মূল রচনা: শরদ জোশী
অনুবাদ: পার্থসারথি পাণ্ডা
প্রাক্তন এক প্রধানমন্ত্রী, যিনি চিরকাল এরোপ্লেনের উইন্ডো থেকে দেশমাতাকে দেখেছেন, তিনি যখন ট্রেনের কামরায় বসে জানলা দিয়ে জাতিকে দেখেন; তখন কি তাঁর দৃষ্টিকোণ বদলে যায়? তাই–
অবশিষ্ট কিছু চামচার সঙ্গে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী স্যুটকেস হোল্ডার নিয়ে ছুটতে ছুটতে স্টেশনে পৌঁছলেন। আর সেখানে পৌঁছেই তিনি জানতে পারলেন, ট্রেন লেট করবে! নিতান্তই বিরক্ত হয়ে তিনি বেঞ্চে বসে ভাবতে লাগলেন, দোষটা কার, রেলমন্ত্রীর না বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর? দোষটা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর, রাজনীতি তো তাই বলে!
প্ল্যাটফর্মের বেজায় রকমের বেয়াড়া মাছির ভনভন! মাছির উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি ভাবতে লাগলেন, এই যে ট্রেন আসার আশায় গুটিশুটি মেরে বেঞ্চিতে নির্বিকার বসে থাকা প্যাসেঞ্জারেরা, এরা অধৈর্য হচ্ছে না কেন! পাইলট লেট করলে এয়ারপোর্টের যাত্রীরা যেভাবে প্রটেস্ট করে, এরা সেরকম কিছু করছে না কেন? বর্তমান সরকারকে তেড়ে খিস্তি দিচ্ছে না কেন? তা সেকথাটাই একজনকে বলতে সে যেন বোধিপ্রাপ্তের মতো বলল, কি বলব দাদা, এ দেশে এটাই তো অদ্যিকালের নিয়ম! গাড়ি তো লেটেরই জিনিস, লেট তো করবেই দাদা! ভগবান রামই বনবাস সেরে ঘরে ফিরতে গিয়ে চিন্তায় পড়েছিলেন, পুষ্পক ঠিক সময়ে অযোধ্যায় পৌঁছবে কি না তাই ভেবে। আর আমরা তো কোন ছার!
ট্রেন এলেও বাকি তখনও রিজার্ভেশনের সমস্যা। ধরো, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর বর্থ যদি হয় আর এ সি অর্থাৎ ‘রিজার্ভ এগেইনস্ট ক্যান্সিলেশন’, তাহলে বুকে ধুকপুক তো হবেই। আসলে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এই সমস্যাতেই ভুগছেন! তবে, স্টেশনে ছাড়তে আসা চ্যালারা যথারীতি তাঁকে আশ্বাস দিতে কসুর করলো না, চিন্তার কিছু নেই, যেভাবেই কামরায় আপনাকে ঠিক তুলে দেব দাদা। আর টি টি যদি একবার আপনাকে চিনতে পারে, তাহলে তো হয়েই গেল!
ট্রেন চলতে শুরু করল। চেন টেনে কেউ একজন থামিয়ে দিল। সেই বাধা পেরিয়ে খানিক পরে আবার চলতে শুরু করল। দিল্লিকে পিছনে ফেলে ট্রেন এগোতে শুরু করল। দেশের উদ্দেশ্যে দেওয়ালে লেখা সুভাষীতানি সরে সরে যেতে লাগল। হাত বাড়ালেই বন্ধু, বাড়াও বন্ধু হাত! জানলা থেকে মুখ বাড়িয়ে সেই বচনমালা পড়তে পড়তে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ভাবতে লাগলেন, কার দিকে বাড়াব হাত– মোদি, না সোনিয়া?
ট্রেন এগোচ্ছিল। দিশি চা-ওয়ালা চিল্লাতে চিল্লাতে এলো। চায়, চায়, চায়। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এক কাপ নিলেন। তখনই ওনার মনে পড়ল এয়ারহোস্টেসদের কথা। মনে পড়ল চায়ের ডিপ ডিপ ব্যাগ। চা-ওয়ালা চা দিয়েছিল কাগজের কাপে। এক চুমুকেই গলা দিয়ে নামতে লাগল স্বাধীন ভারতের অর্থনীতির! তিনি ঢোঁক গিলে মুখ বিকৃত করলেন। সামনের প্যাসেঞ্জার তাই দেখে, তার যেমন স্বভাব, গায়ে পড়ে বলল, রেলের চা এমনই হয়, মশাই। চিরকাল এমনটাই ছিল!
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী চোখ ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরে। দেখলেন, রেল লাইনের ধারে ভারতীয় নরনারীর দল রাতের ভার হালকা করতে একটু ঝোপঝাড়ের আড়াল খুঁজে ঘটি নিয়ে বসে পড়েছে! প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর কিছুতেই মনে পড়ছিল না যে, স্লামসের জন্য ল্যাট্রিনের একশন প্ল্যান তিনি অনুমোদন করেছিলেন, না পরের প্রধানমন্ত্রী! ট্রেন বেশ জোরে ছুটছিলো আর তার পথের পাশ বরাবর রাষ্ট্র পেট পরিষ্কার করছিল!
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ভাবতে লাগলেন, এই রেলযাত্রার নিদারুণ অভিজ্ঞতা দিয়েই এই ভোটের বাজারে একেবারে বাজিমাত করে দিতে হবে! আমি দেখেছি, ট্রেন থেকে দেখেছি, জানলা থেকে দেখেছি…মনে মনে ভবিষ্যতের এক ভাষণ তৈরি হতে লাগল!
ট্রেনটা ছোট্ট একটি স্টেশনে এসে থামে। প্যাসেঞ্জার প্যাসেঞ্জার আর প্যাসেঞ্জার–পঙ্গপালের মতো হুড়মুড়িয়ে উঠে আসে কামরায়। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর মনে হল, পুরো দেশটাই যেন এই কামরাতেই গাদাগাদি করে উঠে বসেছে! অসম্ভব চাপাচাপি শুরু হল। সেই ভিড়ের চাপে তিনি যেন একেবারে কুঁকড়ে গেলেন!ভবিষ্যতে ছড়ানোর আশা নিয়ে হালে যদি কুঁকড়ে যেতেও হয়, সে সুযোগ কেইই বা ছাড়ে!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news