Breaking News
Home / TRENDING / সরকারি চাকরির ছ’দিন

সরকারি চাকরির ছ’দিন

মূল রচনা: শরদ জোশী
অনুবাদ: পার্থসারথি পাণ্ডা

জঙ্গল ফাঁকা হয়ে এসেছে। তবু সেখানে যাবার মতো একটা রাস্তা আছে। সে রাস্তায় এখন তাপ্পি চলছে। সামনের বর্ষায় খানাখন্দে ভরে ওঠার জন্য তাকে দস্তুরমতো তৈরি করা হচ্ছে! এই রাস্তা দিয়েই দূরে একটা জিপকে আসতে দেখা গেল। ঘড়ঘড়ে আওয়াজ আর লজঝড়ে চেহারা দেখেই নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে, এটা সরকারি জিপ। জিপটা সামনে এলে আমরা দেখতে পাই, তাতে জঙ্গল বিভাগের এক বড় অফিসার। তাঁর হাবভাব একেবারে টারজানের মতো। তিনি চলেছেন জঙ্গল ইনস্পেকশনে। চুরি-চামারির পর যে ক’টা গাছ বেঁচেবর্তে আছে, সেগুলো যেন তিনি এক্ষুনি গিয়েই গুণে ফেলবেন! এমনি তাঁর ভাবখানা।

রাস্তার কাছাকাছি ঝাঁক বেঁধে রয়েছে বনবিভাগের মজুরেরা। রাস্তাটা তাদেরই সারাই করার কথা। কিন্তু এই মুহূর্তে তারা রাস্তা সারাই করছে না। তারা বসে বসে বিড়ি ফুঁকছে। গল্প করছে। যে গল্প করছে না, সে এর-ওর গল্পের রস নিচ্ছে কিংবা উদাস হয়ে আকাশ দেখছে।

একলা রাস্তা পড়ে আছে নিজের জায়গায়, বিড়ির সুখটানে ব্যস্ত মজুরেরা আর এক জায়গায়। এরা আই এ এস নয়, হেড ক্লার্ক বা সুপারিনটেনডেন্টও নয়। তবু তারা যেহেতু সরকারি কাজ করছে, সেহেতু কাজের সময় কাজ না করার পুরো অধিকার তাদের আছে।

রাস্তার ধারে দিব্যি তারা বিড়ি ফুঁকছে। যদি এটা সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং হত এবং এখানে যদি ক্যান্টিন থাকত, তাহলে তারা ধূমপানের ফাঁকে ফাঁকে মৌজ করে চা-ও খেত। দুঃখের বিষয়, এটা নেহাতই জঙ্গলের রাস্তা এবং তারা নিতান্তই মজুর! এরইমধ্যে মূর্তিমান রসভঙ্গের মতো জঙ্গলের অফিসারটিকে বইতে বইতে ঘড়ঘড়ে জিপটা কোনোরকমে সেখানে হাজির হল। অফিসারেরা নিজে অকর্মার ঢেঁকি হলেও অন্যের ফাঁকিবাজি একেবারেই দু’চোখে দেখতে পারেন না। এটাই দস্তুর, এরই জন্য তাঁরা মাইনে পান।

মজুরদের সামনে এসে দড়াম করে জিপ থামালেন অফিসার। টপাক করে লাফিয়ে জিপ থেকে নামলেন এক্কেবারে টারজানের মতোই। তারপর শুরু করলেন স্টকের বাছা বাছা খিস্তি। ফাঁকিবাজ, হারামি-র মতো সাধারণ নয়, বেশ ওজনদার খিস্তি! টারজান তার পুরো জংলি-জীবনে বোধহয় এতো খিস্তির ফুলঝুরি ছোটায়নি, মাত্র পনের মিনিটে অফিসার যা ছোটালেন।

খিস্তিপর্ব মিটতেই মুরুব্বি গোছের আধবুড়ো এক মজুর শেষ হয়ে যাওয়া বিড়িটা ফেলে সবার হয়ে বলতে লাগল, স্যার, আমাদের সবার ঘর-বার জমি-জিরেত গোয়াল-গরু কিছু না কিছু আছেই। ভাববেন না সেখানে কাজের কোন খামতি আছে বা কমতি আছে। ভাববেন না যে আমরা কাজ করি না। কিন্তু, এখানে তো আমরা কাজ করতে আসিনি, স্যার; এখানে এসেছি চাকরি করতে!

মুরুব্বি মজুরের এই দর্শনটাই আসল! জঙ্গলের রাস্তা হোক কিংবা সরকারি অফিস, পিয়ন হোক বা অফিসার–এঁরা কাজ করতে নয়, আসেন চাকরি করতে। ঘরে এঁদের অনেক কাজ। তারই মধ্যে সময় বের করে দশটা থেকে চারটে হল তাঁদের চাকরি-টাইম!

সপ্তাহে ছ’দিন সরকারি দপ্তর চলে। লোক ভাবেন, সরকারি দপ্তরে কিচ্ছু কাজ হয় না, সেখানে শুধুই ফাঁকিবাজি! আজ্ঞে না মশাই, এটাই হল চাকরি! বাড়িতে অনেক জরুরি কাজ ফেলে তাঁরা চাকরি করতে আসেন, সেইসব জরুরি কাজ সেরে চাকরিতে আসতে অনেকের লেটও হয়ে যায়। এমনি করে কায়ক্লেশে তাঁরা কাবার করে দেন চাকরির ছ’টা দিন, তারপর যে সরকারি ছুটির দিনটা আসে, সেটাই হল একমাত্র কাজের!

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *