ বাঁদরের তিনটে মূর্তি দূর করে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। ওদের জন্যই ছেলেরা আজ তাঁর কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেছে! ভাবলেন, বাপের কথা যে ছেলেরা এমন করে মাথায় তুলে নেয়, তারা তো খুব খারাপ নয়। লোকেরা নিশ্চয় তাদের বিরুদ্ধে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলত! এই তো সমাজের দোষ!

এবার বিজ্ঞ বিশ্বনিন্দুক হয়ে উঠলেন। সকলের নিন্দা করতে লাগলেন। সব কিছুর মধ্যেই দোষ দেখতে লাগলেন। লোকেরা কিছুদিন তাঁর পুরনো সম্মান বজায় রাখলেও অল্পদিনের মধ্যে তারাও তাঁর ঝেড়ে নিন্দা করতে লাগল। এবার বিজ্ঞ অনুভব করলেন, এখন আগের চেয়ে মানুষ সম্পর্কে, সমাজ সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞান কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। তাহলে তাঁর ছেলেরাও তো এমনই জ্ঞানী ছিল! তারা তো তবে খারাপ ছিল না!

কয়েক বছর পর তিন আদর্শ ছেলে বাপের সঙ্গে দেখা করতে ঘরে এলো। হাবভাব দেখে এখন যেন তাদের চেনাই মুশকিল। এতদিন পর ছেলেদের কাছে পেয়ে বাপের চোখে জল এলো। জিজ্ঞেস করলেন, ‘হ্যাঁ রে বাপ, এখন কি করছিস তোরা? কোথায় আছিস?’

বড় ছেলে বলল, ‘বাড়ি থেকে বেরিয়ে মন্দ কিছু দেখব না বলে শপথ নিয়েছিলাম তো, এখন সেটাই পালন করছি, বাবা। আমি সরকারী মুখপাত্র হয়েছি। চোখে কিচ্ছু দেখি না। কানে কর্তার যা আদেশ শুনি, শুধু সেটাই মুখে প্রচার করি!’

মেজ ছেলে বলল, ‘আমি নেতা হয়েছি, বাবা। কারও প্রার্থনা, কারও ভৎর্সনা—কিচ্ছু কানে শুনি না। সারা দেশে ঘুরে বেড়াই আর মুখে খালি বুলি কপচাই!’

ছোট ছেলে বলল, ‘তোমরা তো তাও পথে আছ ভাই! আমি যে আবার মুখে কিচ্ছুটি না বলার শপথ নিয়েছি। বাবা, আমি এখন সরকারের কেরানী। চোখে দেখি, কানে শুনি; উঁহু, মুখে কিচ্ছুটি বলি না!’

 

(শরদ জোশী হিন্দি সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখক। ব্যঙ্গ রচনায় তাঁর প্রসিদ্ধি। জন্ম: ২১ মে ১৯৩১, মৃত্যু: ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯১।)

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *